আ ব ম খোরশিদ আলম খান

বদর দিবস : অন্যায় অসত্যের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের প্রেরণা

মাহে রমযানের ১৭তম দিবস ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাসে অতীব তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই দিনে সংঘটিত হয়েছিল ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধ। যে যুদ্ধে সত্যের স্বপক্ষে থাকা মুসলমানরা বিজয়ী হয়েছিলেন অশান্তি বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের বিপক্ষে। তাই বদর দিবস অত্যন্ত সম্মানিত একটি দিবস মুসলমানদের জন্য।

সত্য-নিষ্ঠার চর্চা, অসত্য-অন্যায়ের এবং অন্তরের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে পরিশুদ্ধ হবার মাস। সকল অন্যায় ও গর্হিত কর্মকান্ডের বিপরীতে সত্য ও ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার প্রচেষ্টাই জিহাদ। সত্য-সুন্দরের প্রতিষ্ঠায় অবিরাম চেষ্টা করে যাওয়া এবং অন্যায়-অসত্য রুখতে সর্বোত সংগ্রাম হচ্ছে জিহাদ। কেবল নির্বিচারে ধরে ধরে কাফের খতম বা মানুষ হত্যা কিংবা বিরুদ্ধবাদীদের দমনের নাম জিহাদ নয়;

পৃথিবীতে মানবিক ঐক্য গড়া ও বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনই জিহাদ। সত্য ও সুন্দরের পক্ষে আত্মনিবেদিত হয়ে শোষণ, নিপীড়ন, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও জুলুমতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করা বড় জিহাদ। আরবের আইয়ামে জাহেলিয়াতের নিকষ অন্ধকার থেকে মানুষের মুক্তির প্রয়োজনেই ইসলামের আবির্ভাব অনিবার্য ছিল। নানামুখী জুলুম নিষ্পেষণ ও মানবতাবিরোধী শক্তির দাপটে কলুষিত সমাজ ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে আলোর মশাল হাতে ইসলামের গোড়াপত্তন হয়। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় তখন জিহাদ পরিচালিত হয়। তেমনিভাবে হিজরি দ্বিতীয় সালের ১৭ রমযান (৬২৪ ঈসায়ী সালের ১৩ মার্চ) সংঘটিত হয়েছিল সত্য-অসত্যের চূড়ান্ত ফয়সালাকারী ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ। মুসলমানদের বড় বিজয়ের দিন হিসেবে বদরের যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। দ্বীন প্রচার এবং আল্লাহ ও রাসূলের (সা.) সন্তুষ্টি বিধানে বৈরী শক্তির হুমকি-হিংস্রতার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তখন সশস্ত্র জিহাদ প্রাসঙ্গিক ছিল মুসলমানদের কাছে। সত্য-সুন্দর-সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানবতাকে রক্ষার জন্য মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা.) পক্ষ হতে এ জিহাদ মানবজাতির জন্য বড় ইহসানস্বরূপ। এক কথায় আল্লাহ ও রাসূলের (সা.) প্রদত্ত বিধিবিধান সমাজের সর্বত্র প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্ববাসীর ইহকালের শান্তি ও পরকালের মুক্তির জন্য অবিরাম প্রচেষ্টার নামই জিহাদ। ইসলামের ইতিহাসে সত্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবে ‘বদরের যুদ্ধ’ অতীব মর্যাদাময় একটি বিষয়।

অন্যায়-জুলুম ও অবৈধ আধিপত্য ঠেকাতেই বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। মহানবীর (সা.) মদীনা আগমনের পর ইসলামের পক্ষে সুদৃঢ় জনসমর্থন ও ইসলামের বহুমুখী সফলতা দেখে মুসলমানদের সমূলে উৎখাত ও ধ্বংস করার জন্য দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমযানে আবু জেহেলের নেতৃত্বে বর্বর কুরাইশ দলপতিরা মদিনা অভিমুখে অভিযান চালায়। মদিনা উপকণ্ঠ থেকে ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে বদর নামক স্থানে মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ইসলামের শত্রুরা। মাত্র ৩১৩ জন নিরস্ত্র মুসলমানের বিপরীতে শত্রুদের সংখ্যা ছিল সহস্রাধিক। এক অসম ও কঠিন যুদ্ধে বীরদর্পে লড়াই করে মহান আল্লাহর সাহায্যে মুসলমানরা বিজয় ছিনিয়ে আনেন। এতে ইসলামের জয়যাত্রার পথ সুগম হয়।

