মঙ্গলবার, ২০ মার্চ ২০১৮

ড.মোবারক হোসাইন

পরিকল্পিত সময় ব্যবস্থাপনা পৌঁছে দিবে সাফল্যের স্বর্ণদুয়ারে

যেকোনো কাজে সফলতার জন্য পরিকল্পিত সময় ব্যবস্থাপনা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পিত সময় ব্যবস্থাপনা প্রয়োগের মাধ্যমে জীবনের মোড় ঘুরে যেতে পারে। একটি প্রবাদ আছে, ‘সময়ের একফোঁড়, অসময়ের দশফোঁড়’। সময় মানুষের সবচেয়ে সীমিত সম্পদ। কারো পক্ষেই একদিনকে ২৪ ঘণ্টার চেয়ে বড় করা সম্ভব না। কারো কাছ থেকে কেনা সম্ভব না, ধার করা সম্ভব না; জোর করে আনা সম্ভব না। ইমাম শাফেয়ি (রহ)-এর মতে, Time is like a sword: You don’t cut it, it will cut you.সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য সুন্দর পরিকল্পনার বিকল্প নেই। পরিকল্পনা হলো যেকোনো কাজের দরজা। To plan master is to plan the gateway to learning. ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে যে- Well plan is half done অর্থাৎ কোন কাজের পরিকল্পনাই কাজের অর্ধেক। সাফল্যের স্বর্ণদুয়ারে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজন সময়ের পরিকল্পিত ব্যবহার ও সুন্দর পরিকল্পনা।

পরিকল্পিত সময় ব্যবস্থাপনার মধ্যে তিনটি শব্দ রয়েছে। প্রথম শব্দটি পরিকল্পনা। পরিকল্পনা হচ্ছে ভবিষ্যৎ পালনীয় কর্মপন্থার মানসিক প্রতিচ্ছবি। পরিকল্পনা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সময়ের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করে। প্রবাদ আছে যে, যদি আমরা পরিকল্পনা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমরা ব্যর্থ হওয়ার পরিকল্পনাই গ্রহণ করলাম (If we fail with right scheme, we will take the wrong succeed)। পরিকল্পনাবিহীন কাজ মানেই উদ্দেশ্যবিহীন কাজ। লক্ষ্য বা টার্গেট বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সময় ব্যবস্থপনার সুন্দর পরিকল্পনা। আবরাহাম লিঙ্কন বলেন, If we could first know where we are, and whither we are tending, we could better judge what to do, and how to do it.

দ্বিতীয় শব্দটি সময়। সময়ের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো ঞরসব. ঞরসব শব্দটি এসেছে খধঃরহ ভাষা থেকে। ঞবসঢ়ঁং থেকে ঞরসব এসেছে। যার অর্থ কোনো কিছু ঘটে অতীত হয়ে যাওয়া বা যাহা চলমান। সময় হলো সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, সপ্তাহ, মাস ও বছর। সময় হচ্ছে পরিমাপক, যা ঘটেছে যা ঘটছে এবং যা ঘটবে এই তিনের ভেতরে পার্থক্য নিরূপণকারী পরিমাপক। বিখ্যাত দার্শনিক আশরাফ আলী থানবী (রহ) বলেন, কাল বলতে আমরা মাত্র তিনটি দিনই বুঝি। গতকাল, আজ ও আগামীকাল। আমরা সময়কে এভাবে বিশ্লেষণ করতে পারি- Time (T= Target, I= Important work list, M= Management, E= Evaluation
শেষ শব্দটি ব্যবস্থাপনা বা Managemen। Managemen শব্দকে ৩ ভাগে ভাগ করা যায়-Manage+Men+T (Tactfully) অর্থাৎ মানুষকে কৌশলের সাথে পরিচালনা করাই হলো ব্যবস্থাপনা। লুইস এ এলেন- Management is what a manager does. ব্যবস্থাপনা হলো চালিকাশক্তি যা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যাবলি অর্জনে সাহায্য করে। এল গুলিক এর মতে, ‘পরিকল্পনা, সংগঠন, কর্মীসংস্থান, নির্দেশনা, সমন্বয়সাধন রিপোর্ট প্রদান ও বাজেট প্রণয়ন। (সংক্ষেপে ÔManagement is what a manager does).

