সোমবার, ০৬ নভেম্বর ২০১৭

­ -মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত

এক আটাশের রক্ত শুকায়নি বহু ২৮ রক্তে লাল

রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর ২০০৬:
বাংলাদেশের ইতিহাসের জঘন্যতম একটি দিন। বর্বরতম ঘটনার নির্মম দলিল। সেদিন এমন ন্যক্কারজনক নৃশংস হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছিল, বাংলাদেশের ইতিহাস যতদিন আলোচিত হবে ততদিন ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরও আলোচনা হবে। রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার নৃশংসতার ঘটনাকে চাপা দিয়ে কিংবা অস্বীকার করে ইতিহাস রচনা করার সুযোগ কারো পক্ষে নেই। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার পটপরিবর্তন অনেকটাই হয়েছিল এই তান্ডবলীলার মাধ্যমে। এদিন এমন এক বর্বরতম নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছিল বিগত শতাব্দীতে প্রকাশ্য দিবালোকে এই ধরনের নৃশংস ঘটনা ঘটেছিল কিনা জানা নেই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা আন্দোলন, ২৫-শের কালরাত্রি, চেঙ্গিসীয় বর্বরতাসহ বিশ্বব্যাপী নানান বর্বরতম ঘটনা আমরা ইতিহাস থেকে জেনেছি। কিন্তু প্রকাশ্য দিবালোকে সজ্ঞানে, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে রাজনৈতিক প্লাটফর্ম থেকে গণতান্ত্রিক কর্মসূচির ব্যানারে ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে রাজপথে মানুষকে পিটিয়ে মারার কর্মসূচি ইতিহাস থেকে কখনো খুঁজে পাইনি। পিটিয়ে মারার পরে প্রতিহিংসা জিঘাংসা করার জন্য লাশের ওপর নৃত্য, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মানবদেহের মৃত্যু নিশ্চিত করার মত ঘটনা রাজপথে প্রকাশ্যে দ্বিতীয়টি আর ঘটেনি। ঠিক তেমনই ঘটনা ঘটেছিল ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকার পল্টন মোড়সহ গোটা দেশব্যাপী।

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ছিল তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন। এর আগের ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রেডিও-টিভিতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের নিমিত্তে জোটভুক্ত সকল দল আলাদা আলাদা সমাবেশের আয়োজন করেছিল। বিএনপি নয়াপল্টনে তাদের অফিসের সামনে আর জামায়াতে ইসলামী বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশের আয়োজন করে। চারদলীয় জোট যখন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন তার দলের ও জোটভুক্ত ১৪ দলের নেতাকর্মীদের লগি-বৈঠা নিয়ে রাজপথে উপস্থিত হওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। ২০০৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশ্য এক জনসভায় লগি-বৈঠা নিয়ে ঢাকায় অবরোধের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এরপরই আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতাকর্মীরা লগি-বৈঠা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ২৭ অক্টোবর বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভাষণের পর থেকেই সারাদেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। বিভিন্ন স্থানে বিএনপি-জামায়াতের অফিসসহ নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে যেমন চালানো হয় পৈশাচিক হামলা, তেমনি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয় অনেক অফিস, বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত। পুরো দেশব্যাপী চলে লগি-বৈঠার নৃশংস তাণ্ডবলীলা।

রাতভর চলতে থাকা লগি-বৈঠার তান্ডবলীলা চলতে থাকে পরদিন ২৮ অক্টোবরেও। বায়তুল মোকাররমের উত্তর সড়কে জামায়াতের পূর্বনির্ধারিত সমাবেশ ছিলো বিকাল ৩টায়। সকাল থেকেই সভার মঞ্চ তৈরির কাজ চলছিল। হঠাৎ করেই বেলা ১১টায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলের নেতাকর্মীরা লগি-বৈঠা ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জামায়াতের সমাবেশস্থলের মঞ্চ ও পুরানা পল্টনে অবস্থিত জামায়াতের মহানগরী ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা চালানোর লক্ষ্যে পল্টন মোড়, পুরানা পল্টন মসজিদ গলিসহ চতুর্মুখ দিয়ে আক্রমণ করে। তাদের টার্গেট সভামঞ্চ গুঁড়িয়ে দেয়া এবং পূর্ব থেকেই কার্যালয়ে অবস্থান করা জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের ওপর হামলা চালানো। তাদের সুপরিকল্পিত পৈশাচিক হামলায় মারাত্মক আহত হন জামায়াত ও শিবিরের অসংখ্য নেতাকর্মী। তাদের এই আক্রমণ ছিল সুপরিকল্পিত ও ভয়াবহ।

