-মোবারক হোসাইন

সুন্দর সমাজব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠা

মহাগ্রন্থ আল কুরআন। স্রষ্টার মহাদান, রাসূল (সা)-এর শ্রেষ্ঠ মোজেজা, বান্দার জন্য রহমতের ভান্ডার। সর্বোপরি বিশ্বমানবতার মুক্তির মহাসনদ। কুরআন এমন একটি কিতাব যা তিলাওয়াত করলেও সওয়াব, শুনলেও সওয়াব, শিখলেও সওয়াব, শেখালেও সওয়াব, আমল করলেও সওয়াব, কাউকে আমল করতে উৎসাহিত করলেও সওয়াব। কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শহীদ হলেও সওয়াব, গাজী হলেও সওয়াব। পৃথিবীতে কুরআন ছাড়া এমন কোনো গ্রন্থ নেই যা তার অনুসারীদেরকে এভাবে উজ্জীবিত করে।

কুরআন নাজিলের মূল উদ্দেশ্য
১. সঠিক পথনির্দেশনা- কুরআন বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়েত, রহমত ও সুসংবাদের ঘোষণা এবং দিশেহারা মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দানের নিমিত্তে আল্লাহ তায়ালা আল কুরআন অবতীর্ণ করেন।
২. সমস্যার সমাধান- বিশ্বমানবতা যখন চরম সমস্যায় জর্জরিত হয়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত, যখন বিশ্বমানবতা আশা করছিল ওপরের ফয়সালা, ঠিক তখনিই আল্লাহ তায়ালা সব সমস্যার সমাধানকল্পে আলোকবর্তিকা রূপে কুরআনুল কারিম অবতীর্ণ করেন।
৩. সতর্কবার্তা প্রদান- কুরআন আল্লাহপ্রদত্ত সব নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার পাশাপাশি অতীতের হটকারী জাতিগুলোর ভুলের শোচনীয় পরিণামসমূহ উল্লেখের মাধ্যমের মানবসমাজকে সতর্কতা প্রদানের নিমিত্তে আল-কুরআন অবতীর্ণ হয়।
৪. ভ্রান্ত বিশ্বাসের অপনোদন- ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজের লোকেরা বিভিন্ন ভ্রান্ত আকিদা পোষণ করত। নিজেদের মনমতো বিধান তৈরি করে জীবন অতিবাহিত করত। তারা ছিল চরম কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। তাদের সে ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা খন্ডনের নিমিত্তে কুরআন অবতীর্ণ হয়।
৫. ইসলামী সমাজের রূপরেখা প্রণয়ন- মানবরচিত সব মতাদর্শ উৎখাত করে ইসলামী সমাজের বাস্তব রূপরেখা প্রণয়ন তথা কুরআনের বিধান কায়েম করা। বস্তুত এটাই ছিল কুরআন নাজিলের মূল উদ্দেশ্য।
৬. শিরকমুক্ত সমাজ গঠন- আল-কুরআন নাজিলের পূর্বে মানবতা ছিল জাহেলিয়াতের ঘোর অন্ধকারে আচ্ছন্ন। শিরক, কুফর আর নিফাকিতে সয়লাব ছিল মানবসমাজ। কুরআন এসেই বিশ্ববাসীকে এসব মুনকার কাজ থেকে মুক্ত করে ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির পথনির্দেশ প্রদান করে।
৭. ইনসাফ প্রতিষ্ঠা- অন্যায়, জুলম-অত্যাচার, মানবাধিকার লঙ্ঘনে বিশ্বমানবতা অস্থির। আর এ জন্য দরকার ন্যায় ও ইনসাফের সমাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়া। কুরআন নাজিলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।
৮. রবের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন- প্রতিটি মুমিনেরই একান্ত কামনা থাকে তার মনিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ। কুরআন এ কামনা পূরণে পথনির্দেশ হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে।
৯. সত্যায়নকারী- সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ আসমানি কিতাব হলো আল-কুরআন। এর আগে অনেক আসমানি কিতাব ও অগণিত নবী-রাসূল পৃথিবীতে আগমন করেছেন। কুরআন এসে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলসহ আল্লাহপ্রদত্ত আসমানি কিতাবের সত্যতা প্রমাণ করেছে।
১০. তাজকিয়ায়ে নফস- সর্বোপরি দুনিয়ার সব কর্মকান্ডে বান্দার আত্মপরিশুদ্ধি লাভে কুরআন এক কার্যকর টনিক হিসেবে অবতীর্ণ হয়।
কুরআনি সমাজ কেন দরকার?