সুতরাং, সময়ব্যবস্থাপনা হচ্ছে নিজেকে এমনভাবে পরিচালনা করা যাতে, আমরা যে সময়ের গতিতে আবদ্ধ সেই সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি। সময় ব্যবস্থাপনা হলো প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যাবলি অর্জনের জন্য সময়কে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা।

কাজের পরিকল্পনা আজ/এ সপ্তাহে/এ মাসে/এ বছরে কী কী কাজ করবো। অতঃপর গুরুত্বানুসারে শ্রেণীবদ্ধ করতে হবে। যেমন:
Grade–A : Most important work  (আজই করা দরকার এবং আমাকেই করতে হবে)
Grade–B : Very important work (আজই করা দরকার তবে অন্যের সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে)
Grade–C : Important work  (আগামী কাল করলেও চলবে)
Grade–D : Less important work  (কম গুরুত্বপূর্ণ, করলে কল্যাণ আছে না করলে ক্ষতি নেই)
কাজের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ম্যাককিনসের সপ্ত ‘ঝ’ কাঠামো ব্যবহার করতে পারি। কৌশল (Strategy), কাঠামো (structure), পদ্ধতি (System), স্টাইল (Style), কর্মীবাহিনী (Staff), দক্ষতা (Skill) এবং পারস্পরিক মূল্যবোধ (Shared values)

পরিকল্পনার লক্ষ্য বাস্তবায়ন: পরিকল্পনা প্রণয়নে অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করতে হয়। যেমন:
১. ভিশন (vision): স্বপ্ন, কেন প্রতিষ্ঠানটি তৈরি হয়েছে, কি করতে চায়?
২. মিশন (mission): ভিশনে পৌঁছার জন্য বর্তমানে যা করণীয় তাই মিশন।
৩. উদ্দেশ্য (0bjectives): উদ্দেশ্য হলো কোন কাজের চূড়ান্তরূপ।
৪. কৌশল (Strategy): কৌশল হলো, লক্ষ্য অর্জনের উপায়।
৫. নীতি (principle) বা পলিসি (policy): নীতি বা পলিসি হলো কোন কিছু করার বা না করার নির্দেশনা।
৬. বিধি (rules) : কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে কোন বিশেষ ও নির্দিষ্ট কার্যক্রম নেয়া হবে তা নির্ধারণ করা।
৭. কার্যপ্রণালী (work system): এটি ভবিষ্যতে কাজ সম্পাদনের জন্য উত্তম প্রণালী ঠিক করে দেয়।
৮. বাজেট (budget): পরিকল্পনা যখন সংখ্যা দ্বারা প্রকাশ করা হয় তখন তা হয়ে যায় বাজেট।

পরিকল্পনায় দায়িত্ব নির্দিষ্টকরণ: কে কাজ করবে এটা পরিকল্পনায় সুনির্দিষ্ট করা দরকার। তা করার জন্যই কাউকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দিতে হবে। যদি কোন কাজের জন্য প্রত্যেকেই দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়, তাহলে কাজটি হবে না কারণ প্রত্যেকেই মনে করবে কেউ একজন কাজটি করবে। এ ক্ষেত্রে ‘বাদশা এবং তার মধুর দিঘী’ গল্পের মাধ্যমে আমরা পরিষ্কার হতে পারি-