একপর্যায়ে পল্টন মসজিদের গলিতে শিবির নেতা মুজাহিদুল ইসলামকে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সেখানে গুলিবিদ্ধ হন ছাত্রশিবিরের তৎকালীন কেন্দ্রীয় অফিস সম্পাদক রেজাউল করিমসহ অসংখ্য নেতাকর্মী। সময় যত বাড়তে থাকে তত বাড়তে থাকে তাদের নৃশংসতা। সেদিন পুরো পল্টনজুড়ে ছিল লগি-বৈঠা বাহিনীর তান্ডব। লগি-বৈঠা আর অস্ত্রধারীদের হাতে একের পর এক আহত হতে থাকে নিরস্ত্র জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীরা। তারা লগি-বৈঠা দিয়ে পল্টন মোড়ে একের পর এক আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করে জামায়াতকর্মী জসিম উদ্দিনকে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তারা তার লাশের উপর ওঠে নৃত্য-উল্লাস করতে থাকে। বিকেলে সমাবেশ চলাকালীন সময়ে পল্টন মোড় থেকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে লগি-বৈঠাধারীরা সমাবেশের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। তখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন তৎকালীন আমিরে জামায়াত ও সরকারের শিল্পমন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীরা তৈরি করে মানবঢাল। এ সময় আওয়ামী অস্ত্রধারীদের ছোড়া গুলি মাথায় বিদ্ধ হয়ে রাজপথে লুটিয়ে পড়েন জামায়াতকর্মী হাবিবুর রহমান ও জুরাইনের জামায়াতকর্মী জসিম উদ্দিন। এ ঘটনায় শুধু ঢাকাতেই জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের ৬ জন নেতাকর্মী শহীদ ও ৬ শতাধিক আহত হন। দেশব্যাপী চালানো ২৮ অক্টোবর থেকে ৩ দিন ধরে চলা লগি-বৈঠার সেই তান্ডবলীলায় সারাদেশে জামায়াত-শিবিরসহ চারদলীয় জোটের ৫৪ জন নেতাকর্মী শাহাদাত বরণ করেন। আহত হয়েছেন ৫ সহস্রাধিক জামায়াত, ছাত্রশিবির ও বিএনপির নেতাকর্মী। বাদ যাননি সাংবাদিক, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষও। লগি-বৈঠার এ নৃশংসতা ও বর্বরতার হাত থেকে রেহাই পায়নি মায়ের কোলের শিশু, নারী, বৃদ্ধ এবং নিরীহ জনগণও।

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বর্বরতম নৃশংস এই ঘটনাগুলো কেন ঘটেছিল সময়ের ব্যবধানে আজ জাতির কাছে তা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। একটি প্রসিদ্ধ কথা আছে, সত্য কখনো চাপা থাকে না, তা দিবালোকের ন্যায় উদ্ভাসিত হবেই। আজ দেশের বিবেকসম্পন্ন, সচেতন, চিন্তাশীল প্রত্যেকটি মানুষের সামনেই সেই সত্য সুস্পষ্ট হয়েছে আলোকিত সূর্যের ন্যায়। এমনকি এদেশের সাধারণ জনগণও জানে লগি- বৈঠার নৃশংসতা কারা চালিয়েছে, কী উদ্দেশ্যে চালিয়েছে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে নস্যাৎ, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত, এদেশের ইসলামী আন্দোলন ও এর নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে দেশ থেকে ইসলামকে উৎখাত করে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ জোর করে চাপিয়ে দিতেই সুপরিকল্পিতভাবেই সেই ঘটনাগুলো ঘটিয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ও বাম শক্তির প্রভাবাধীন ১৪ দলীয় জোট। তারা ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা করায়ত্ত করতে এসব তান্ডবলীলা চালিয়েছিল তা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। কারণ সে সময় বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় তারা জনগণ থেকে ছিল বিচ্ছিন্ন। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের জ্বালাও-পোড়াও, হরতাল-অবরোধ, বাসে গান পাউডার দিয়ে নিরীহ মানুষকে হত্যা, লগি- বৈঠার তান্ডব এবং সাধারণ জনগণের জানমালের ওপর হামলাসহ সার্বিক কারণে তারা জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল। তাদের মধ্যে দৃঢ় বিশ্বাস, হতাশা এবং ভয় ছিল ২০০৬ সালের তৎকালীন জাতীয় নির্বাচনে তারা জনগণের ম্যান্ডেট পাবে না। যার ফলে গণতান্ত্রিক রীতিকে পাশ কাটিয়ে পেশিশক্তি দিয়ে জোর করে ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা করে তারা। দেশকে অন্য রাষ্ট্রের ক্রীড়নকে পরিণত করা, স্বাধীনতা বিকিয়ে দেয়া এবং গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধের বিনিময়ে ক্ষমতায় আরোহণের স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশ্যে এই লগি- বৈঠার তান্ডবলীলা চালিয়েছিল সেদিন আওয়ামী লীগ।