কুরআনি সমাজ মানে আল্লাহর অহির দিকনির্দেশনার আলোকে সমাজ পরিচালিত হবে। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহর হেদায়েতের অনুসরণের বিকল্প নেই। আল্লাহর রাসূল হিলফুল ফুজুুল করেও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। হেরাগুহায় ধ্যান করেছিলেন। অহি দিয়ে ২৩ বছরে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। সুন্দরী রমণী ঘর থেকে একাকী বের হতে পারতো। জাকাত নেয়ার মতো লোক ছিল না। হযরত আবদুল আজিজ ছেলেকে রাষ্ট্রীয় তহবিলের একটি খেজুর দেননি আল্লাহর ভয়ে। ব্যক্তিগত কথা বলার সময় রাষ্ট্রেীয় অর্থের বাতি নিভিয়ে রাখতেন। কুরআনি সমাজ ছাড়া এমন সুখ পাওয়া যায় না।

কুরআনি সমাজের কিছু বৈশিষ্ট্য
কুরআনি সমাজ মানে আইন হবে আল্লাহর। জনগণের পরিবর্তে সার্বভৌমত্বের মালিক হবেন আল্লাহ। রাষ্ট্র ইসলামী চিন্তাবিদদের ইজতিহাদের আলোকে বিস্তারিত আইন কানুন করবে। মানবরচিত আইন প্রণেতারা সুদূরপ্রসারী ভালো-মন্দ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। কারণ তারা গায়েব জানেন না। ভবিষ্যতে মানবসমাজের সুখ কিসে নির্ভর তা তিনিই বলতে পারেন; যিনি আলেম আল গায়ব।

কুরআনি সমাজ মানে রাষ্ট্রের সর্বত্র আদল তথা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। রাষ্ট্রনায়কও আইনের ঊর্ধ্বে থাকবেন না। বর্তমান প্রচলিত আইনে রাষ্ট্রপ্রধান দায়িত্ব পালনকালে আইনের ঊর্ধ্বে। হযরত আলী (রা)-এর সাথে ইহুদির মীমাংসার জন্য খলিফা আদালতে গিয়েছিলেন। আদালত প্রভাবান্বিত করেননি। রাষ্ট্র মানুষের ওপর কোন জুলুম করবে না। এক মানুষ আরেক মানুষের ওপর জুলুম করা থেকেও বিরত থাকবে।
কুরআনি সমাজ মানে সমাজের সকল মানুষ নিঃশর্তভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে। রাষ্ট্রনায়করা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করতে অস্বীকার করলে তাদের আনুগত্য করা থেকে বিরত থাকবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে এমন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিকরা চেষ্টা করবে।

কুরআনি সমাজ মানে সে সমাজের কেউ দুনিয়ার কোনো সত্তাকে ভয় পাবে না। একমাত্র আল্লাহকেই ভয় করবে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ইসলামের শৌর্য-বীর্য বিসর্জন দেবে না। প্রয়োজনে শাহাদাত বরণ করবে। কুরআনি সমাজ মানে সে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে পরামর্শভিত্তিক। ক্ষমতাসীনরা স্বেচ্ছাচারী হবেন না।

কুরআনি সমাজ কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে
কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সে পথ ও কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে যে পথ ও কর্মপদ্ধতি মুহাম্মদ (সা) অনুসরণ করে তদানীন্তন সমাজে কুরআনের রাজ কায়েম করেছিলেন। কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠায় রাসূলে কারিম (সা)-এর সুন্নাহ বোঝার জন্য যেমনিভাবে কুরআন ও হাদিসের ভাষার জ্ঞান থাকতে হবে, তেমনিভাবে কোন প্রেক্ষাপটে কুরআন ও হাদিসের সে বিধান নাজিল হয়েছিল তাও জানতে হবে। কেননা কুরআন ও হাদিসের অনেক বিধান মুহকাম তথা সুস্পষ্ট। তা সময় ও যুগের প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন হয় না। যেমন মদ হারাম হওয়ার বিষয়। আবার কিছু বিষয় আছে তা কুরআন ও হাদিসের আলোকে ইজতিহাদের সাথে নির্ভরশীল। যেমন বদর যুদ্ধের বন্দীদের সাথে যে আচরণ করা হয়েছে আজকের যুগে বন্দীদের সাথে হুবহু কি সেই আচরণ করতে হবে? না সময় ও স্থানের আলোকে ইসলামী নেতৃত্ব নির্ধারণ করতে পারবেন? এটা ঠিক যে কুরআন হাদিসের আলোকে ইসলামী নেতৃত্বকে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তিনি কুরআন ও হাদিসের টেক্সট ও পাশাপাশি কনটেক্সট যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হলে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হয়। কুরআন ও হাদিসের আলোকে কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ কি তা ভালোভাবে বুঝতে হলেও কুরআন হাদিসের এ-সংক্রান্ত টেক্সট ও কনটেক্সট যথাযথভাবে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, কুরআন ও হাদিসের মৌলিক নীতিমালার ভিত্তিতে ইজতিহাদ করার ক্ষেত্রে একজন মুজতাহিদ আযিমত ও রুখসত অর্থাৎ কঠিন ও সহজ পন্থার যেকোনো একটি গ্রহণ করতে পারেন। তবে সহজ এমন কোনো পন্থা আবিষ্কার করা যাবে না যা ইসলামের মৌলিক নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক।