আজ ১৭ রমযান যারা বদর দিবস পালন করবে, তাদের এই সময়ের প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে হবে। বিকৃতভাবে ‘বদর যুদ্ধের’ প্রাসঙ্গিকতা এখানে টেনে এনে গোলমাল বাধিয়ে দেয়ার জামায়াতি-হেফাজতি কূটবুদ্ধির ব্যাপারে হক্কানী সত্যনিষ্ঠ আলেমদের সোচ্চার হতে হবে। এর প্রকৃত তাৎপর্য ও বাণী নির্মোহ পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বোঝাতে হবে আমজনতাকে। বলতে হবে, একটি প্রতিষ্ঠিত মদিনা রাষ্ট্রের জনগণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আসা মক্কার দাম্ভিক ও বিপথগামীদের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ মোকাবিলা করতেই মুসলমানরা নিরুপায় হয়ে এতে অংশগ্রহণ করেন। পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পরে কুরআনের বিধান চালু করার জন্য রাসূল (সা.) অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে ইকামতে দ্বীনের কাজ করে যাচ্ছিলেন। মক্কী জীবনের ১৩টি বছর বিরুদ্ধবাদীদের নির্মম অত্যাচারের পরও তিনি থেমে যাননি। অবশেষে আল্লাহর ইচ্ছায় দীর্ঘতম দুঃখের নিশির অবসান হয় এবং আল্লাহর নবী তাঁরই নির্দেশে মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় যান। সেখানে কুরআনের ছাঁচে গঠন করেন সর্বজাতির সহাবস্থানে একটি আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্র। গড়ে তুলেন অসত্য, অন্যায়, শিরক, কুফর ও বাতিলের বিরুদ্ধে এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। কিন্তু মক্কার অবিশ্বাসী বিরুদ্ধবাদীদের কাছে এ এক অসহনীয় ব্যাপার হয়ে উঠল। তারা এটা সহ্য করতে পারল না। তারা আল্লাহর একত্ববাদ ও সার্বভৌমত্ব কায়েমের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল। এ শিশু রাষ্ট্রের মূলেই কুঠারাঘাত করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল। তারা মদিনার সীমান্তে বারবার নাশকতামূলক কার্যকলাপ, লুটতরাজ, সম্পদ বিনষ্ট করে একটি অস্বস্তিকর ও উত্তেজনাময় অবস্থার সৃষ্টি করতে লাগল। এমনকি তারা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এক হীন ষড়যন্ত্র শুরু করে ও রণ সম্ভারে মজবুতি অর্জনে লেগে পড়ে।

অতঃপর সে সিরিয়া থেকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মক্কার উদ্দেশে রওনা হয়। রাসূল (সা.) এ সংবাদ পেয়ে মক্কা থেকে ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে সিরিয়ার পথে ‘বদর’ নামক স্থানে ৮ রমযান সোমবার রাতে সিয়াম পালনকারী তিন শতাধিক মর্দে মুজাহিদকে নিয়ে উপস্থিত হন। এদিকে চতুর আবু সুফিয়ান মক্কার নবীদ্রোহীদের মিথ্যা খবর রটিয়ে দিল, তারা মুসলমানদের কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছে। তাই আবু জেহেলের নেতৃত্বে মক্কার ১ হাজার বিরুদ্ধবাদী সৈন্য রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১৭ রমযান ভোরবেলা তারা মুসলমানদের ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ চালায়। রাসূল (সা.) সিজদায়ে অবনত হয়ে রাব্বুল আলামীনের দরবারে ফরিয়াদ করলেন, ‘হে আল্লাহ! আজ যদি এই মুষ্টিমেয় মুসলিম বাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে তোমার ইবাদত করার মতো এ পৃথিবীতে আর কেউ থাকবে না।’ আল্লাহ এ প্রার্থনা কবুল করলেন এবং ৩ হাজার ফেরেস্তা দিয়ে সাহায্য করলেন। রোজাদার মুসলিম মুজাহিদদের বীরত্ব ও ত্যাগ-তিতিক্ষার ফলে ইসলামের বিজয় পতাকা পৃথিবীর আকাশে উড্ডীন হয়েছিল আজকের এই দিবসে মাহে রমযানেই।

