- পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম

নিশ্চয়ই আল্লাহ ভালোবাসেন

আল্লাহ তায়ালা আল-কুরআনকে মানবজাতির পথ প্রদর্শনের জন্য শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর নাযিল করেছেন। আল্লাহ মানুষের মধ্যে যেসব বিশেষ গুণাগুণ তৈরি হওয়া দেখতে চান, সেসব গুণাগুণ তিনি বিভিন্ন আয়াতের মধ্যে উল্লেখ করেছেন নানান ভাবে, নানান ভঙ্গীমায়। শুধুমাত্র এসব গুণাবলী উল্লেখই করেননি বরং আয়াতগুলো ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখা যায় যে, উল্লেখিত গুণাবলী অর্জনের পন্থাও তিনি সেসব জায়গায় বলে রেখেছেন- কখনও সরাসরি আবার কখনও সুপ্তভাবে।

কখনও তিনি আয়াতের মধ্যে উল্লেখ করেছেন, “এতে করে আশা করা যায় তোমরা অমুক গুণ অর্জন করতে পারবে” যেগুলো তিনি لَعَلَّكُمْ শব্দের পরে উল্লেখ করেছেন। আবার কখনও তিনি বলেছেন- “নিশ্চয়ই আল্লাহ অমুক গুণাবলী সম্পন্ন লোকদের সাথে আছেন” যেগুলো إِنَّ اللَّـهَ مَعَ শব্দগুচ্ছের পরে উল্লেখ করেছেন। আবার কখনও তিনি বলেছেন- إِنَّ اللَّـهَ يُحِبّ তথা “নিশ্চয়ই আল্লাহ ভালোবাসেন” এবং এর পরেই কাঙ্ক্ষিত গুণাবলী উল্লেখ করেছেন। এরকম যেসব গুণাবলীসূচক আয়াতে কারীমা রয়েছে, সেসব আয়াত থেকে বহুবিধ বিষয় শেখার সুযোগ আছে। আল্লাহ তৌফিক দিলে সেসব আয়াতের সংকলন ও বিশ্লেষণ প্রস্তুত করার চেষ্টা করব। আজ “নিশ্চয়ই আল্লাহ ভালোবাসেন” শব্দগুচ্ছসমৃদ্ধ যেসব আয়াত আছে, সেগুলোর বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব ইনশা-আল্লাহ।

যেসব আয়াতে কারীমার মধ্যে إِنَّ اللَّـهَ يُحِبّ অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আল্লাহ ভালোবাসেন” শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে সেসব আয়াত (মোট ১১টি) থেকে আমরা আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার উপযুক্ত বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ খুঁজে নিতে পারি। একই সাথে উক্ত গুণাবলীসমূহ অর্জনের জন্য আমরা তৎপর হতে পারি এবং আল্লাহর কাছে তৌফিক কামনা করতে পারি। সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহ নিম্নরূপঃ
وَأَنفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّـهِ وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ ۛ وَأَحْسِنُوا ۛ إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ ﴿١٩٥﴾
আল্লাহর পথে ব্যয় করো এবং (আল্লাহর পথে ব্যয় না করে) নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না। অনুগ্রহ প্রদর্শনের পথ অবলম্বন করো, কেননা আল্লাহ অনুগ্রহ প্রদর্শনকারীদেরকে ভালোবাসেন ৷ (আল বাকারা ১৯৫)

وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ ۖ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ ۖ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّىٰ يَطْهُرْنَ ۖ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللَّـهُ ۚ إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ ﴿٢٢٢﴾
আর তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে হায়েয (ঋতু) সম্পর্কে। বলে দাও, এটা অশুচি। কাজেই তোমরা হায়েয অবস্থায় স্ত্রীগমন থেকে বিরত থাক। তখন পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হবে না, যতক্ষণ না তারা পবিত্র হয়ে যায়। যখন উত্তম রূপে পরিশুদ্ধ হয়ে যাবে, তখন গমন কর তাদের কাছে, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে হুকুম দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারী এবং অপবিত্রতা থেকে যারা বেঁচে থাকে তাদেরকে পছন্দ করেন। (আল-বাকারা ২২২)
بَلَىٰ مَنْ أَوْفَىٰ بِعَهْدِهِ وَاتَّقَىٰ فَإِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ ﴿٧٦﴾
যে লোক নিজ প্রতিজ্ঞা পূর্ন করবে এং পরহেজগার হবে, অবশ্যই আল্লাহ পরহেজগারদেরকে ভালবাসেন। (আলে ইমরান ৭৬)

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّـهِ لِنتَ لَهُمْ ۖ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ۖ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ ۖ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّـهِ ۚ إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ ﴿١٥٩﴾
আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগ ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তা’আলার উপর ভরসা করুন। আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালবাসেন। (আলে ইমরান ১৫৯)
فَبِمَا نَقْضِهِم مِّيثَاقَهُمْ لَعَنَّاهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَاسِيَةً ۖ يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَن مَّوَاضِعِهِ ۙ وَنَسُوا حَظًّا مِّمَّا ذُكِّرُوا بِهِ ۚ وَلَا تَزَالُ تَطَّلِعُ عَلَىٰ خَائِنَةٍ مِّنْهُمْ إِلَّا قَلِيلًا مِّنْهُمْ ۖ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاصْفَحْ ۚ إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ ﴿١٣﴾
অতএব, তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের দরুন আমি তাদের উপর অভিসম্পাত করেছি এবং তাদের অন্তরকে কঠোর করে দিয়েছি। তারা কালামকে তার স্থান থেকে বিচ্যুত করে দেয় এবং তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল, তারা তা থেকে উপকার লাভ করার বিষয়টি বিস্মৃত হয়েছে। আপনি সর্বদা তাদের কোন না কোন প্রতারণা সম্পর্কে অবগত হতে থাকেন, তাদের অল্প কয়েকজন ছাড়া। অতএব, আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং মার্জনা করুন। আল্লাহ অনুগ্রহকারীদেরকে ভালবাসেন। (আল মায়েদা ১৩)

سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ أَكَّالُونَ لِلسُّحْتِ ۚ فَإِن جَاءُوكَ فَاحْكُم بَيْنَهُمْ أَوْ أَعْرِضْ عَنْهُمْ ۖ وَإِن تُعْرِضْ عَنْهُمْ فَلَن يَضُرُّوكَ شَيْئًا ۖ وَإِنْ حَكَمْتَ فَاحْكُم بَيْنَهُم بِالْقِسْطِ ۚ إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ﴿٤٢﴾
এরা মিথ্যা বলার জন্যে গুপ্তচরবৃত্তি করে, হারাম ভক্ষণ করে। অতএব, তারা যদি আপনার কাছে আসে, তবে হয় তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দিন, না হয় তাদের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকুন। যদি তাদের থেকে নির্লিপ্ত থাকেন, তবে তাদের সাধ্য নেই যে, আপনার বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারে। যদি ফয়সালা করেন, তবে ন্যায়ভাবে ফয়সালা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন। (আল মায়েদা ৪২)
إِلَّا الَّذِينَ عَاهَدتُّم مِّنَ الْمُشْرِكِينَ ثُمَّ لَمْ يَنقُصُوكُمْ شَيْئًا وَلَمْ يُظَاهِرُوا عَلَيْكُمْ أَحَدًا فَأَتِمُّوا إِلَيْهِمْ عَهْدَهُمْ إِلَىٰ مُدَّتِهِمْ ۚ إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ ﴿٤﴾
তবে যে মুশরিকদের সাথে তোমরা চুক্তি বদ্ধ, অতপরঃ যারা তোমাদের ব্যাপারে কোন ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করেনি, তাদের সাথে কৃত চুক্তিকে তাদের দেয়া মেয়াদ পর্যন্ত পূরণ কর। অবশ্যই আল্লাহ সাবধানীদের পছন্দ করেন। (আত তাওবা ৪)
كَيْفَ يَكُونُ لِلْمُشْرِكِينَ عَهْدٌ عِندَ اللَّـهِ وَعِندَ رَسُولِهِ إِلَّا الَّذِينَ عَاهَدتُّمْ عِندَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ ۖ فَمَا اسْتَقَامُوا لَكُمْ فَاسْتَقِيمُوا لَهُمْ ۚ إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ ﴿٧﴾
মুশরিকদের চুক্তি আল্লাহর নিকট ও তাঁর রসূলের নিকট কিরূপে বলবৎ থাকবে। তবে যাদের সাথে তোমরা চুক্তি সম্পাদন করেছ মসজিদুল-হারামের নিকট। অতএব, যে পর্যন্ত তারা তোমাদের জন্যে সরল থাকে, তোমরাও তাদের জন্য সরল থাক। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সাবধানীদের পছন্দ করেন। (আত তাওবা ৭)
وَإِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا ۖ فَإِن بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَىٰ فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّىٰ تَفِيءَ إِلَىٰ أَمْرِ اللَّـهِ ۚ فَإِن فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا ۖ إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ﴿٩﴾
যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর চড়াও হয়, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে; যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দিবে এবং ইনছাফ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ইনছাফকারীদেরকে পছন্দ করেন। (আল হুজুরাত ৯)
لَّا يَنْهَاكُمُ اللَّـهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ ۚ إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ﴿٨﴾
ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন। (আল মুমতাহিনা ৮)
إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُم بُنْيَانٌ مَّرْصُوصٌ ﴿٤﴾
নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন, যারা তাঁর পথে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় সারিবদ্ধভাবে লড়াই করে। (আস সফ ৪)
উপরিউক্ত আয়াতসমূহ থেকে শুধু বৈশিষ্ট্যগুলো আলাদা করে লিখলে নিম্নের বৈশিষ্ট্যসমূহ পাওয়া যায়ঃ
الْمُحْسِنِينَ (মুহসীন)
التَّوَّابِينَ (তওবাকারী)
الْمُتَطَهِّرِينَ (অপবিত্রতা থেকে যারা বেঁচে থাকে)
الْمُتَّقِينَ (মুত্তাকী)
الْمُتَوَكِّلِينَ (আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলকারী বা ভরসাকারী)
الْمُقْسِطِينَ (সুবিচারকারী, ইনসাফকারী)

الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُم بُنْيَانٌ مَّرْصُوصٌ (যারা তাঁর পথে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় সারিবদ্ধভাবে লড়াই করে)
উপরে উল্লেখিত আয়াতে কারীমাসমূহের অর্থের দিকে খেয়াল করলে সংশ্লিষ্ট শব্দগুলোর তাৎপর্য উপলব্ধি করা যাবে ইনশা-আল্লাহ।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহসহ তাঁর পছন্দনীয় সকল গুণাবলী অর্জনের মধ্য দিয়ে তাঁর ভালোবাসাপ্রাপ্ত বান্দা হওয়ার তৌফিক দিন। আমীন।

সংশ্লিষ্ট