এখন এ সম্পর্কে সংক্ষেপে আরও কিছু আলোচনা করতে চাই।
আল্লাহ তায়ালা অস্বাভাবিক পদ্ধতিতে ইসলাম কায়েম করে দেন না, তিনি ইসলাম বিরোধীদেরকে ধ্বংস করে দিয়ে ইসলামকে বিজয়ী করে দিতে সক্ষম। কিন্তু তা তিনি করেন না। তিনি তখন মুসলমানদেরকে সাহায্য করেন যখন মুসলমানরা দ্বীন কায়েমের জন্য চেষ্টা করে। খন্দকের যুদ্ধে তিনি ঝড় বৃষ্টি দিয়ে বিধর্মীদের তাঁবু ও রসদপত্র তছনছ করে দিলেন। নমরুদকে সামান্য একটি মশা দিয়ে কিভাবে হেনস্তা করলেন তার ইতিহাস সবারই জানা। নমরুদের বিশাল বাহিনী ক্ষুদ্র মশা বাহিনীর আক্রমণে শেষ হয়ে গেল। ফেরাউনকে নদীতে ডুবিয়ে মারলেন আর মূসা (আ)কে সেই নদীতেই বিনা বাহনে একপাশ থেকে আরেক পাশে পার করে দিলেন। ইবরাহিম (আ)কে আগুনে নিক্ষেপ করার পর আগুনের দাহ্যশক্তি নষ্ট করে দিলেন। আগুনকে নির্দেশ দিলেন ইবরাহিমকে তাপের স্পর্শ দিয়ে কষ্ট না দিয়ে আরামদায়কভাবে রাখার জন্য। আবার প্রিয় হাবিবকে তায়েফে রক্তে রঞ্জিত হতে হলো। সে সময় কাফেরদের হাত অবশ করে দিতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেননি। উহুদে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় রাসূলকে ডেকে বলতে হলো- তোমাদের মধ্যে কে আছ যে ঢাল হিসেবে আমার সামনে দাঁড়াতে পারবে? হযরত আবু তালহাসহ কতিপয় সাহাবী আল্লাহর রাসূলকে কাফেরদের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য নিজেদেরকে ঢাল হিসেবে পেশ করলেন। আজকের যুগেও কুরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য এমন কিছু মর্দে মুমিন দরকার যাঁরা আদর্শ কায়েম করার জন্য হাসিমুখে নিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সৎ সাহস রাখেন।

মুসলমানদের মধ্যে কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠার ভিশন থাকতে হবে। রাসূলে কারিম (সা)-এর সামনে ভিশন ছিল দ্বীনকে গালিব করা। সাহাবায়ে কেরাম সেই ভিশনকে সামনে রেখে দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছিলেন। এ জন্য শত নির্যাতন নিপীড়ন ভোগ করেছিলেন। আপন জন্মভূমি থেকে হিজরত করেছিলেন। ভিশনের জন্য তাঁদের ত্যাগ ও কোরবানির বিনিময়ে মাত্র তেরো বছরের ব্যবধানে একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে তাঁরা সক্ষম হন। আর আট বছরের ব্যবধানে যে মক্কা থেকে তাঁরা হিজরত করেছিলেন সেই মক্কা জয় করে ইতিহাস স্থাপন করেছিলেন। আজকের যুগেও মুষ্টিমেয় কিছু ইহুদির স্বপ্ন ও স্বপ্ন বাস্তবায়নে অবিরাম চেষ্টা সাধনার কারণেই ‘ইসরাইল’-এর প্রতিষ্ঠা হয়। সারা বিশ্ব থেকে ইহুদিরা সেখানে জড়ো হয়ে ফিলিস্তিনিদেরকে উচ্ছেদ শুরু করে। তারা সংখ্যায় কম হলেও ইউরোপ আমেরিকার রাজনীতি তাদের নিয়ন্ত্রণে। কেননা রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে ধরনের জ্ঞান যোগ্যতা ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকা দরকার তার সবই মুষ্টিমেয় ইহুদিদের হাতে রয়েছে। ইহুদিরা অনেক বড় পজিশন ছেড়ে দিয়ে ছোটোখাট চাকরি নিয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাড়ি জমাচ্ছে তাদের মিশন বাস্তবায়ন করার জন্য। আফসোসের বিষয় হচ্ছে আজকের মুসলমানদের অধিকাংশের সামনে কোন ভিশন নেই। মুসলমানদের ক্ষুদ্র একটি অংশের সামনে ভিশন থাকলেও ভিশনকে সামনে রেখে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