স্বদেশ-স্বজাতির মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় বিদ্রোহীদের ষড়যন্ত্র চক্রান্ত প্রতিরোধেই এ বদর যুদ্ধ জরুরি ছিল। তাই এ যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের অস্তিত্বের লড়াই। নিজেদের ভূখণ্ডে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সংগ্রামের অপর নাম বদরের যুদ্ধ। এ যুদ্ধ ছিল আত্মরক্ষামূলক, আক্রমণাত্মক নয়। ইসলামে আক্রান্ত হলেই যুদ্ধ করার অনুমতি রয়েছে। কোনোভাবেই আগে আক্রমণ ইসলাম অনুমোদন করে না। ইসলাম শান্তি ও মানবতার ধর্ম। অন্যায়ভাবে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে তুচ্ছ বিষয়ে যুদ্ধ-সংঘাতে লিপ্ত হওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। যুদ্ধ-বিগ্রহ মাড়িয়ে কোথাও ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কেবল সশস্ত্র যুদ্ধে ইসলাম প্রতিষ্ঠার নজির ইতিহাসে পাওয়া যায় না। অথচ আজ দুনিয়াজুড়ে ইসলামের নামে কুচক্রীরা সশস্ত্র ও হিংস্র পন্থায় ‘জিহাদ’ শুরু করেছে। অথচ এভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে সন্ত্রাসী কার্যকলাপকে ‘জিহাদ’ বলার সুযোগ নেই। নিরীহ মানুষকে হত্যা ও সন্ত্রাসবাদ কখনো জিহাদ নয়। বহু ইসলামী দল ও সংগঠন প্রতি বছর ‘বদর দিবস’ পালনে নানা কর্মসূচি নেয়। বদরের চেতনা উনারা যেভাবে বুঝেন বা বুঝাতে চান, আজকের প্রেক্ষাপটে কতটা জরুরি, তা খোলাসা করা দরকার। নতুবা বাড়বে বিভ্রান্তি, লেগেই থাকবে সংঘাত। এখানে একটি বিষয় অস্পষ্ট রয়ে গেছে, বদর দিবস বা জিহাদের আসল তাৎপর্য বা শিক্ষা কী? ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে প্রতিপক্ষ জনগোষ্ঠীকে ঘায়েল করা বা প্রতিহিংসা ছড়ানো যদি জিহাদ হয়, তাতে ইসলাম সায় দেয় না; বরং দেশ ও সমাজে বিরাজিত পর্বতসম বৈষম্য, শোষণ-নিপীড়ন, দারিদ্র্য, নারী নির্যাতন, যৌতুকপ্রথা, সন্ত্রাস ও সর্বগ্রাসী অপরাধযজ্ঞ থেকে মানুষকে রক্ষার সংগ্রাম বা জিহাদ করাই আজকের প্রেক্ষাপটে বেশি প্রাসঙ্গিক এবং অতি জরুরি।

মহানবী (সা.) কোনো একটি জিহাদের ময়দান থেকে ফিরে যাওয়ার পথে সাহাবায়ে কিরামকে লক্ষ্য করে বলেছেন, ‘তোমরা ছোট জিহাদ থেকে বড় জিহাদের দিকে চমৎকারভাবে ফিরে এলে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিধর্মীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ছোট জিহাদ আর তোমাদের অন্তরের মধ্যে যে কাফির রয়েছে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই বড় জিহাদ।’ মাহে রমযানে সংঘটিত বদরের যুদ্ধের শিক্ষা হলো দেশ ও সমাজে বিরাজিত যাবতীয় অন্যায়, অত্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে মানবিক জাগরণ সৃষ্টি করা এবং কুপ্রবৃত্তির দমনপূর্বক সুরিপুর উজ্জীবন ঘটানো। আত্মিক উৎকর্ষ এবং নৈতিক বোধের উজ্জীবনই বদর দিবসের আসল শিক্ষা।

সংশ্লিষ্ট