ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

রাসূলের সা. সাহিত্যপ্রেম ও আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা

কাব্যচর্চা কোন নবীর কাজ নয়, তিনি মহাসত্য প্রচারের জন্য সরাসরি আল্লাহ কর্তৃক পরিচালিত হয়ে থাকেন। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সা. সর্বযুগের সর্বকালের সেরানবী হিসেবে তিনিও পরিচালিত হয়েছেন সরাসরি আল্লাহর ওহির মাধ্যমে এবং তাঁকে দেয়া হয়েছে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মুজিজা পবিত্র আল কুরআনুল কারিম। সমকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের চেয়েও অনেক বেশি উঁচুমানের সাহিত্যিক মূল্যবোধ দিয়ে সাজানো হয়েছে এ পবিত্র গ্রন্থ। এ গ্রন্থের বাহক হিসেবে মহানবীকে সা. দেয়া হয়েছে উন্নত ভাষাজ্ঞান এবং অসাধারণ কাব্যমমতা। অন্যান্য কবিদের মতো নিজে কবিতা রচনা না করেও কবি ও কবিতার প্রতি তাঁর অভাবনীয় ভালোবাসা সাহিত্য পরিমন্ডলে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে বৈকি। তাইতো তিনি মহানবী হয়েও ভাষাও সাহিত্যেরও মহানায়ক হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত হয়ে আসছেন।

মহানবীর আগমন ঘটেছে খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের শেষভাগে। সে সময় আরবসমাজে নৈতিক অধঃপতনের চূড়ান্তরূপ পরিলক্ষিত হয়েছিলো। মানুষের মধ্যে মানবতাবোধের অভাব তৈরি হয়েছিলো ব্যাপকভাবে। হত্যা-খুন, অপহরণ-ধর্ষণ, লুটতরাজ-ছিনতাই প্রভৃতি অমানবিক আচরণ ছিলো নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার। নারীরা মানুষ নয়; এরা ভোগের পণ্যÑ এমন অরুচিকর ধারণাও প্রচলিত ছিল। মদ্যপান এবং যুদ্ধবাজনীতি সম্ভ্রান্ত ও শৌর্যবীর্যের প্রতীক। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ ক্ষমতার অপব্যবহারের সর্বোচ্চ সীমা লঙ্ঘিত হয়েছিল। এমন সঙ্কটকালেও ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষতায় তারা ছিলো পৃথিবীর সবচেয়ে শীর্ষে। তাই মহানবীকে সা. যে বিধান দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে তার সাহিত্যিকমানও ছিলো সমকালকে চ্যালেঞ্জ করার মতো। মূলত এটা ছিল মহানবীকে সা. দেয়া একটি সর্ববৃহৎ মুজিজা। কেননা প্রত্যেক নবীকে সমকালীন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার মতো মুজিজা দিয়েই প্রেরণ করা হয়েছিলো। যেমন হযরত মূসার আ. সময় জাদুর প্রভাব এবং গোত্র ইগো ছিলো সবচেয়ে বেশি; আর তাই তাকে একটি লাঠি মুজিজা হিসেবে দেয়া হয়েছিলো যা দিয়ে তিনি জাদুকরদেরকে উচিৎ শিক্ষা দিতে পেরেছিলেন এবং ফেরাউনের আক্রমণ থেকে তার উম্মতকে বাঁচানোর জন্য নীলনদে লাঠি দ্বারা আঘাত করে বারোটি গোত্রের জন্য বারোটি রাস্তা তৈরি করে দিয়েছিলেন নদ পার হবার জন্য। তেমনি হযরত ঈসার আ. সমকালে চিকিৎসাশাস্ত্রের উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো বলে তাঁকে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগ নিরাময়ের মতো অলৌকিকত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছিলো। পবিত্র কুরআনের সাহিত্যভাবকে পুরোপুরিভাবে হৃদয়ঙ্গম করার ক্ষমতা অর্জনের জন্যই মহানবীকে সা. মক্কার কুরাইশদের পাশাপাশি আরবের শুদ্ধভাষাভাষী সায়াদ ইবনে বকর গোত্রে মা হালিমার (রা) তত্ত্বাবধানে শৈশব কাটানোর সুযোগ করে দিয়েছিলেন। মহানবী সা. নিজেই বলেছেন, ‘আমি আরবদের মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী। তারপরও আমি কুরাইশদের অন্তর্ভুক্ত, আর আমি সায়াদ ইবনে বকর গোত্রে প্রতিপালিত হয়েছি।’ সুতরাং ভাষার দক্ষতা এবং বিশুদ্ধতার মাপকাঠিতে তিনি সুসাহিত্যিক হবার মতো একজন যোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