কুরআন জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠ নেয়ামত এ কথা মুসলমানদের আলাপ আলোচনা কথাবার্তা, উঠা-বসা, বিবাহ-শাদি, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি-অর্থনীতি সব কিছুর মধ্য দিয়ে ফুটে উঠতে হবে। কুরআন এসেছে মানুষের জীবনের পরিবর্তন সাধনের জন্য। মুসলমানরা যদি তাদের আচরণ দিয়ে অমুসলিমদের সামনে এ কথা প্রমাণ করতে পারে যে কুরআনের বিধানের মধ্যেই সকল মানুষের কল্যাণ নিহিত। তাহলে অমুসলিমরা কুরআনের দিকে ঝুঁকবে। আফসোসের বিষয় হচ্ছে অনেক অমুসলিম যখন কুরআন পড়া শুরু করে তখন কুরআনের প্রতি আকৃষ্ট হয় আবার যখন মুসলমানদের সাথে মিলিত হয় তখন হতাশ হয়। এ প্রসঙ্গে একজন ইংরেজের কথা উল্লেখ করতে চাই। তিনি কুরআন পড়তে গিয়ে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। কিন্তু মুসলমানদের অবস্থা দেখে দুঃখ করে বলেন, কুরআন পড়লে ইসলাম গ্রহণ করতে ইচ্ছা জাগে। কিন্তু মুসলমানদের চরিত্র দেখলে সে ইচ্ছা দূর হয়ে যায়। আরেকজন ইংরেজ কুরআন পড়া শুরু করার পর কুরআনের অমিয়বাণী তাদের হৃদয় আকৃষ্ট করতে লাগলো। তারপর তিনি মুসলমানদের কাছে জানতে চান তোমরা যে কুরআন মেনে চলো সে কুরআন আমাকে একটু দেখাও। মুসলমানদের কাছ থেকে জবাব এলো তোমার কাছে যে কুরআন আছে সেই কুরআনই আমরা মেনে চলি। আমাদের কুরআন একটিই। তখন তিনি বললেন, না আমার কাছে যে কুরআন আছে সে কুরআনে যা লেখা আছে তার সাথে তোমাদের চরিত্রের কোনো মিল নেই। তাই আমার কাছে মনে হয়েছে তোমাদের কুরআন দু’টি। একটি পড়ার জন্য আর আরেকটি আমল করার জন্য।

আমরা যদি কুরআনের বিজয় চাই তাহলে আমাদেরকে কুরআন অনুযায়ী জীবন গঠন করতে হবে। কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে বোঝার জন্য। বুঝতে হবে আমল করার জন্য। আর শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত-বন্দেগির বিধান আমল করলেই চলবে না বরং সামাজিক বিধিবিধান আমল করার জন্যও আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। যে সমাজে কুরআনের বিধিবিধান কায়েম নেই সে সমাজে কুরআনের বিধিবিধান কায়েমের সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে এবং কুরআনি সমাজ কায়েম করার স্বপ্ন নিয়ে মানুষদেরকে কুরআনের পথে আসার উদাত্ত আহবান জানাতে হবে।কুরআনের যে সমাজ আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চাই সে সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষের মর্যাদা ও অধিকার কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে তা তুলে ধরতে হবে। অর্থাৎ মানুষকে বোঝাতে হবে কুরআনি সমাজ কায়েম হওয়ার অর্থ হচ্ছে কোন মানুষ কোন মানুষের দাসত্ব করতে হবে না। সকল মানুষ মানুষ হিসেবে সমান মর্যাদার অধিকারী। সাদা-কালো আরব-আজমের মধ্যে সম্মান ও মর্যাদার কোন পার্থক্য হবে না। সম্মান ও মর্যাদার মানদন্ড হবে তাকওয়া। তাই কুরআনি সমাজে ভাষার ও বর্ণের বড়ত্ব কিংবা লড়াই নেই।

আমরা যে সমাজে বসবাস করছি এ সমাজকে জাহেলি সমাজ বা গায়রে ইসলামী সমাজ যে নামেই অভিহিত করি না কেন এ সমাজের শাখা-প্রশাখা অনেক গভীরে গ্রথিত। শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, শিল্প-সাহিত্য, কলা সকল ক্ষেত্রেই জাহেলি দর্শন কাজ করছে। তাই কুরআনি সমাজ মানে এসব ক্ষেত্রে প্রলেপ দেয়া নয় কিংবা এসকল কিছুর আংশিক রদবদল নয় বরং ব্যাপক ও সার্বিক পরিবর্তনই প্রয়োজন। এ পরিবর্তন আনয়নের মতো যোগ্যতাসম্পন্ন একদল বাহিনী কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরি। এ জরুরত ঐচ্ছিক নয় বরং আবশ্যিক। এ আবশ্যিক জরুরত পূরণে যত বিলম্ব হবে ইসলামী সমাজ তথা কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠায় তত বিলম্ব হবে। বর্তমান সভ্যতা পরিবর্তন করে নতুন সভ্যতা গড়বার মতো যোগ্যতা যদি মুসলমানদের না থাকে তাহলে আল্লাহ মুসলমানদের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করবেন না।