লগি-বৈঠা দিয়ে নৃশংসতা চালিয়ে সেদিন কাদেরকে হত্যা করা হয়েছিল? সেদিন রাজপথে প্রকাশ্যে পিটিয়ে খুন করা হয়েছিল দেশপ্রেমিক জনতাকে। উল্লেখ্য, জনতার পাশাপাশি মেধাবী ছাত্রনেতাদেরকেও হত্যা করা হয় । এক সাথে এতগুলো মেধাবী ছাত্রকে খুঁচিয়ে পিটিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে হত্যা করার ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে ছিল বিরল। সেদিন পিচঢালা কালো রাজপথ লাল রঙে রঞ্জিত হয়েছিল মেধাবী ছাত্র আর দেশপ্রেমিক জনতার খুনঝরা রক্তে। সেদিন যে সকল মেধাবীকে হত্যা করা হয়েছিল তাদের পরিচয় কী ছিল? তারা কি চিহ্নিত কোনো সন্ত্রাসী ছিল? তারা কি ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণের সেঞ্চুরি উদযাপনকারী কেউ ছিল? তারা কি কোনো ধরনের চাঁদাবাজি কিংবা টেন্ডারবাজিতে জড়িত ছিল? তাদের হাতে কি কোনো নারীর সম্ভ্রমহানি কিংবা কোনো নারী ইভটিজিংয়ের শিকার হয়েছিল? তারা কি অস্ত্র কিংবা চাপাতি উঁচিয়ে কাউকে খুন কিংবা কোপানোর জন্য ধাওয়া করেছিল? তার কি কোন ক্যাম্পাস হল কিংবা ছাত্রাবাসে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল? তারা কি কোনো শিক্ষককে লাঞ্ছনা কিংবা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করেছিল? তারা কি প্রকাশ্যে খাদিজাকে কুপিয়ে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করেছিল, কিংবা রাজপথে নিরীহ দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু বকরের মতো কাউকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে পিটিয়ে খুন করেছিল? তাহলে কেন বেছে বেছে এই মেধাবীদের খুন করা হলো? অথচ এ সকল মেধাবী ছিল দৃঢ় অকুতোভয়। তাদের বক্ষে ছিল মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সুষমা।

তাদের চেতনায় লালন করা ছিল সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। তাদের স্বপ্ন ছিল আলোকিত বাংলাদেশ, উন্নত পৃথিবী। এটাই কি ছিল তাদের অপরাধ? সে সময় অসংখ্য মানুষের মাঝে পাঁচ মেধাবী ছাত্রের শাহাদাত সবার বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। তাদের শাহাদাতের ঘটনায় ছাত্রশিবির কর্তৃক প্রকাশিত পোস্টারে আলোড়িত হয়েছিল সমগ্র বাংলাদেশ। দেয়ালে দেয়ালে, মসজিদের পাশে, অলিতে গলিতে সাঁটানো সেই পোস্টার দেখতে সেদিন উপচে পড়েছিল অগণিত জনতা। বিবেকসম্পন্ন সকল মানুষের হৃদয়কে সেদিন নাড়া দিয়েছিল এই পোস্টারটি। পোস্টার দেখেছেন অথচ হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়নি, চোখ থেকে অবলীলায় অশ্রু গড়িয়ে পড়েনি এমন মানুষের সংখ্যা নিতান্তই কম হবে। সেদিন অকপটে সবাই বলেছিল হায় আমরা এ কী দেখলাম! নিরীহ মায়াবী চেহারার এই মেধাবী মুখগুলোকে নির্মমভাবে হত্যা করতে ওদের কি একটুও হৃদয় কাঁপেনি?