মহানবী সা. কাব্যচর্চা করেননি। কিন্তু তাঁর বর্ণিত নির্দেশনার (হাদিস) ভাষা কাব্যভাষার চেয়ে কোন অংশেই কম নয়; যদিও তা সাধারণ মানুষের জন্য বোধগম্য। ‘মুমিন তার ভাইয়ের আয়না স্বরূপ’ ‘আত্মার ধনাঢ্য সর্বোত্তম ধনাঢ্য’ ‘মানুষেরা চিরুনির দাঁততুল্য’ ‘প্রথম ধাক্কায় অটল থাকাই হচ্ছে সবর বা ধৈর্য’ ‘একই গুহা থেকে মুমিন কখনো দু’বার দংশিত হয় না’ এমন অসংখ্য হাদিসের বাণী উপমা হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। এসব বাণীর মধ্যে অসাধরণ সাহিত্যিক উপমা উৎপ্রেক্ষা এবং ইঙ্গিতময়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে নাদওয়াতুল উলামা লক্ষেèৗয়ের রেক্টর মুহাম্মদ আররাহী নদভী তাঁর ‘তারিখ-আল আদাবিল আরাবি, আল আছরিল ইসলামী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, মহানবীর সা. সাহিত্য হচ্ছে সাবলীল গদ্য, নতুনত্বে পরিপূর্ণ; যা হজম করা সহজ। এর উৎসস্থল সুপেয়। এটি স্বল্পকথায় অধিক অর্থ প্রকাশ করে। এটি স্থান কাল পাত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি যেখানে সংক্ষেপ হওয়া প্রয়োজন সেখানে সংক্ষিপ্ত আর যেখানে বি¯তৃত হওয়া জরুরি সেখানে বি¯তৃত। তার ভাষায় কোন কৃত্রিমতা নেই বরং এটি তাঁর অন্তর থেকে নিঃসৃত। তিনি দুর্বোধ্য ও শ্র“তিকটু শব্দ, আর সাহিত্যরসহীন বাক্য পরিহার করেছেন। একইভাবে আল-আদাব আন-নুছুস ফিল আছরাইন, আল জাহিলি ওয়া সাদরুল ইসলাম গ্রন্থে ড. মুহাম্মদ খলিফা উল্লেখ করেন, ‘মহানবীর সা. শব্দাবলি নতুন, সূক্ষ্ম অর্থবহনকারী। তাঁর বাক্যবিন্যাস বিশুদ্ধতার শীর্ষে। উপমার প্রয়োগ, বাক্যের অলঙ্কার, পরোক্ষার্থে শব্দের ব্যবহার খুবই চমৎকার।’

মহানবীর সা. সাহিত্যপ্রেম অস্থিমজ্জার সাথে মিশে ছিলো। পবিত্র কুরআনের বাহক হিসেবে নিজেকে আপাদমস্তক সাজিয়ে নিলেও কবিতা রচনা এবং আবৃত্তিকরাকে ছাড়তে পারেননি তিনি। আনন্দ-বেদনা, পাওয়া-না পাওয়া, জয়-পরাজয়সহ জীবনের মাহেন্দ্রক্ষণে তাঁকে কবিতা আওড়াতে দেখা গেছে। বুখারী শরীফে হযরত বারা ইবনে আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, হুনায়নের যুদ্ধে হাওয়াজিন গোত্র অর্থাৎ শত্র“পক্ষের তীরের আঘাতে কতিপয় মুসলিম সেনা পিছু হটে গিয়েছিলো তখন মহানবী সা. একটি সাদা খচ্চরের উপরে আরোহণ করে বীরত্বের সাথে যুদ্ধের নেতৃত্বদিচ্ছিলেন এবং আবৃত্তির ভঙ্গিতে উচ্চারণ করছিলেন
আমি কিন্তু আল্লাহর নবী
মিথ্যাবাদী নই
আমি আবদুল মুত্তালিবের
বংশধরও হই।

অনুরূপভাবে হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলূল্লাহ সা. আহযাবের যুদ্ধের জন্য নির্মাণাধীন পরিখার নিকট এলেন। তখন মুহাজির ও আনসারগণ প্রচণ্ড শীতের সকালে পরিখা খনন করছিলেন। এ কাজের জন্য তাঁদের কোন পারিশ্রমিক ছিল না। (তারা ভীষণ ক্ষুধার্ত এবং তৃষ্ণার্তও ছিলেন।) মহানবী সা. তাঁদের ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং শীতকাতরতা দেখে আবৃত্তি করলেন-
পরকালেই আসল জীবন
দুনিয়ারটা শূন্য
মুহাজির আর আনসারে
দাও গো রহম-পুণ্য!
মহানবীর সা. কণ্ঠে এ ধরনের আশীর্বাদবাণী শুনে সাহাবীগণ উচ্ছ্বসিত হলেন এবং তাঁর প্রত্যুত্তরে তাঁরাও আবৃত্তি করলেন-
শপথ নিলাম আজকে সবাই
মুহাম্মদের হাতে
সারা জীবন করবো জিহাদ
থাকবো তাহার সাথে।
সাহাবীগণের আবৃত্তি শুনে মহানবী সা. আবেগে আপ্লুত হয়ে আবারো আবৃত্তি করলেন:
সব রকমের ভালাই খোদা
রাখছো জমে আখিরাতে
মুহাজির ও আনসারদের
ঢাকো তোমার বারাকাতে।

