মঙ্গলবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

সেক্রেটারি জেনারেলের বানীঃ সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে প্রত্যয় দীপ্ত পদচারণার ৪১ বছর

মানব সভ্যতার বাঁকে বাঁকে ইতিহাসের কত পরিক্রমাই না অতিক্রান্ত হয়েছে। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের প্রয়োজনে যুগে যুগে উন্মেষ ঘটেছে নানান সভ্যতার। মানুষের জীবনকে সহজ করেছে প্রযুক্তি। সমাজ পরিচালনার জন্য জন্ম হয়েছে অসংখ্য মতবাদের। ওহি ভিত্তিক জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে পাশ কাটিয়ে মানব রচিত বিভিন্ন মতবাদের বাস্তবায়নে শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে মানুষ হয়েছে অবহেলিত, অপমানিত, শোষিত, বঞ্চিত, নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত। অবহেলিত জনপদে বঞ্চিত মানুষের কষ্ট ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়। আবার নিপীড়িত মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টাও এখানে বিদ্যমান। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম কিছু নয়।

ঔপনিবেশিক আমল থেকে শাসকগোষ্ঠী হায়েনার বিষাক্ত ছোবলে ক্ষতবিক্ষত করেছে মানবতাকে। মীর জাফর আর ঘষেটি বেগমদের প্রতারণা ও ব্রিটিশ বেনিয়াদের নির্যাতনে হারাতে হয়েছে মীর কাসিম, বাহাদুর শাহ আর নেসার আলী তিতুমীরের মত অসংখ্য স্বাধীনতাকামী মানুষকে। উপমহাদেশে রাম রাজত্ব কায়েমের চক্রান্তে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে বারবার। পাকিস্তান আমলে ভাষার প্রশ্নে, স্বাধীনতার প্রশ্নে আপোষহীন থেকেছে এদেশের জনগণ। ১৯৭১ সালে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হলেও স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ থেকে আজও বঞ্চিত থেকেছে দেশবাসী। স্বাধীন বাংলাদেশেও শকুনি দৃষ্টি পড়ে কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর। শিক্ষা ব্যবস্থায় সেকুলারিজম, অর্থনীতিতে সমাজতন্ত্রের আবরণে পুঁজিবাদের মতো শোষণের মতবাদ জগদ্দল পাথরের ন্যায় চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। দুর্নীতি, মাদকাসক্তি আর অপসংস্কৃতির করাল গ্রাসে যখন সমগ্র বাংলাদেশ দগ্ধ, ঠিক সে সন্ধিক্ষণে জাতির প্রত্যাশা ছিল মুক্তির এক দিবাকরের, যার আলোকছটায় সবুজ শ্যামল সোনার বাংলা ভরে উঠবে শান্তি আর সমৃদ্ধিতে। ১৯৭৭ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের আত্মপ্রকাশ তাই ইতিহাসের এক অনন্য সংযোজন।

ছাত্রশিবির আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার এক অপ্রতিরোধ্য কাফেলার নাম। সৎ, যোগ্য, দেশপ্রেমিক ও খোদাভীরু নেতৃত¦ তৈরীর উৎস। তবে খোদাদ্রোহী স্বার্থবাদী শক্তি ছাত্রশিবিরের এ অগ্রযাত্রা সহ্য করতে পারেনি। অপ্রচার, জুলুম-নিপীড়ন আর হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে বারংবার। ছাত্রশিবিরকে হারাতে হয়েছে ২৩৪ টি মেধাবী তরুণ তাজা প্রাণ। আহত, পঙ্গুত্ব বরণ ও গুমের শিকার হয়ে কষ্ট সইতে হয়েছে অজস্র নেতাকর্মীকে। শত বাঁধা সত্ত্বেও মূহুর্তের জন্যও বন্ধ হয়নি দ্বীন প্রতিষ্ঠার এই কাজ। সকল হিংসার থাবা উপেক্ষা করে ছাত্রশিবির এগিয়ে গিয়েছে দূর্বার গতিতে। যা আজ পরিণত হয়েছে ছাত্র সমাজের প্রিয় ঠিকানায়।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির কেবল প্রতিভা বিকাশ ও লালনের কাজই করেনা বরং শিবির হচ্ছে প্রতিভা সন্ধানে অনন্য সংগঠন। ছাত্রদের সুপ্ত প্রতিভা সন্ধানে প্রতি বছর মেধাবী সংবর্ধনা, ক্যারিয়ার গাইডলাইন প্রোগ্রাম, বিজ্ঞান মেলা, সাধারণ জ্ঞানের আসর, আবৃত্তি ও ক্রীড়া প্রতিযোগী আয়োজন করে থাকে। এছাড়াও বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, গরিব মেধাবী ছাত্রদের জন্য স্টাইপেন্ড প্রদান, শীতবস্ত্র প্রদান, ব্লাড ডোনেশন, ব্লাড গ্রুপিং, ফ্রি চিকিৎসা ক্যাম্প, পথ শিশুদের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম, কুরআন প্রশিক্ষণ ও কুরআন বিতরণের আয়োজন করা থাকে ।

শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতির জন্য শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক প্রদানসহ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ছাত্রদের সকল অধিকার আদায়ে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আসছে এই সংগঠন। ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার রূপরেখা তুলে ধরতে শিক্ষা সেমিনার, ইসলামী শিক্ষা দিবস পালনসহ বিভিন্ন নিয়মিত কর্মসূচী পালন করে থাকে ছাত্রশিবির।

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে সৃজনশীল ও গঠনমূলক নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছে তৎকালীন ধর্মনিরপেক্ষ ও নাস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী ছাত্র সংগঠনগুলো। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই গঠনমূলক কাজের মাধ্যমে ছাত্রসমাজের কাছে আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা অর্জন করে ছাত্রশিবির। এরই প্রতিফলন ঘটে দেশের খ্যাতনামা প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে। বিভিন্ন সময়ে ক্যাম্পাস গুলোতে অনুষ্ঠিত ছাত্রসংসদ নির্বাচনে শিবির অংশ নিয়ে পূর্ণ বা আংশিক প্যানেলে বিজয় অর্জন করেছে।

জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ছাত্রশিবির অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে সব সময়। ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত এরশাদ সরকারের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছাত্রশিবির সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্রসমাজকে। ১৯৯৬ এর আওয়ামী দুঃশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সোচ্চার ছিল এই সংগঠন। আওয়ামী অপশাসন রুখতে দেশের কয়েকটি ছাত্রসংগঠনকে সাথে নিয়ে শিবির গড়ে তুলে “সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য”। ২০০৮ এর কারচুপির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার মসনদে চেপে বসা আওয়ামী সরকারের অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদে মূখর ছিল ছাত্রশিবির। সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস মুছে ফেলা, ইসলামী শিক্ষাকে সংকুচিত করে শিক্ষা নীতি প্রণয়ন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে ভোটার বিহীন অবৈধ নির্বাচন আয়োজন, জনগণের উপর হত্যা, গুম, জেল-জুলুম পরিচালনা, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতাকে খর্ব করা প্রভূতির বিরুদ্ধে গঠন মূলক প্রতিবাদ করেছে শিবির। এছাড়াও শিক্ষা অঙ্গনে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন কর্তৃক পরিচালিত সন্ত্রাস,চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজি ও নৈরাজ্যের বিরূদ্ধে প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করছে এই সংগঠন। ছাত্রসমাজকে সততা, দক্ষতা আর দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি সকল প্রকার অন্যায় ও অসৎ কাজ থেকে বেঁচে থাকার জন্য সচেতন করা শিবিরের নিয়মিত কর্মসূচীর অংশ। ২০০৯ থেকে বর্তমান পর্যন্ত আওয়ামী দুঃশাসনের জুলুম-নির্যাতন, হত্যা, গুম ইত্যাদির শিকার হওয়ার পরেও ছাত্রশিবির ছাত্রসমাজের জন্য ভূমিকা রাখার ব্যাপারে সামান্যতম পিছপা হয়নি।

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম প্রাকৃতিক দূর্যোগ কবলিত জনপদ। দেশের প্রতিটি প্রাকৃতিক দূর্যোগে বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাড়িয়েছে ছাত্রশিবির। ১৯৮৮, ১৯৯১, ১৯৯৮, ২০০০, ২০০১ সালের বন্যা, ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলা সহ দেশে ঘটে যাওয়া প্রতিটি দূর্যোগে ছাত্রশিবিরের ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচী সবাইকে অভিভূত করেছে। নেতাকর্মীরা নিজ উদ্যোগে প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বাড়িঘর নির্মাণ, রাস্তাঘাট মেরামত করে দিয়েছে।

