মো: সিরাজুল ইসলাম

একটি নীরব বিপ্লবের হাতছানি

আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে তরুণ প্রজন্মের একটি বিরাট অংশ আজ ইসলামী আন্দোলনে এসে ভিড় করেছে। আজ সমাজে এ সংখ্যা কম নয়। আমরা এদেশে ইসলামী সমাজের স্বপ্ন দেখছি। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমরা সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রধান শর্ত এদেশ গড়ার কারিগরদেরকে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করছি। আমরা এদেশের তরুণ প্রজন্মকে সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিকরূপে প্রস্তুত করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে কাজ করছি। আর আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, প্রকৃত অর্থে এসব গুণের সমন্বয় সাধনের জন্য ইসলামী আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আর আখিরাতে মুক্তির ক্ষেত্রে তো এ ছাড়া উপায়ই নেই।

এ প্রজন্মকে ইসলামী আন্দোলনের দিকে আহ্বান করার জন্য আমরা সদা কাজ করে চলেছি। আমাদের নানামুখী জ্ঞানপূর্ণ পন্থা এখানে কার্যকর। সেসব প্রচেষ্টার সাথে সাথে আজ আমি একটি ছোট্ট, সহজ কিন্তু অত্যন্ত ফলপ্রসূ দাওয়াতি মাধ্যমের ব্যাপারে আলোচনা করতে চাই। আমার বিশ্বাস, আমরা যারা ইসলামী আন্দোলন করছি, তারা এ ব্যাপারে সচেতন হলে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে অনেক বড় ফল লাভ করা যাবে। সেটি হচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মকে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া। আমরা সবাই ছাত্র, বর্তমানে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বলতে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে আমাদের জুনিয়র যারা আছে তাদেরকে বোঝাচ্ছি। বিস্তারিত বলতে গেলে, আমাদের সহোদর ছোট ভাই ও ছোট বোন, চাচাতো-মামাতো-খালাতো ছোট ভাইগণ, ছেলেমেয়ে সর্বপ্রকার কাজিনদের ছেলে বাচ্চাগুলোকে বোঝাচ্ছি। এদেরকে আমরা আপাতত আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের অংশ ধরে নিতে পারি। এদের প্রত্যেকের ওপর আমাদের পজেটিভ প্রভাব অনেক বেশি। একটু প্রচেষ্টা চালালে এ প্রভাব আরো অনেক গুণে বাড়ানো সম্ভব। খুব সহজ, শুধু প্রয়োজন একটু সচেতনভাবে পথ চলা।

আমাদের আত্মীয়স্বজন, যেমন উদাহরণ হিসেবে বড় খালাতো বোনের কথাই ধরি। তিনি যখন তাঁর ছয় বছরের বাচ্চাকে আদর যত্ন করে পড়াতে বসান, তখন তাকে উৎসাহ প্রদানের জন্য হয়ত আমাদের কথা শোনান। হয়ত বলেন, “ভালো করে পড়ালেখা কর, তোমার নাসির মামার মত হতে হবে।” আমি নিশ্চিত, এ কথা শোনার পরে পিচ্চি ভাগ্নেটার মনের মধ্যে নাসির মামার একটি প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। নাসির মামাকে সে আইডল হিসেবে কল্পনা করে। মনের অজান্তেই। মনে মনে সে নাসির মামাকে অনুসরণ ও অনুকরণ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

এখন নাসির মামা যদি ঐ ভাগ্নেটার খোঁজ খবর রাখে, মাঝে মধ্যে গিফট পাঠায়, সুযোগ করে দেখা করে, দুই টাকা খরচ করে এনভেলপ কিনে তার ভেতরে দু’ কলম চিঠি পোস্ট করে, পড়ালেখার খোঁজ রাখে, মাঝে মধ্যে খেলাধুলারও খোঁজখবর নেয়, সুযোগ পেলে তার সাথে গল্প করে, ওদের বাসায় গেলে সাথে নিয়ে আশপাশে বেড়াতে নিয়ে যায় এবং সত্যিকারার্থে নিজেকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে তবে নিশ্চিত করেই বলা যায় ভাগ্নেটা নাসির মামাকেই ফলো করতে অভ্যস্ত হবে। নাসির মামাই তার সবচেয়ে প্রিয় মামা হিসেবে ওর কাছে ধরা দেবে। নাসির মামার দায়িত্ব হচ্ছে পিচ্চি ভাগ্নেটাকে আগামী দিনে সঠিক পথের দিকে আহ্বান করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি টার্গেট নেয়া। ভাগ্নেকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করা। সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেয়া যেমন, নামাজের বয়স হলে নামাজের খোঁজ নেয়া, রোজার ব্যাপারে তাগিদ দেয়া, বিভিন্ন ক্লাসে পড়ালেখায় ভালো করার ব্যাপারে টিপস দেয়া, কিশোর অবস্থায় তার বুঝের উপযোগী বই পড়তে দেয়া হবে মামার দায়িত্ব। ভাগ্নেকে সত্যিকার মানুষ তথা আল্লাহর একজন প্রিয় বান্দা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রচেষ্টা চালানো, যেন সে দুনিয়াতে কল্যাণ পায় এবং আখিরাতেও কল্যাণ পায়।