সেদিন পল্টন মসজিদের গলিতে লগি-বৈঠা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে খুন করা হয়েছিল স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিবিএ অনার্স তৃতীয় বর্ষের মেধাবী ছাত্র হোসাইন মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলামকে। যার মেধায় মুগ্ধ হয়েছিলেন তারই ক্যাম্পাসের প্রিয় শিক্ষকেরা। শিশুবয়স থেকেই শান্ত স্বভাবের এই মেধাবী সন্তানকে নিয়ে একবুক স্বপ্ন লালন করেছিলেন মুজাহিদের পিতা-মাতা, প্রিয় নানাসহ আত্মীয়স্বজনেরা। বিরক্ত আর বাবা-মাকে কষ্ট দেয়া কাকে বলে এমন ধরনের আচরণ কখনো ছিল না মুজাহিদের মাঝে। ছোট বয়সে খেলার সময় তাকে যখন অন্যরা আঘাত করতো সে কখনো পাল্টা আঘাত করে তার জবাব দেয়নি। ২৮ অক্টোবরের সেই নারকীয় তান্ডবে শাহাদাত বরণ করেছিলেন আরো এক মেধাবী মুখ যার নাম শহীদ হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপন। ঢাকা কলেজের পদার্থবিদ্যা বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন এই মেধাবী ছাত্রটি। ছোট বয়সেই যিনি মেধার পরিস্ফুটন ঘটিয়েছিলেন মানবতার মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল কুরআনকে বক্ষে ধারণ (হিফজ) করে। শুধু তা-ই নয়, দাখিল (এসএসসি) পরীক্ষায় জাতীয় মেধায় সম্মিলিত তালিকার ১১তম স্থান দখল করে নিজের মেধার পরিচয় দিয়ে আগামীর নেতৃত্ব দেয়ার জানান দিয়েছিলেন শহীদ শিপন। রক্তাক্ত ২৮-এর সেই দিনে শাহাদাতের মিছিলের আরো একটি উজ্জ্বল নাম হলো নারায়ণগঞ্জের শহীদ আবদুল্লাহ আল ফয়সাল। সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন চিটাগাং রোডে আওয়ামী হায়েনারা নির্মমভাবে নৃশংস হামলা চালিয়ে মারাত্মক আহত করলে ২৯ অক্টোবর ঢাকার একটি হাসপাতালে শাহাদাত বরণ করেন তিনি। আবদুল্লাহ আল ফয়সাল ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অনার্স প্রথমবর্ষের ছাত্র। সদা হাস্যোজ্জ্বল আর মায়াবী চেহারার ফয়সালের ধীরস্থিরতা আর বুদ্ধির দীপ্তিতে বিমোহিত হতো তার সহপাঠীরা। মরহুম বাবার সুশিক্ষাকে বুকে ধারণ করেই সামনে অগ্রসর হতে চেয়েছিলেন ফয়সাল। কিন্তু হায়েনাদের ছোবলে আর সম্ভব হয়নি সেটি। রক্তাক্ত ২৮-এর এই মিছিলের আরেক সাথী ছিলেন শহীদ মু. রফিকুল ইসলাম। কুড়িগ্রামের এসএসসি পরীক্ষার্থী মেধাবী এই ছোট্ট কিশোরটিকেও হত্যা করতে ওদের হৃদয় এতটুকুনও কাঁপেনি। ২৮ অক্টোবর ১৪ দলীয় লগি- বৈঠাধারীদের পৈশাচিক হামলায় আহত হয়ে বিকেলে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শাহাদাতের পেয়ালা পান করেন এই মেধাবী কিশোর। লগি-বৈঠার তান্ডবের শিকার হয়ে মেধাবীদের লাশের মিছিলে সেদিন শামিল হয়েছিলেন আরো এক মেধাবী ছাত্র যার নাম শহীদ সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুম। ২৮ অক্টোবর বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে ১৪ দলের সন্ত্রাসী হায়েনাদের হামলায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ২ নভেম্বর শাহাদাতের মিছিলে যোগ দিয়ে চলে যান মহান প্রভুর সান্নিধ্যে। শিক্ষিকা মা আর চাকরিজীবী বাবার মেধাবী পরিবারের মেধাবী সন্তান মাসুম ছিলেন সরকারি তিতুমীর কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। এসএসসি পরীক্ষায় মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে তিনটি লেটারসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, মেধার স্বাক্ষর রেখে দেশের সেরা কলেজ বিএএফ শাহীন কলেজে এইচএসসিতে পড়ার যোগ্যতাও অর্জন করেছিলেন তিনি। তিতুমীর কলেজে ইংরেজি পড়ার পাশাপাশি স্বপ্ন ছিল লন্ডনে গিয়ে উচ্চতর পড়াশোনার, সেই স্বপ্নটিকে লালন করে অগ্রসরও হয়েছিলেন। কিন্তু পারলেন না সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিতে। তার আগেই হায়েনারা কেড়ে নিলো তার জীবনপ্রদীপ। এভাবে শুধু মাসুম কেন- মুজাহিদ, শিপন, ফয়সাল, রফিক সবারইতো স্বপ্ন ছিল একটি স্বপ্নিল জীবন গড়ার। একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়ার। কিন্তু যারা সেদিন মেধাবী ছাত্র আর দেশপ্রেমিক জনতার ওপর হিংস্র হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তারা সেদিন চেঙ্গিসীয় বর্বরতাকে হার মানিয়ে নির্মম হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল। তারা ছিল দেশ ও ইসলাম বিরোধী শক্তি, যারা দেশকে পরাধীন বানাতে চেয়েছিল, যারা চেয়েছিল এ দেশ পরনির্ভরশীল থাকুক! যাদের প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করে ভিনদেশীদের করদ রাজ্যে পরিণত করা। যাদের স্বপ্ন ছিল আফগানিস্তানের হামিদ কারজাই আর ইরাকের মালিকির মত আধিপত্যবাদীদের পুতুল সেজে ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করা। তারা কি ২০০৬ সালেই প্রথম এ ধরনের নৃশংস ঘটনার জন্ম দিয়েছিল? ইতঃপূর্বে তারা কি এ ধরনের আর কোনো ঘটনার অবতারণা করেছিল। তাদের রাজনীতির ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যাবে এ ধরনের নৃশংসতাই তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি। আদর্শের লড়াইয়ে পরাজিত হয় বলেই তারা বর্বরতার পথ বেছে নেয়।

