আব্দুল আলীম

মৌসূমী মুসল্লীঃ প্রেক্ষিত রমজান

মুসলমানদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাস হল পবিত্র মাহে রমজান । এ মাসের মাধ্যমে একজন মুসলমান তার অতীতের গুনাহ সমূহ মাফ করিয়ে নিতে পারে । অর্জন করতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ তা হল “তাকওয়া” । সূরা বাকারার ১৮৩ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন -“হে ঈমানদারগণ তোমাদের ওপর রোযাকে ফরজ করা হয়েছে । যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর । আশা করা যায় তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারবে” । এ আয়াত দ্বারা বুঝা যায়,রমজানের মূল উদ্দেশ্য হল ঈমানদারদের তাকওয়া অর্জনের সুযোগ করে দেয়া । কিন্তু খুব কম মানুষই ভাল করে তাকওয়া’র সঠিক অর্থ বুঝে । তাকওয়ার মূল অর্থ হল-বেচেঁ থাকা,দূরে থাকা,ভয় করা । যেমন মহান আল্লাহ তায়ালা সুরা বাকারার ২০১ নং আয়াতে বলেন-“হে আল্লাহ,তুমি আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ দান কর এবং দোযখের আযাব থেকে বাচাঁও/ মুক্তি দাও” । সুরা তাহরীম- ৬ নং আয়াতে বলেন--“হে ঈমানদারগন,তোমরা নিজে এবং তোমার আহল পরিবার কে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও”।সুরা হাশরের ১৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে- “হে ঈমারদারগন ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর । প্রত্যেক ব্যক্তির লক্ষ্য রাখা উচিত,সে আগামীকালের(কিয়ামত দিবসের ) জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছে ??”

যাই হোক আমার আলোচনা তাকওয়া নিয়ে নয় । আলোচনার মূল বিষয়-কাদের জন্য এই রমজান এবং কারা কিভাবে এটা ব্যবহার করে ? আমার আজকের এই লেখা পড়ে মুসলমানদের মধ্যে বড় একটা অংশ হয়তোবা অসন্তুষ্ট হবে । কিন্তু কিছু করার নাই । কুরআন হাদীসের শিক্ষা এবং বাস্তবতা মিলিয়েই আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস ।

প্রথমত আমরা দেখব রমজান মাস কাদের জন্য। মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআনে অনেক ভাবে মানুষ কে আহবান করেছেন।যেমন- হে আদম সন্তান,হে মানবজাতি, হে আমার বান্দা। তার মধ্যে অন্যতম আহবান হল হে হে ঈমানদারগন! মহান আল্লাহ তায়ালা রমজানের রোজা ফরজ করেছেন এমনি একটি সুন্দর আহবান দিয়ে । একথা দ্বারা স্পষ্ট যে রমজান শুধুমাত্র ঈমানদারদের জন্য। কাফির,মুশরিকদের জন্য নয়। আবার প্রশ্ন হল, মুমিন কারা ? মুমিনের সংজ্ঞা আমরা কুরআন-হাদিস থেকে পাই। সুরা মুমিনুনের ১-১০ নং আয়াতে বলা হয়েছে- ”নিশ্চয়ই ঈমানদাররা সফল হয়ে গেছে, যারা তাদের নামাজে খুশু খুজু অর্জন করেছে(বিনয়ী).... তারা তাদের নামাজের হেফাজত করে ।”

রাসূলে করীম (সঃ) হাদীসে ঈমানের ব্যাপারে বলেছেন-ঈমানের সমষ্টি হল“মুখে স্বীকার, অন্তরে বিশ্বাস এবং বাস্তবে আমল।” এ বিষয়গুলো সবারই জানা । অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন - “যে ব্যক্তি আল্লাহ কে প্রভু,ইসলাম কে দ্বীন এবং মুহাম্মদ (সঃ) কে রাসূল হিসাবে মেনে নেয় তারা তাদের ঈমানকে পূর্ণ করে নিল” । ঈমানের আরও ব্যাখ্যা কুরআনের সূরা মায়েদার-৫৪ এবং সুরা আহযাবের ৬৯ নং আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে ।

ঈমান আনার পর একজন মুমিনের প্রথম কাজ হল ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা । কিন্তু অনেক ঈমানদারই আছে যারা নামাজ না পড়ে ঈমান ঠিক আছে বলে দাবী করে । সর্বোপরি কুরআন ও হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী তাদের জন্য রমজান যারা ঈমানদার অর্থাৎ যারা ৫ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে । কিন্তু বাস্তবে আমরা কি দেখি ? বাংলাদেশের কথাই যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে দেখা যাবে শতকরা ২০% লোক ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে ।কিন্তু রমজান মাসে রোজা তো প্রায় সবাই পালন করে । এমনকি অধিকাংশ মুসলমান ৫ ওয়াক্তনামাজ পড়াও শুরু করে ।

মৌসূমী মুসল্লি সমাজে তাদেরকে বলা হয়, যারা রমজান মাস আসলে নামাজ পড়া শুরু করে এবং ঈদুল ফিতরের দিন যোহর থেকে আবারও ১১ মাসের জন্য বিশ্রাম নেয় । আমার প্রশ্ন হল- কুরআন হাদীসের কোথাও কি এটা আছে যে, শুধুমাত্র রমজানে নামাজ পড়া বাধ্যতামুলক অন্য মাসে না পড়লেও চলবে..?? সুতরাং বুঝা যায়, এটা আল্লাহর সাথে এক ধরনের প্রতারনা । কোন দলীলের ভিত্তিতে এ সকল মুসল্লিনামাজ ধরেন এবং ছাড়েন ?

আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এটাকে তাঁর সাথে ঠাট্টা বিদ্রুপ বলে উল্লেখ করেছেন । সুরা বাকারার ১৩ ও ১৪ নং আয়াতে বর্ণনা করেন -“তারা মনে করে আমরা আল্লাহর সাথে মস্করা করি । আসলে আল্লাহই তাদের সাথে মস্করা করেন” । একই সুরার ৮৫নং আয়াতেও বলেছেন-“তোমরা কিছু অংশের প্রতি ঈমান আনবে কিছু অংশের প্রতি ঈমান আনবেনা, এরকম যারা কারে তাদের জন্য দুনিয়ায় লাঞ্চনা এবং কিয়ামত দিবসে কঠোর শাস্তি রয়েছে” ।

মৌসূমী মুসল্লি এজন্য বলা হয় যে, রমজান মাস আসলে তারা নামাজ শুরু করে এবং এ মাস শেষে নামাজ ছেড়ে দেয় । এমনও দেখা গেছে-আজ চাঁদ দেখা গেলে রাতে তারাবী হবে তাই সে প্রস্তুত ছিল,কিন্তু কোনক্রমে চাঁদ দেখা না গেলে সেদিন আর এশা নামাজে যায়না । অন্যদিকে ঈদুল ফিতরের দিন যোহরের নামাজও অনেক পড়েনা । কারণ রমজান তো শেষ ,মৌসূম শেষ!!!

এবার আসব কয়েকটি যৌক্তিক ব্যাখ্যায় । যার মাধ্যমে বুঝতে সহজ হবে যে, এরকম মৌসুমী মুসল্লিদের জন্য আল্লাহ তায়ালা রমজান দেননি ।

রমজান শব্দটি উর্দু/ফারসী-এর মূল হল-“রমজ” এর অর্থ হল-জালিয়ে দেয়া,পুড়িয়ে দেয়া,ভস্মীমূত করা । ইংরেজীতে বলা হয়-Remove,Refrsh. যা মানুষের গুনাহ বা দোষ ত্রুটি গুলোকে মুছে দেয় । মুসলমানরা আবারও একটি সজীব সুন্দর ও গুনাহমুক্ত জীবন লাভ করে । আমরা দেখি কম্পিউটার প্রোগ্রাম সমূহে বা সফটওয়্যারে যখন Virus আক্রমণ করে তখন Anti-Virus প্রয়োজন হয় সেটাকে Remove করার জন্য । সহজে একটা কথা ভাবুন তো; রমজান যদি একটি Anti-Virus হয় তাহলে এটা তো তাদেরই প্রয়োজন যাদের কম্পিউটার (ঈমান) আছে । কিন্তু কম্পিউটার নাই বা মোবাইল ডিভাইসও নেই Anti-Virus ক্রয় করে- এরকম কোন পাগল কি আছে ? সুতরাং বুঝা যায়- যারা ১১টি মাস ঈমানের ভিত্তিতে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়েছে এবং সর্ব পর্যায়ে কম্পিউটার নামক ঈমান নিয়ে জীবন পরিচালনা করেছে তাদের জন্যই এই Anti-Virus রমজান । যাদের ঈমান ছিলোনা, ঈমানের দাবী অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করেনি তাদের জন্য এই রমজান নয় । বাকী ১১ মাস ঈমানের পথে চলতে গিয়ে যে ভূলগুলো হয়েছিল সেগুলো সংশোধনের জন্য এই রমজান । হ্যাঁ, তবে যদি কেউ নতুনভাবে ঈমান নামক কম্পিউটার/ডিভাইস কিনতে চায় তাহলে নিতে পারবে কিন্তু ঈদুল ফিতরের দিন বিক্রয় করা যাবেনা ।

অন্য কথায় যদি আমরা ধরি রমজান একটি বোনাস, তাহলে যাদের চাকুরী আছে তারাই তো বোনাস পাবে । আম জনতার জন্য তো বোনাস নয় । একজন মুদি দোকানদার যদি আপনাকে বলে-২টা কাপড় কাঁচা সাবান কিনলে মাখা সাবান ফ্রি । এর মানে এটা নয় যে, আপনি মূলটা না কিনে ফ্রি টা পাবেন । সুতরাং যারা মূল ঈমান অনুযায়ী সারা বছর চলার চেষ্টা করে তাদের জন্য এই বোনাস রমজান ।