একজন বাদশা, তিনি মধু পছন্দ করতেন। জনগণ তাকে কত ভালোবাসে তা পরীক্ষা করতে চাইলেন। তিনি একটি শূন্য ব্যারেল শহরের কেন্দ্রে রেখে দিয়ে বললেন, যারা তাকে ভালোবাসে তারা যেন এই ব্যারেলের ভেতর এক কাপ করে খাঁটি মধু রেখে দেয়। একজন ভাবল, যেহেতু অন্য সকলে মধু রাখতে যাচ্ছে সেহেতু সে পানি রাখলে দোষ কী? এক ব্যারেল মধুতে এক কাপ পানি কিছুই না। পরে রাজা যখন ব্যারেল খুললেন তখন দেখতে পেলেন শুধুই পানি। এটা পরিষ্কার প্রত্যেকে একই ধারণা পোষণ করেছে। এ গল্প শিক্ষা দেয় যে, দায়িত্ব হলো ব্যক্তিগত ব্যাপার। অন্যরা করবে এই ভেবে আপনি আপনাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন না। রাসূল (সা) এ কথাটি এভাবে বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই একজন রাখাল অর্থাৎ দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই স্ব স্ব দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।” (সহীহ আল বুখারি, সহীহ মুসলিম, সুনানে আল তিরমিজি এবং সুনানে আবু দাউদ)

সময় ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য : সময় ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য হলো তথ্যপ্রযুক্তির কলাকৌশলের মাধ্যমে প্রাপ্ত সময়ের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করে পরিকল্পনা অনুযায়ী অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো। সময় ব্যবস্থাপনার অনেক রীতি, কৌশল, পদ্ধতি ও প্রযুক্তি বিকশিত হয়েছে। আজকের দিনে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে সময়কে কাজে লাগাতে পারি। বর্তমানে সময় ব্যবস্থাপনা জ্ঞানের শাখা হিসেবে বিকশিত হয়েছে।

সময় ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব : সময় ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিকল্পনামাফিক সময়ের ব্যবহার। এ ব্যবস্থাপনা আপাতদৃষ্টিতে মেনে চলা খুব সহজ মনে হলেও আসলে তা নয়। সুষ্ঠু সময় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আরো বেশি কাজ সাফল্যের সঙ্গে শেষ করা সম্ভব। সময়ের গণ্ডিতে বাঁধা আমাদের জীবন, চলমান সময়ের প্রত্যেক সেকেন্ড-মিনিট-ঘণ্টা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সফল জীবন রচনায় প্রয়োজন সঠিক সময় ব্যবস্থাপনা। আল্লাহতায়ালা সূরা আল আসরে বলেছেন : ‘সময়ের কসম। মানুষ আসলে বড়ই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করতে থেকেছে, একজন অন্যজনকে হক কথার ও সবর করার উপদেশ দিয়েছে।’ আমরা যদি সময়কে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারি তাহলে আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে জ্ঞানচর্চা, দেশসেবা, সমাজসেবা, মানবতার জন্য, নিজের ধর্ম ও আদর্শের জন্য কাজ করা। আর রাষ্ট্রেরও সময় ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে হংকংয়ের একটি রাষ্ট্রীয় সময় ব্যবস্থাপনার দৃষ্টান্ত হতে পারে- হংকং একটি সড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে দেখল পাহাড়ের পাশ দিয়ে রাস্তা নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে পাহাড় কেটে ভেতর দিয়ে রাস্তা নেয়া হয় তাহলে পাঁচ সেকেন্ড সময় কম লাগবে। কিন্তু এতে রাষ্ট্রের ব্যয় হবে ১০০ কোটি টাকা। হংকং রাষ্ট্রীয় পাঁচ সেকেন্ড সময় বাঁচানোর জন্য ১০০ কোটি টাকা খরচ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রাষ্ট্রীয় সুষ্ঠু সময় ব্যবস্থাপনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সময়ের সঠিক ব্যবহার ও সময় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা অর্জন করে জীবনে সাফল্য অর্জন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যক্তি সাফল্য থেকেই ধাপে ধাপে পরিবার, সমাজ ও দেশের সাফল্য নিশ্চিত হবে। এই জীবনকে আলোকিত করতে সময়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। চার্লস ডিকেন্স বলেন, ‘বড় হতে হলে সর্বপ্রথম সময়ের মূল্য দিতে হবে।’ কেননা প্রবাদ আছে, Time and tide wait for none অর্থাৎ সময় ও ¯্রােত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। আর জীবনে বড় কিছু করতে হলে তা শুরু করতে হবে উপযুক্ত সময়ে। কারণ, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাত্র ১৭ বছর বয়সে সমাজ সংস্কারে হিলফুল ফুজুল গড়ে তুলেছিলেন। আইনস্টাইন ১৬ বছর বয়সেই আপেক্ষিক মতবাদ নিয়ে প্রথম চিন্তা করেন, যা পরবর্তীকালে ২৬ বছর বয়সে প্রমাণ করেন। সময় ব্যবস্থাপনার ওপর পৃথিবীর বিখ্যাত মনীষীরা বিশাল বিশাল রচনা তৈরি করে চলেছেন। সবার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হলো, ‘সীমিত সময়ের মধ্যে আরো বেশি কাজ করার কলাকৌশল আবিষ্কার করা।’