কুরআনি সমাজ কায়েম করার জন্য এর স্বপক্ষে জনমত সংঘটিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন বর্তমান সমাজের ক্ষতিকর দিকগুলো জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা। কুরআনি সমাজব্যবস্থায় তার উত্তম বিকল্প কী হবে তাও জনতার সামনে হাজির করা। এ কথা পরিষ্কার করতে হবে যে কুরআনি সমাজে দেশের আমূল পরিবর্তন সাধিত হওয়ার অর্থ এ নয় যে কাঠামোগত সব কিছু পরিবর্তন হয়ে যাবে। বর্তমান সমাজ কাঠামোর এমন অনেক দিক আছে যা কুরআনি সমাজেও অব্যাহত থাকতে পারে। কুরআনি সমাজে সব কিছুর দার্শনিক ও আদর্শিক পরিবর্তন সাধিত হবে। কাঠামোগত পরিবর্তন জনগণের সুবিধার সাথে সম্পৃক্ত। মানুষের সুখ শান্তি নিশ্চিত করার জন্য বর্তমান কাঠামোর যে দিকটি পরিবর্তন করা দরকার হবে শুধু সেই দিকটিই পরিবর্তন হবে।

আজকের বিশ্ব যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা শক্তির জোরে শাসন করলেও তাদের মধ্যে শক্তি প্রদর্শনের বৈষয়িক যোগ্যতা আছে। আমরা যারা কুরআনি সমাজ কায়েম করতে চাই তাদের মধ্যে তাদের শক্তির মোকাবেলা করার হিম্মতের যেমনি অভাব আছে তেমনি সেই হিম্মত প্রদর্শনের বৈষয়িক শক্তি সামর্থ্যরেও ঘাটতি রয়েছে। ওরা যখন অস্ত্রের ভাষায় কথা বলে সেই ভাষার জবাব বক্তৃতা বিবৃতি হতে পারে না। অস্ত্রের ভাষার জবাব অস্ত্র দিয়েই দিতে হবে। অস্ত্রের পরিমাণ ও সংখ্যার মধ্যে তারতম্য থাকতে পারে। কিন্তু অস্ত্রের মানের ক্ষেত্রে তারতম্য থাকলে চলবে না। পারমাণবিক অস্ত্রের মোকাবেলায় পারমাণবিক অস্ত্র থাকা চাই। লাঠি ও বল্লম দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্রের মোকাবেলা হতে পারে না। হ্যাঁ আল্লাহর সেই কুদরত আছে তিনি গায়েবি মদদ দিয়ে অস্ত্র ছাড়াও মুসলমানদেরকে বিজয় দান করতে পারেন। আবার প্রচুর অস্ত্র থাকলেও আল্লাহর রহমত না হলে পরাজিত হতে পারে। আল্লাহর রহমতই মুসলমানদের বিজয়ী হওয়ার মৌলিক কারণ হলেও আল্লাহ তাঁর সুন্নাতের বাইরে শিক্ষণীয় কতিপয় দৃষ্টান্ত ছাড়া কাউকে সাহায্য করেন না। যদি সাহায্য করতেন তাহলে তাঁর রাসূলকে তায়েফে, উহুদে কাফেরদের বাধার মোকাবেলায় রক্ত দিতে হতো না। আল্লাহর রাসূল বদরের যুদ্ধে তদানীন্তন সময়ের আলোকে শক্তি সামর্থ্য অনুযায়ী সমর প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। হতে পারে সংখ্যার দিক থেকে এ প্রস্তুতি কাফেরদের তুলনায় কম ছিল কিন্তু মুসলমানদের ঈমানী শক্তির কারণে সে কমতি গায়েবি মদদে পুষিয়ে দেয়া হয়। আজকের যুগেও ফেরেশতা দিয়ে আল্লাহ মদদ করতে সক্ষম। প্রয়োজন হচ্ছে সত্যিকার ঈমান ও কুরআনবিরোধীদের বাধা মোকাবেলা করার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ ও প্রস্তুতি।

কুরআনি সমাজ কায়েম করার কথা আল কুরআনের যত জায়গায় এসেছে সকল জায়গায় জান ও মালের কথা সমানভাবে বলা হয়েছে। এর অর্থ এই যে কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু সময় শ্রম দিলে হবে না। এর জন্য অর্থও দিতে হবে। কাফেররা দুনিয়াতে ধন-দৌলতের পেছনে দৌড়ায় এ ক্ষেত্রে বৈধ বা অবৈধ কোন সীমারেখায় তারা বিশ্বাসী নয়। মুসলমানরা ধনের পূজারি হবে না তবে বৈধ পন্থায় ধন উপার্জন করার চেষ্টা করতে হবে। ইসলাম হালাল পন্থায় উপার্জনকে উৎসাহিত করেছে। এ কারণে একজন সৎ ব্যবসায়ীকে আল্লাহর হাবিবের বন্ধু বলা হয়েছে। কারণ হচ্ছে কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য এমন অনেক প্রজেক্ট হাতে নিতে হয় যেসব প্রজেক্ট বাস্তবায়নে প্রচুর টাকার দরকার হয়। গণভিত্তি রচনা করতে হলে গণমুখী কর্মসূচি নিতে হবে। শুধু রাজনৈতিক গণমুখী কর্মসূচি নিলে চলবে না মানুষের সেবামূলক কর্মসূচিও নিতে হবে। এ জন্য কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠাকামীদের বৈধ পন্থায় উপার্জন ও উপার্জনের একটি অংশ দ্বীন প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন প্রজেক্টে খরচ করতে হবে। আমার জানামতে ইহুদি অনেক কোম্পানি আছে যারা প্রতি সপ্তাহে একদিনের লাভ ইসরাইলের জন্য ব্যয় করেন। তার বিপরীতে মুসলমানরা তাদের সম্পদ পরিকল্পিতভাবে ব্যয় করার পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় কিংবা কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যয় করছে বা অপচয় করছে। মুসলমানরা সামষ্টিকভাবে কিছু করুক বা না করুক কিছু ব্যক্তি যদি ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে সমাজে কিছু করার চেষ্টা করেন, তাহলে দেখা যাবে একদিন ক্ষুদ্র ব্যক্তি চেষ্টা মহীরুহে পরিণত হয়ে সমাজে বিরাট প্রভাব ফেলবে।