উল্লেখ্য যে, রমজান তো ফরজ এটা সবার পালন করা কর্তব্য । তাই সবাইকে পালন করতে হবে । কিন্তু এটা তো একটা প্রশিক্ষণ । এ অনুযায়ী বাকী সময় আপনাকে জীবন পরিচালনা করতে হবে,এই সময়ে যে ভুলগুলো হবে তা সংশোধনের জন্য ১১ মাস পর আবারও Anti-Virus দেয়া হবে। এজন্যই আল্লাহ তায়ালারমজান দিয়েছেন । আমরা দুনিয়ার নিয়মে যা দেখি তা হল-কোন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেয়ার মানে বাকী জীবন এই প্রশিক্ষণ কে কাজে লাগানো । যেমন ধরা যাক সেনাবাহিনীতে চাকুরী পেয়ে যারা ট্রেনিং করেন অনেক কষ্ট করেন । তাদেরকে বুঝিয়ে দেয়া হয়, যতদিন চাকুরী করবে ততদিন এই প্রশিক্ষন অনুযায়ী চলবে । এর বিপরীত হলে কমান্ডিং অফিসার তাকে শাস্তি প্রদান করবে অথবা চাকুরীও চলে যেতে পারে । সুতরাং আমি যা বুঝাতে চাইলাম তা হল কোন প্রশিক্ষণ নেওয়ার অর্থ হল সেটা অনুযায়ী পরবর্তীতে কাজ করা, ভুলে যাওয়া বা ছুঁড়ে ফেলা নয় ।

রমজান মাস একটি প্রশিক্ষণের মাস । এ মাসে আমরা যা চৎধপঃরপব করি, তা বাকী ১১টি মাস মেনে চলতে হবে । কিন্তু দেখা যায় উল্টো চিত্র । এমাসে নামাজ পড়ে বাকী মাসগুলোতে খবর নাই । তাহলে বুঝা যাচ্ছে,রমজানের সঠিক শিক্ষা অর্জিত হয় না অথবা গুরুত্ব জানা নাই ।

রমজান একটি পাওয়ার ব্যাংকের নাম । পাওয়ার ব্যাংক যেমন মোবাইল বা ডিভাইস কে রিচার্জ করে তেমনি রমজান মুসলমানদের ঈমানকে রিচার্জ করে দেয় । কারও যদি মোবাইলই না থাকে তাহলে পাওয়ার ব্যাংক প্রয়োজন নাই।

প্রকৃত ভয়ংকর চিত্র হল প্রথম ৭/৮ রমজান মসজিদ গুলোতে যে পরিমাণ মুসল্লী হয় আস্তে আস্তে দিন যত যায় কমতে থাকে । আবার ২৫ রমজানের পরে আবারও বাড়তে থাকে । ভাবখানা দেখে মনে হয় কয়েকদিন হাজিরা দিয়ে আল্লাহর কাছ থেকে সব আদায় করে নিবে (নাউযুবিল্লাহ) ।

খুব কষ্ট লাগে যখন মৌসুমী মুসল্লিদের চাপে নিয়মিত মুসল্লিরা মসজিদে জায়গা পায়না । তাদের ভাবসাব দেখে মনে হয় তারাই আসল নামাজী । অথচ ঈদের পরে তাদের খুজেঁ পাওয়া যায়না ।সার্বিক দিক দেখে মনেহয় রমজান একটি আনুষ্ঠানিকতার নাম ।

তবে এজন্য আলেম সমাজও কম দায়ী নন । কেননা ইমাম সাহেব বা আলেমরা শুধু রমজানের ফজীলত বর্ণনা করেন । কোন আমল করলে কত সওয়াব.... !!রমজান কেন আসল, কাদের জন্য, এর প্রকৃত শিক্ষা কি ,বাকী ১১ মাস কিভাবে চলব ? এর কোন বাস্তব শিক্ষা আলোচনা করেন না । কারণ, যদি চাকুরী (ইমামতি) চলে যায় !! তাঁরা যদি কঠোর ভাবে এগুলো বলত তাহলে হয়ত মৌসুমী মুসল্লিরা কিছুটা লজ্জা পেয়ে হলেও নিয়মিত মুসল্লিতে পরিণত হত ।

পরিশেষে বলতে চাই,আসুন মৌসূমী মুসল্লী হয়ে ভাবসাব দেখিয়ে নয়- রমজানের আসল শিক্ষা গ্রহণ করে নিয়মিত মুসল্লিতে পরিণত হই এবং আল্লাহর দেয়া প্রকৃত তাকওয়া অর্জন করি, যা আমাদের কে জান্নাতে যেতে সহযোগিতা করবে । কেননা মুত্তাকীদের জন্যই জান্নাত তৈরী করা হয়েছে । মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-“দৌড়াও তোমার রবের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে যা তৈরী করা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য।” (সুরা ইমরান-১৩৩)। তিনি আরও বলেন- যারা মুত্তাকী তারা আল্লাহর কাছে সবচাইতে বেশী সম্মানিত (সূরা হুজরাত-১৩)।মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র মাহে রমজান মাসে রোজা পালনের মাধ্যমে আমাদের সত্যিকারের একজন মুত্তাকী হওয়ার তাওফিক দিন । (আমীন)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 

 

সংশ্লিষ্ট