বিখ্যাত বই The Effective Executive এর লেখক পিটার ড্রাকার, সময়-ব্যবস্থাপনার জন্য তিনটি ধাপ অনুসরণের সুপারিশ করেন। বইটির যে অধ্যায়ে তিনি এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন, তিনি সেই অধ্যায়টার নাম দিয়েছেন : “নিজের সময়কে জানুন”:

১. আপনার সময়ের বিশ্লেষণ করুন
২. নিষ্ফল বা নিরর্থক চাহিদাগুলো ছাঁটাই করুন
৩. হাতে সময় নিয়ে আপনার কাজগুলো সম্পন্ন করার লক্ষ্য স্থির করুন।

সময়কে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর উপায় : সময়কে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে সফলতা আসবেই। উপায়গুলো নিম্নরূপ :
১. সময় হত্যা থেকে বিরত থাকা : সময়কে কোন কাজে না লাগানোর অর্থই হচ্ছে সময় হত্যা করা। সে সময় যত অল্পই হোক না কেন।
২. সময় ব্যয়ের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ: সময় ব্যয়ের স্বাধীনতা থাকায় অনেক ক্ষেত্রে এক ঘণ্টার কাজ ২ ঘণ্টায় করা হয়, এ স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রতিদিন ১ ঘণ্টা করে সময় বাঁচাতে পারলে বছরে ৩৬৫ ঘণ্টা সময় বেশি কাজ হবে।
৩. কাজের অগ্রাধিকার তালিকা করা: অগ্রাধিকার তালিকা না করলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ থেকে গেছে আর কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা হয়েছে।
৪. দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর করতে হবে: কোন কাজ কোন সময় করা হবে? কোনটা করা হবে? কোনটা করা হবে না? এ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগা মোটেই ঠিক না। এ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে অযথা অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়। নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করে নির্বিঘেœ কাজ করে যেতে হবে।
৫. সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করা: ইসলামের মৌলিক শিক্ষাই হলো যখন যে কাজ তখন সেটি করা। সালাতের সময় হয়েছে তো সালাত আদায় করে নেয়াটাই তখন কর্তব্য। বিলম্বিত না করে সময়ের কাজ সময়ে করা উচিত।
৬. কাজের সময়সূচি সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট হওয়া: প্রতিটি কাজের সময়সূচি লিখিতভাবে থাকাটাই উত্তম।
৭. শেষ সময়ের জন্য কাজ রেখে না দেয়া: একেবারে প্রান্তিক সময়ে কোন কাজ করার জন্য রেখে দেয়া ঠিক নয়। কারণ, তখন কাজটি করার সুযোগ নাও পাওয়া যেতে পারে।
৮. একসাথে অনেক কাজ করার চেষ্টা করা: এক সাথে অনেক কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। গাড়িতে বসে প্রয়োজনীয় ফোন করার কাজটা সেরে নেয়া যেতে পারে।