মহানবী সা. কর্তৃক এমন কবিতা আবৃত্তি এবং আসহাবে রাসূল কর্তৃক তার জবাব এভাবে কবিতার মাধ্যমে দেয়া সত্যিই বিস্ময়কর। হযরত আবু বকর (রা.), হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.), হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) এবং হযরত আলী ইবনে আবি তালিবসহ (রা.) শীর্ষস্থানীয় সাহাবী এবং উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশাসহ (রা.) অনেক বড়মাপের মহিলা সাহাবীগণও নিজেদেরকে বড় কবিদের কাতারে শামিল হবার মতো কবিতা রচনা করেছেন। এ ক্ষেত্রে মহানবীর সা. আন্তরিক প্রেরণা এবং অসাধারণ পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান মূল ভূমিকা পালন করেছে। তিনি কাব্যচর্চাকে শুধু অনুমোদনই করেননি বরং কবিদেরকে আর্থিকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে, বিভিন্ন উপলক্ষে পুরস্কার ঘোষণা দিয়ে, সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নেয়া সত্ত্বেও গনিমতের মালের সমান ভাগ এমনকি কখনো বেশি ভাগ প্রদান করে এবং এমনকি কবিতার আড্ডার জন্য মসজিদে নববীতে আলাদা মিম্বার তৈরি করে দিয়ে নজিরবিহীন পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছেন। বিভিন্ন সময়ে কবিকুল শিরোমণি হযরত হাসসান বিন সাবিত (রা.) উক্ত মিম্বারে দাঁড়িয়ে কবিতা আবৃত্তি করেছেন। মহানবীর সা. স্বয়ং উপস্থিতিতে মসজিদে নববীতে কবিতা আবৃত্তির জলসা বর্তমান সময়ের মসজিদসমূহের পরিবেশ দেখে বিশ্বাস করাই কঠিন হয়ে পড়ে বৈকি। মহানবী সা. কবিদেরকে আর্থিকভাবে সাহায্য করাকে পিতামাতাকে সাহায্য করার সাথে তুলনা করেছেন। তাই কবি আসাদ বিন হাফিজ মন্তব্য করেছেন, ‘সন্তানের কাছে পিতামাতার যে মূল্য, সভ্যতার কাছে কবির মূল্য তেমনি। সন্তান পিতা-মাতার কাছে ঋণী আর জাতি ঋণী কবির কাছে। এ বাণীর মাধ্যমে মহানবী সা. বলতে চয়েছেন, জাতি যেনো সে ঋণ পরিশোধ করে।’

এখন স্বভাবতই প্রশ্ন আসতে পারে, মহানবী সা. কোন মানসিকতার কবি ও কবিতার জন্য এ ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছেন? তাঁর জবাবে এক কথায় বলা যায়, যে কবিরা নিজে বিশ্বাসে অটল থেকে তার বিজয়ে নিজেকে যে কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি করতে মহানবীর সা. আদেশ-নির্দেশের দিকে চাতক পাখির ন্যায় তাকিয়ে থাকতেন; যে কবিতার পঙ্ক্তি বিশ্বাসকে ত্বরান্বিত করেছে; জীবনকে দীন বিজয়ের জন্য নিবেদিত করতে আহ্বান জানায়। কবিতার আর্ট হিসেবে জাহিলিয়াতের অশ্লীলতাকে পুরোপুরিভাবে প্রত্যাখ্যান করে যারা সভ্যতার সুনির্মল আবহে কবিতার কাব্যময়তা বিনির্মাণে সফল হয়েছেন সেসব কবিই পেয়েছেন মহানবীর সা. পৃষ্ঠপোষকতা এবং যে কবিতার পঙক্তি বিশ্বাসকে প্রভু প্রেমের মণিকোঠায় পৌঁছে দিতে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, উজ্জীবিত করে জীবনবোধ-মননশীলতা ও সত্যিকার মানুষের প্রতিকৃতি সে কবিতাই এনে দিয়েছে জান্নাত পাবার ঘোষণা। আজ আমাদেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন, আমরা কি আধুনিক জাহিলিয়াতের অশ্লীলতাকে পরিহার করে সেই কবি ও কবিতার প্রতিচ্ছবি আঁকতে সমর্থ হয়েছি কিংবা যারা সেই প্রতিচ্ছবি আঁকতে পুরোপুরি খুলুসিয়াতসহ নিজেকে সমর্পিত করে কিছুটা হলেও সফলতার চেষ্টায় প্রাণপণ যুদ্ধ করে যাচ্ছে আমরা তাঁদেরকে মহানবীর সা. দেখানো আদর্শ মোতাবেক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানে কি এগিয়ে এসেছি? যদি না পেরে থাকি তবে এখনি সময় আত্মসমালোচনার, এখনি সময় আত্মবিশ্লেষণ এবং আত্মশুদ্ধির।

সহযোগী অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সংশ্লিষ্ট