বর্তমান বিশ্ব তথ্য ও প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে গেছে। আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির উত্তম প্রয়োগ ছাড়া বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কুরআন যে যুগে নাজিল হয় সে সময় মোবাইল ফোন ছিল না। তাই তদানীন্তন কাফের মুশরিকদের বুঝতে কষ্ট হতো কিভাবে আল্লাহ রাসূলে কারিম (সা)-এর প্রতি অহি নাজিল করেন। জিবরাইল যখন অহি নিয়ে আসতেন তখন কেউ চোখে তা দেখতো না। তাই কুরআন কি আল্লাহর বাণী না কি মুহাম্মদ (সা) বানিয়ে বলছেন সে সন্দেহ তদানীন্তন অনেক কাফের ও মুশরিক পোষণ করতো। বর্তমান যুগে মোবাইল আবিষ্কারের ফলে সে যুক্তি ধোপে টিকে না। যদিও বর্তমান সময়েও একই প্রশ্ন অনেক নাস্তিক করে থাকেন। এ ধরনের প্রশ্ন নিছক প্রশ্নের জন্য প্রশ্ন বৈ আর কিছুই নয়। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির উৎকর্ষতার কারণে কুরআন বোঝা যেমনি সহজ হয়েছে তেমনি কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠাকামীদের দায়িত্বও অনেক বেড়েছে। এসব তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করা বৈধ কি অবৈধ এ নিয়ে বিতর্ক করার পরিবর্তে এর চেয়ে উন্নত প্রযুক্তি আবিষ্কারের যোগ্যতা মুসলমানদেরকে অর্জন করতে হবে। মুসলমানরা আজ তথ্যপ্রযুক্তিতে অনেক পেছনে থাকার কারণে পাশ্চাত্য তাদেরকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। যে পাশ্চাত্য আজকে অনেক কিছু আবিষ্কারের জন্য বড়াই করছে সেই পাশ্চাত্য একদিন জ্ঞান শেখার জন্য মুসলিম দেশে দেশে ঘুরেছে। আফসোসের বিষয় হচ্ছে মুসলমানদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করে তারা আজ অনেক জ্ঞানী। আজ আমরা শুধু অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র নই, জ্ঞানের ক্ষেত্রেও দরিদ্র। আমাদের অর্থনৈতিক দরিদ্রতার চেয়ে জ্ঞানের ক্ষেত্রে দৈন্যতা অনেক বেশি।

আমরা যেই সমাজে দ্বীন কায়েম করতে চাই সে সমাজকে ভালোভাবে বুঝতে হবে। সে সমাজের শক্তি, দুর্বলতা ভালোভাবে স্টাডি করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা মহাগ্রন্থ আল কুরআনে অতীত জাতিসমূহের ইতিহাস শুধু গল্প শোনাবার জন্য তুলে ধরেননি। অতীত জাতিসমূহের ইতিহাসের সাথে অনেক শিক্ষা জড়িত। ফেরাউনের ইতিহাস এ কথারই প্রমাণ দেয় আজকের যুগের ফেরাউনদেরকেও আল্লাহ ধ্বংস করতে সক্ষম। শুধু প্রয়োজন হচ্ছে মূসার মতো বলিষ্ঠ ঈমান ও আল্লাহর বিধান কায়েমের দৃঢ় প্রত্যয়।

কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠাকামীদের করণীয়
কুরআনি সমাজ যারা প্রতিষ্ঠা করতে চান তাদেরকে নীরবে নিজেদের কর্মকান্ড পর্যালোচনা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এ পর্যালোচনার মাধ্যমে অতীতের ভুল ভ্রান্তি চোখের সামনে রেখে ভবিষ্যতে নির্ভুল পথে চলার চেষ্টা করতে হবে। কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় বদর ও উহুদ যুদ্ধে মুসলমানরা কি ভুল করেছিল তার উল্লেখ আছে। এ উল্লেখ ভুল ধরে দিয়ে কাউকে লজ্জা দেয়ার জন্য ছিল না। বরং ভবিষ্যত কর্মপন্থা আরও নির্ভুল করার জন্য প্রয়োজন ছিল। আজকে আমরা যে কর্মপন্থা অনুসরণ করছি তাতে কোন ভুল আছে কি না মাঝে মধ্যে তার পর্যালোচনা হওয়া উচিত। এর অর্থ এই নয় যে যেসব দেশে আন্দোলন বিজয়ী হতে পারছে না সেসব দেশের কর্মপন্থায় ভুল আছে! আন্দোলনের কর্মপন্থা নির্ভুল হওয়ার পরও আন্দোলন জয় লাভ করতে নাও পারে। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে অতীতে অনেক নবী-রাসূলের আন্দোলন সফল হয়নি। তার অর্থ হচ্ছে নবীদের দাওয়াত ও কর্মপদ্ধতি সঠিকই ছিল। সে সময়কার জনসাধারণ দ্বীনে হক্কের দাওয়াত কবুল করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই আজকের যুগেও আন্দোলনের কাক্সিক্ষত সফলতা দেখতে না পেয়ে হতাশ হওয়া ঠিক হবে না। বাস্তবতা হচ্ছে অনেক সময় শয়তান এ ধরনের ওযাসওয়াসা দিয়ে আন্দোলনের নিষ্ঠাবান একদল কর্মীবাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে।

অনেক সময় দেখা যায় একটু সফলতায় অনেকে খুব বেশি উৎফল্ল হয়ে ওঠেন। উহুদ যুদ্ধে প্রথম পর্যায়ের সফলতার পরও যদি ময়দানে দৃঢ়তার সাথে অবস্থান করা হতো তাহলে পরবর্তী পর্যায়ে পরাজয়ের গ্লানি পোহাতে হতো না। তাই কোথাও একবার জয় লাভ করলেই চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছে মনে করা ঠিক হবে না। মনে রাখতে হবে প্রাথমিক জয়ের পরই শত্রুপক্ষের আঘাত আরও বাড়তে পারে। সাম্প্রতিক কালের ইরান বিপ্লবের পর এ কথা আরও ভালোভাবে প্রমাণিত হয়েছে। শত্রুপক্ষ শুধু বাহির থেকে নয়, ভেতর থেকেও দুর্বল করার চেষ্টা করতে পারে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও পূর্ব প্রস্তুতি আগ থেকেই থাকতে হবে।

কুরআনের কথা বলতে গেলে বাধা আসবে। রাসূলে কারিম (সা)-এর ইতিহাস এ কথারই সাক্ষ্য বহন করে যে বর্তমান সমাজ পরিবর্তনের কথা বলার সাথে সাথেই এ সমাজের সুবিধাভোগীরা একজোট হয়ে কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন যেন সফল না হয় সে চেষ্টা করবে। এ ক্ষেত্রে নেতৃত্বকে নাগরিকত্ব হরণ, দেশান্তর ও অন্তরীণ থাকার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়াও বিচিত্র নয়। কর্মীবাহিনীকেও জন্মভূমি থেকে হিজরত, ব্যবসা বাণিজ্যে লোকসান, অর্থনৈতিক সঙ্কটের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। ভয়ভীতি, লোভ দেখিয়ে কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা হতে পারে। এ সময় কেউ আন্দোলনে অটল অবিচল থাকলে তাদেরকে হত্যার পরিকল্পনাও নেয়া হতে পারে। তাদেরকে সন্ত্রাসী, দেশদ্রোহী, প্রতিক্রিয়াশীলসহ নানা অপবাদে অভিযুক্ত করে জনমনে হেয় করার চেষ্টা হতে পারে। এমতাবস্থায় কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠাকামীরা যেন পিছপা না হন, মনোবল চাঙ্গা রাখার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ রাখতে হবে।

কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে সমমনা দল ও গ্রুপের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেয়াও আবশ্যক হতে পারে। রাসূলে কারিম (সা) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর মদিনা সনদের মাধ্যমে যাদের সাথে ঐক্য করেছিলেন তারা সবাই আল্লাহর রাসূলের রেসালাতে বিশ্বাসী ছিলেন না। কুরআনি আইন প্রতিষ্ঠা সে ঐক্যের মূলমন্ত্র ছিল না। সে ঐক্য হয়েছিল মদিনাকে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালনের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে। রাসূলে কারিম (সা) এ ধরনের ঐক্য করেই মদিনায় নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। আর এ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই পরবর্তীতে দ্বীন কায়েমের পথ সুগম হয়েছিল।যাদের সাথে চুক্তি হয় তারা কখনও কখনও চুক্তি ভঙ্গ করতে পারে। ভেতরে ভেতরে ক্ষতি করতে পারে। এমতাবস্থায় যথাসম্ভব চুক্তি রক্ষার চেষ্টা করার পরও যদি ঐক্যবদ্ধ থাকা সম্ভব না হয় তাহলে প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