বর্তমানে দেশে ছাত্র ও যুব সমাজের জন্য মাদক একটি ভয়ানক অভিশাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আশার দিক হল ছাত্রশিবিরের একশত ভাগ নেতাকর্মী মাদক এবং অশ্লীলতা মুক্ত। যেখানে দেশে মাদক ও অশ্লীলতার সয়লাবে যুব সমাজের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, সেখানে ছাত্রশিবির শুধু মাদক মুক্ত সংগঠনই নয় বরং মাদকের বিষাক্ত ছোবল থেকে যুব সমাজকে রক্ষায় সর্বোচ্চ প্রচার-প্রচারণা ও প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মাদক ও অশ্লীলতা মুক্ত জীবন গঠনে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করছে।

আদর্শিক ছাত্র সংগঠন হিসেবে ছাত্রদের অধিকার আদায়ে বরাবরই বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে ছাত্রশিবির। হল নির্মাণ, শিক্ষার্থীদের আবাসন বৃদ্ধি, অযৌক্তিক ভ্যাট প্রত্যাহার, বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, নকল, ভর্তি বাণিজ্য ও প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে সর্বদা সোচ্চার ছাত্রশিবির। ছাত্রদের পক্ষে জনমত তৈরী ও রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে ছাত্রশিবির ভূমিকা পালন করে চলেছে।

আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ছাত্রশিবিরের রয়েছে বলিষ্ঠ ভূমিকা। ছাত্রশিবির সব সময়ই সত্য ও ন্যায়ের নীতি ধারণ করে মজলুমের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে থেকেছে প্রতিবাদ মুখর। ১৯৯১ সালে ইরাকের কুয়েত আক্রমণের ব্যাপারে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম প্রতিবাদকারী ছাত্রসংগঠন ছিল বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। কাশ্মীর,বসনিয়া, চেচনিয়া, ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন স্থানে যখনই অন্যায় নিপীড়ন হয়েছে তখনই নিপীড়িত মজলুম মানুষের পক্ষে কন্ঠ উচ্চকিত করেছে ছাত্রশিবির। আফগানিস্তান ও ইরাকে পশ্চিমা আধিপত্যবাদী শক্তির নির্লজ্জ হামলা, সাধারণ মানুষ ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করার প্রতিবাদে মূখর থেকেছে শিবির। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর নির্মম নির্যাতনের বিরুদ্ধেও ছাত্রশিবির ছিল প্রতিবাদমুখর।

আদর্শিক লড়াইয়ে পরাজিতরা ঘৃণ্য পথে শিবির নেতাকর্মীদের ওপর নানামুখী নির্যাতন চালিয়েছে। মিথ্যা অভিযোগে অসংখ্য মামলায় ছাত্রশিবিরের হাজার হাজার নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করেছে। শহীদ করা হয়েছে সংগঠনের প্রথম দুই কেন্দ্রীয় সভাপতি মীর কাশেম আলী ও কামারুজ্জামানসহ শত শত নেতাকর্মীকে। আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে অসংখ্য সম্ভবনাময় মেধাবী নেতাকর্মীকে। শত নির্যাতন নিস্পেষন সত্ত্বেও সত্যের সেনানী ছাত্রশিবিরের কর্মী বাহিনী দমে যায়নি বরং আল্লাহর দ্বীনের পক্ষে তাদের পথ চলায় হয়েছে অটল, অবিচল আর সুদৃঢ়। দীপ্ত পথে এগিয়ে চলেছে কাঙ্খিত লক্ষ্যেপানে।

ছাত্রশিবির ৪১ বছরের পথপরিক্রমায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গন্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছে পাড়া-মহল্লার প্রতিটি ঘরে ঘরে। তরুণ সমাজকে গড়তে প্রতিটি জনপদে কাজ করে চলছে নিরলসভাবে। ছাত্রদের মাঝে ঘুণেধরা সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ৪১ বছরের পথচলায় জাতিকে উপহার দিয়েছে একদল সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব। জাতি গঠনে ছাত্রশিবিরের এই অগ্রযাত্রা আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে ইনশা-আল্লাহ।

আমাদের হৃদয়ে একটি সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য এদেশের সবুজ আঙিনায় সুষ্ঠু পরিবেশে বেড়ে উঠবে কান্ডারী আজকের তরুণেরা। তাদের সততা, দক্ষতা আর দেশপ্রেমের ছোয়ায় এ দেশ পাল্টে যাবে, এগিয়ে যাবে শান্তি আর সমৃদ্ধির পথে। মহান রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষিত হবে এই বাংলাদেশে। দ্বীনের সেই প্রত্যাশিত বিজয়ের পথে দীপ্ত পদভারে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ।

মোবারক হোসাইন, সেক্রেটারি জেনারেল,বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

সংশ্লিষ্ট