এভাবে করে সময়ের সাথে সাথে ভাগ্নে একজন সত্যপ্রিয় মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ। আর স্বাভাবিক ভাবেই তার বুঝের আলোকে নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছানোর পরে তাকে ইসলামী আন্দোলনের ব্যাপারে অভ্যস্ত করে তোলা হবে নাসির মামার কাজ। ইসলামী আন্দোলনে অভ্যস্ত হয়ে গেলে লাখো ‘নাসির মামা’ তখন এ ভাগ্নের খোঁজ রাখবে।

আমি এ চিন্তা থেকেই একবার একটি অনলাইন জরিপ করেছিলাম। যারা ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত এমন ভাইদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, “আপনার সহোদর ছোট ভাই-বোন, ছেলে কাজিন, সহোদর ভাই-বোনের ছেলে ও মেয়ে যাদের বয়স আপনার চেয়ে কম, ছেলে ও মেয়ে উভয় প্রকার কাজিনের ছেলে বাচ্চা যাদের বয়স আপনার চেয়ে কম, এমন জুনিয়রদের সংখ্যা কত?” ৭৫ জন ভাই আমার সে জরিপে উত্তর করেছিলেন এবং আমি প্রতিজনের জন্য গড়ে এই জুনিয়র সংখ্যা পেয়েছিলাম সাড়ে ২২ জন করে। চিন্তা করা যায়, কী বিরাট সংখ্যা! সুবহানাল্লাহ। একটু সচেতনভাবে পথ চললে এ সাড়ে বাইশ জনের পেছনে নীরবে কাজ করা সম্ভব। তাড়াহুড়ার কিছু নেই। এদের পেছনে আগামী ছয় সাত বছর কাজ করলে আল্লাহ চাহেন তো সবাই দ্বীনের পথে পথিক হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। আর আমার তো মনে হয়, সবাই যদি এভাবে সাড়ে ২২ জনের পেছনে কাজ করি, তবে বাংলাদেশের আর কোনো মুসলিম শিশু হয়ত আমাদের এ নীরব দাওয়াতের আওতার বাইরে থাকবে না। সাড়ে বাইশ জনের মধ্যে হয়ত অনেক শিশুই আমাদের আরো কিছু আত্মীয়ের দাওয়াতের অধীনেও পড়বে। সেটা তো আরোও ভালো হবে।

রিসেন্টলি আমার বড় ভাতিজার এসএসসির রেজাল্ট হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে সে অসাধারণ রেজাল্ট করেছে। এখন তো জিপিএর পাশাপাশি প্রাপ্ত নম্বরও জানা যায়। সে বিচারে এ রেজাল্ট জানার পর আমি সত্যিই খুব বিমোহিত হয়েছি, আল্লাহর কাছে বিশেষ শুকরিয়া জানিয়েছি। এ আনন্দ অনেকের সাথেই শেয়ার করেছি। অনুভব করেছি, পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের চেয়ে বেশি ভালো রেজাল্ট করতে পারলে বেশি আনন্দ হয়। ওরা আমাদের চেয়ে যত বেশি ভালো করে, আনন্দটা জ্যামিতিক হারে তত বেশি হয়। আমি যেমন আমার বড় ভাইদের দেখে উদ্বুদ্ধ হতাম ভালোমত করে পড়ালেখা করার ব্যাপারে এবং দ্বীনের পথে চলার ব্যাপারে, আমার বিশ্বাস, আমার ভাতিজা, ভাতিজি, ভাগ্নে, ভাগ্নি হয়ত আমাদেরকে দেখে তেমনটাই উদ্বুদ্ধ হয়। আজ ওদের রেজাল্ট ভালো হলে হয়ত ওদের পরের জনেরা ওদের থেকেও এগিয়ে যাবে। ডেভেলপমেন্ট প্রসেসটা সাধারণত এভাবেই ধারাবাহিকভাবে হয়। আমরা যদি সত্যিকারার্থেই ওদেরকে দ্বীনি যোগ্যতা ও দুনিয়া পরিচালনাগত তথা ক্যারিয়ার রিলেটেড যোগ্যতা বৃদ্ধির ব্যাপারে সচেতনভাবে দেখভাল করতে পারি, তাহলে আল্লাহ চাহেন তো একদিন ওরা এ জাতিকে শান্তির সুশীতল সমাজ উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা পালন করতে পারবে। এভাবে করে আগামীর প্রজন্মের একটি বিরাট অংশকে নীরবে নিভৃতে ইসলামী আন্দোলনের যোগ্য কর্মী হিসেবে গড়ে তোলা অসম্ভব কিছু নয় বলেই আমার বিশ্বাস। এভাবে কাজ করার মধ্য দিয়ে সূরা আত তাহরিমের ষষ্ঠ আয়াতে দেয়া আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার ও সন্তান-সন্ততিকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো মানুষ এবং পাথর হবে যার জ্বালানি।”-এর বাস্তবায়নের প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

আসুন, আমরা সাধারণভাবে সকল তরুণ ছাত্রের কাছে ইসলামের আহ্বান পৌঁছানোর পাশাপাশি আমাদের সম্ভাবনাময় পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক পথের দিশা দেয়ার জন্য যত্নবান হই, তাদেরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি, স্বপ্নের লালন করি আর এগিয়ে যাই একটি শান্তিময় সমাজ গঠনের দিকে, একটি নীরব বিপ্লবের দিকে। আল্লাহ আমাদেরকে সাহায্য ও কবুল করুন।

কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

সংশ্লিষ্ট