সময় ব্যবস্থাপনা ও আমাদের করণীয় : সময় মানুষের জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রতিটি কাল, ক্ষণ, মুহূর্ত আমাদের জন্য এতই মূল্যবান যে সেটি আমরা উপলব্ধিই করতে পারছি না। পাশ্চাত্য দেশে বলা হয় ‘Time is money’ অর্থাৎ ‘সময়ই অর্থ’। time বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায় যে, T= Taste of, I= Income as, M= Money in, E= Everywhere. একত্রে বলা যায়- Taste of income as money in everywhere. অর্থাৎ সর্বত্রই সময়ের মধ্যে অর্থ নিহিত। Time is the soul of work. It is the basic structure of human life. It is the root of human success in everywhere. অর্থাৎ সময় হলো কাজের আত্মা। এটা মানুষের জীবনের মৌলিক কাঠামো। সর্বত্র মানুষের সাফল্যের পথ। সময়ই সকল অর্থের মূল উৎস।
সময়ের মর্যাদা : সময় তার আপন গতিতে চলে। কারো জন্য এক মুহূর্তও অপেক্ষা করে না। এটা এমন এক অমূল্য সম্পদ যা হারালে আর পাওয়া যাবে না। পাশ্চাত্যে সময়কে বলা হয় অর্থ কিন্তু একজন মুসলমানের জীবনে সময় অর্থ, স্বর্ণ, হীরা, মণি-মুক্তা সবকিছুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের প্রকৃত নাম মূলত জীবন। সময় ব্যবস্থাপনার মূলমন্ত্র হচ্ছে সময়ের প্রকৃতি ও গুরুত্ব অনুধাবন করা। সময় হলো অদ্বিতীয় সম্পদ, সময় অস্থিতিস্থাপক, সময় ক্ষয়প্রাপ্ত, যা কখনো জমা থাকে না, সময় কখনো প্রতিস্থাপনযোগ্যও নয় এবং এর কোনো বিকল্পও নেই।

সময়ের প্রকৃতি কী? আল্লামা সুয়ুতি রহ: ‘জামউল জাওয়ামে’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, রাসূল (সা) এরশাদ করেন, “প্রতিনিয়ত সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘দিন’ এই ঘোষণা করতে থাকে যে, যদি কেউ কোন ভাল কাজ করতে চায়, তাহলে যেন সে তা করে নেয়। আমি কিন্তু আর ফিরে আসবো না। আমি ধনী-দরিদ্র, ফকির-মিসকিন, রাজা-প্রজা সকলের জন্য সমান। আমি বড় নিষ্ঠুর। আমি কারো প্রতি সদয় ব্যবহার করতে শিখিনি। তবে আমার সঙ্গে যে সদ্ব্যবহার করবে সে কখনও বঞ্চিত হবে না।”

সময়ের সঠিক ব্যবহারেই জীবনে সফলতা : সময়ের সঠিক ব্যবহার ছাড়া জীবন সুন্দর করে গড়া অসম্ভব। তাই সময়ের সঠিক ব্যবহার করে কিভাবে সফলতার চরম শিখরে পৌঁছনো যায়। প্রতিটি কাজ নির্দিষ্ট সময়ে সম্পাদন করাই বুদ্ধিমানের কাজ। প্রত্যেকের-ই দৈনন্দিন কাজের একটা রুটিন থাকা আবশ্যক।

সাফল্য লাভের পাথেয় : সাফল্য লাভের ক্ষেত্রে ভালো অভ্যাসের নিয়মিত পরিচর্যা করা দরকার। সাফল্য লাভের পাথেয়ের ক্ষেত্রে ঞযব চড়বিৎ ড়ভ ঋড়পঁং গ্রন্থে ঔধপশ ঈধহভরবষফ ফোর-ডি ফর্মুলা ও টিএ-ডিএ পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন (ঔধপশ ঈধহভরবষফ, ১৯৪৪)। ভালো অভ্যাসের নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে খারাপ অভ্যাস দূর করা যায়।