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর যারা লগি-বৈঠার বর্বরতম ঘটনার জন্ম দিয়েছিল তারা আজো তাদের কৃতকর্মের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চায়নি। সেদিনের সংঘটিত ঘটনার সুষ্ঠু বিচারও করেনি। বরং ক্ষমতাবলে রাজনৈতিক বিবেচনায় তারা অনৈতিকভাবে মামলাটাও প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ২৮ আজ নতুন রূপে নতুন আঙ্গিকে আমাদের মাঝে। দেশের মানুষের জন্য প্রতিটি দিনই এখন ২৮ অক্টোবরের মত। এক আটাশের রক্ত শুকায়নি বহু ২৮ নতুন করে রক্তে লাল হয়েছে। আগের আটাশে পিচঢালা কালো রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হলেও এখন প্রতিনিয়ত দেশের প্রতিটি প্রান্তরের সবুজ জমিনও রক্তে লাল হচ্ছে। নতুন নতুন আটাশের রক্তে ২০০৬ সালের আটাশের রক্ত আরো লাল থেকে গাঢ় লাল হচ্ছে। সেই রক্তের ধারায় নতুন নতুন রক্ত এসে তাজা রক্তের সম্মিলন ঘটছে। সেদিন মঞ্চ গুঁড়িয়ে দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের যে সকল নেতৃবৃন্দকে হত্যা করতে তারা চেয়েছিল সময়ের ব্যবধানে তারাই ক্ষমতার মসনদে সমাসীন হয়ে সে দিনের জিঘাংসা চরিতার্থ করেছে। যেই পরিকল্পনাকে সামনে নিয়ে রক্তাক্ত ২৮ রচনা করেছিল সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে নিরপরাধ নিষ্পাপ ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে, সংবিধান থেকে ''আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস'' বাতিল করে। আজ ঘরে ঘরে শোকের মাতম। নদী-নালা, খাল-বিল, রাস্তা-ঘাট ডোবায় আজ মিলছে তাজা কিংবা পচা লাশ। প্রতিটি ক্যাম্পাসে পড়ছে মেধাবী ছাত্রের রক্তাক্ত তাজা লাশ। আজ ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা যেন এক একটি কাশ্মির, গাজা উপত্যকা। সন্তান হারানো মায়ের কান্না, ভাই হারানো বোনের আহাজারি, ছেলে হারানো বাবার আর্তনাদে ভারী বাংলার আকাশ-বাতাস। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায় আজ শুধু লাশের মিছিল। এক সময় খালে-বিলে নালা-নর্দমায় হাসপাতালে লাশ পাওয়া গেলেও এখন আর লাশটিও খুঁজে পাওয়া যায় না। গুম খুনে বিপর্যস্ত এক জনপদ বাংলাদেশ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবরের চেতনাকে শাণিত করতে হবে। শোককে শক্তিতে পরিণত করে আওয়ামী জুলুমশাহির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

লেখক: কেন্দ্রীয় সভাপতি
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

সংশ্লিষ্ট