নেতৃত্ব কর্তৃক অনেক সময় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে যা আপাতদৃষ্টিতে অকল্যাণকর কিংবা অপমানজনক মনে হতে পারে। যেমন হুদায়বিয়ার সন্ধির পর হযরত উমর ফারুকের মতো উঁচু পর্যায়ের সাহাবী রাসূলে কারিম (সা)-কে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি কি আল্লাহর রাসূল নন? তাহলে এ অপমানজনক চুক্তি কেন?’ এ কথা ঐতিহাসিক সত্য যে হুদায়বিয়ার সেই চুক্তিই পরবর্তীতে মক্কা বিজয়ের পথ সুগম করেছিল। তাই নেতৃত্বের কোন সিদ্ধান্ত প্রশ্নবোধক হলেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠা ঠিক নয়। আবার এ ধরনের পরিস্থিতিতে নেতৃত্বকে ধৈর্য ও হেকমত অবলম্বন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

কুরআনি সমাজ কায়েম করার জন্য যারা অর্থ, সময়, শ্রম ও মেধা ব্যয়ের সুযোগ পান তাদেরকে এর জন্য আল্লাহর শোকর গোজার হতে হবে। যেসব মুসলমান এখনও এ আন্দোলনে শরিক হননি তাদের চেয়ে নিজেদেরকে উত্তম ভাবার রোগ যেন আক্রান্ত করতে না পারে এ জন্য সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। যেসব মুসলমান কুরআনকে ব্যক্তিগত ইবাদত বন্দেগিতে অনুসরণ করেন কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রপরিচালনায় কুরআনের হেদায়েত অনুসরণ করার বিরোধিতা করেন তাদেরকে দরদভরা মন নিয়ে বোঝাতে হবে। তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার মতো উদার মনের অধিকারী হতে হবে। মনে রাখতে হবে যেসব মুসলমান কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এখনও শরিক হয়নি তারা একদিন এ আন্দোলনের নেতা হতে পারেন। হযরত উমর (রা) কুরআনের কথা বন্ধ করতে এসে কুরআনের রাজ প্রতিষ্ঠায় শপথ নেন। তাই আজকের যুগেও কুরআন যারা মানে না তাদের মধ্যেই কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাবার মতো অনেক নেতা আছেন। সময়ের ব্যবধানে তাঁদেরকে কুরআনের মিছিলে দেখা যাবে ইনশাআল্লাহ।

কুরআনি সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শরিক হওয়ার অর্থ এ নয় যে নিজের পরিবার পরিজন, ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজনের অধিকার আদায় করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে সদাব্যস্ত সময় কাটানো। আমরা যেই কুরআনের কথা মানুষকে বলতে চাই সে কথা প্রথম নিজের নফসকে বলা আমাদের দায়িত্ব। নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করার দাওয়াত দেয়ার পর নিজের পরিবার পরিজন, ছেলেসন্তান, আত্মীয়স্বজনকে দ্বীনের দাওয়াত দিতে হবে। এ কারণেই আল্লাহ কুরআনে নিজের নফস ও আহলকে দোজখের আগুন থেকে বাঁচানোর কথা বলেছেন। আল্লাহ বাইরের মানুষদেরকে দাওয়াত দেয়ার আগে নিজের নিকটাত্মীয়দের মধ্যে দাওয়াতি কাজ করার কথা বলেছেন। অথচ অনেক সময় দেখা যায় আমরা বাইরের দাওয়াতি কাজে সব সময় এত বেশি ব্যস্ত থাকি যে নিজের আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত দানের সময় পাই না। আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত দান ও তাদের হক আদায় করা ফরজ। এ ফরজ পালন করা থেকে গাফেল থাকার কোনো সুযোগ নেই।

কুরআনি সমাজ কায়েম করার জন্য যারা চেষ্টা প্রচেষ্টা করছেন তাদেরকে রাসূলে কারিম (সা)-এর প্রশিক্ষণ ও দাওয়াতি কাজের পদ্ধতি থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আল্লাহর রাসূল খুব লম্বা বক্তব্য প্রদান করতেন না। তিনি সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থবোধক ভাষায় হেদায়েত দিতেন। একই সাথে অনেক বিষয় বলতেন না। এক সময় এক বিষয়ে গুরুত্ব দিতেন এবং তাতে অভ্যস্ত করে তুলতেন।

আজ মানুষ কুরআন নাজিলের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে অনেক দূরে। তাই আল্লাহ তায়ালা উম্মতে মুসলিমাহকে কুরআন নাজিলের উদ্দেশ্য অনুধাবন করে, কুরআনের সমাজ নির্মাণে এগিয়ে আসার তাওফিক দান করুন। কুরআন নাজিলের হক আদায় করার শক্তি দান করুন। আমিন।
লেখক : কেন্দ্রীয় সাহিত্য সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

সংশ্লিষ্ট