(ক) ফোর-ডি ফর্মুলা (4-D Solution): অনেক জরুরি কাজের মধ্য থেকে সবচেয়ে জরুরি কাজটা খুঁজে বের করা। স্বাভাবিকভাবে অফিসে থাকাকালীন সময়ে আমাদের অনেক কাজ করা লাগে। এই প্রসঙ্গে সময় ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ হ্যারল্ড টেইলর বলেন, সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি বেছে নিতে হবে।
১. নিজেকে না বলুন (Dump it)- গুরুত্ব বিবেচনা করে কম গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ফেলে রাখুন ও “আমি এখন করব না” এই বিষয়টি নিজেকে বলতে হবে। এই ব্যাপারে দৃঢ় থাকতে হবে।
২. সহকর্মীর সহযোগিতা নেয়া (Done it)- সব কাজ নিজেকে করতে হবে বিষয়টি ঠিক তেমন না। কোনপ্রকার সংকোচ ছাড়াই যে কাজটি অন্যকে দিয়ে করানো যাবে তাকে দিয়ে করাতে হবে। ফলে অল্প সময়ে অনেক কাজ করার সুযোগ থাকবে।
৩. এই মুহূর্তে করার দরকার নাই (Defer it)- কিছু কাজ আছে যেগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে না করলেও চলেবে।
৪. এই মুহূর্তে করা দরকার (Do it)- যে কাজটি ঠিক এই মুহূর্তে করার কারণে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে।

(খ) টিএ-ডিএ পদ্ধতি (TA-DA Formula): এই পদ্ধতি যে কাউকে ভবিষ্যতের আসন্ন সমস্যা মোকাবেলায় সতর্ক হতে সাহায্য করবে। আর তাই যে কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে, এই পদ্ধতি ব্যবহার খুবই কার্যকর।
১. গভীর মনোনিবেশ (Think)- যথাসময়ে কাজ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর গভীর চিন্তা সকল বিষয় সামনে নিয়ে আসে।
২. পরামর্শ করুন (Ask)- কাজের বিষয়ে জ্ঞান আছে এমন একজন পরামর্শকের সাথে পরামর্শ করা।
৩. সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Decide)- সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নেতিবাচক ও ইতিবাচক উভয় ফলাফল কেমন হতে পারে তার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে হবে। একটা বিষয় আমরা জানি, সিদ্ধান্ত গ্রহণই হচ্ছে মূল কাজের অর্ধেক।
৪. সিদ্ধান্তের পর কাজে নেমে পড়ুন (Act)- গভীর মনোনিবেশের ওপর তথ্য বিশ্লেষণ এবং সর্বোপরি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর কাজে নামা। এটি হলো টিএ-ডিএ পদ্ধতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সময় ব্যবস্থাপনার কৌশল : আসলে ‘সময় ব্যবস্থাপনা কৌশল’ হচ্ছে সময়ের প্রেক্ষিতে নিজেকে ব্যবস্থাপনা করা। কারণ, সময় ব্যবস্থাপনার থিওরি হচ্ছে- সময়কে ব্যবস্থাপনা করা যায় না। এটি তার নির্ধারিত নিয়মে বয়ে চলছে; এর গতির ওপর মানুষের কোন হাত নেই। তাই বলা যেতে পারে, You cannot manage your time; rather you have to be managed according to your time. অর্থাৎ আপনি সময়কে ব্যবস্থাপনা করতে পারেন না; তাই সময় অনুসারে আপনার নিজেকেই ব্যবস্থাপিত হয়ে যেতে হবে। সুতরাং সময় ব্যবস্থাপনার কৌশলের ক্ষেত্রে কতগুলো বিষয় লক্ষণীয়-
১. টেলিফোনে সাক্ষাতের সময় নিশ্চিত করা
২. কাগজ, কলম, নোট বুক সাথে রাখা
৩. কিছু কাজ অন্যকে দিয়ে করান
৪. গড়িমসি বন্ধ করা
৫. কিভাবে সময় নষ্ট হয় তা খুঁজে বের করা
৬. গুরুত্ব অনুসারে কাজের ক্রম নির্ধারণ
৭. জড়ঁঃরহব তৈরি করা ও যতটা সম্ভব মানার জন্য চেষ্টা করা
৮. কাজের জন্য সময় নির্ধারণ
৯. কাজ হওয়া উচিত পরিকল্পনার আলোকে
১০. শেখার ক্ষেত্রে মনোযোগ দিয়ে শিখে নেয়া
১১. ফাইলপত্রসহ সবকিছুর সঠিক আর্কাইভিং করা
১২. বড় কাজকে ছোট ছোট পার্টে ভাগ করে ফেলা
১৩. ছুটির দিন বা অবসরের দিনকে কাজে লাগানো
১৪. তাড়াতাড়ি করুন, কিন্তু তাড়াহুড়া করবেন না
১৫. কাজের কোয়ালিটি নিশ্চিত করা জরুরি।

সময় বাঁচানোর কৌশল
১. প্রত্যেকটি জিনিস তার নির্দিষ্ট স্থানে রাখা
২. একটি ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা
৩. সফলতার জন্য বারবার চেষ্টা করা
৪. বদঅভ্যাস ত্যাগ করা
৫. কী ধরনের কাজ তা পরিকল্পনা করা
৬. সময়ের ধারাবাহিক ব্যবহার
৭. সময় নষ্টের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা
৮. বিভিন্ন ধরনের মানসিক চাপমুক্ত থাকা।

ইসলামে সময়ের গুরুত্ব : সময় শব্দটি তিন অক্ষরের ছোট শব্দ হলেও এর ব্যাপ্তিকাল অনেক বড়। সৌর বছরে ৩৬৫ দিন আর চন্দ্র বছরে ৩৫৪ দিন। ঘণ্টার হিসাবে ২৪ ঘণ্টা এবং মিনিটের হিসাবের দিক দিয়ে ১৪৪০ মিনিট। সময়ের সমষ্টিই জীবন। মানুষ তার দুনিয়ার জীবন কিভাবে অতিবাহিত করেছে আখিরাতে সে হিসাব প্রদান করতে হবে। সময় আল্লাহতায়ালার অসংখ্য নিয়ামত। মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও হাদিসের বিভিন্ন স্থানে সময়ের বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনা ছাড়া মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাসূল সা: পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটি বিষয়ের ওপর অগ্রাধিকার বা গুরুত্ব দেয়ার জন্য বলেছেন : ‘বৃদ্ধকাল আসার আগে যৌবনের, অসুস্থতার আগে সুস্থতার, দারিদ্র্যের আগে সচ্ছলতার, ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার আগে অবসরের ও মৃত্যু আসার আগে জীবনের।’ সময় বিশ্লেষণে হাদিসখানা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা, পারিপার্শ্বিকতা ও প্রতিটি কাজের জন্য বিশ্লেষণমূলক সঠিক সময় নির্ধারণ ও বিন্যস্তকরণ ইসলামের দাবি। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সেই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে, যারা বাজে কাজ থেকে বিরত থেকেছে।’ (সূরা মুমিনুন : ১ ও ৩) মুমিনের অবসর সময় বলতে কিছু নেই। বরং একটু অবসর সময় যদি চলে আসেও তাতেও আল্লাহ কাজ দিয়ে দিচ্ছেন। ‘কাজেই যখনই অবসর পাও, ইবাদাতের কঠোর শ্রমে লেগে যাও এবং নিজের রবের প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করো।’ (সূরা আলাম নাশরাহ : ৭-৮) আল্লাহতায়ালা মানুষকে সময়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বোঝানোর জন্য আল-কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় সময়ের কসম করেছেন। যেমন : শপথ রজনীর, যখন তা আচ্ছন্ন হয়ে যায়, শপথ দিনের, যখন তার আলোকিত হয়। (সূরা আল লাইল : ১-২) মহানবী (সা) সময়কে গুরুত্ব দিতে এবং একে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে অনেক তাকিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন : কিয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দেয়ার আগে কোন আদম সন্তান এক কদমও নড়তে পারবে না। ১. নিজের জীবনটা কোন পথে কাটিয়েছ? ২. যৌবনকাল কোন পথে কাটিয়েছ? ৩. ধনসম্পদ কোন পথে উপার্জন করেছ? ৪. কোন পথে ধনসম্পদ ব্যয় করেছ? ৫. জ্ঞানার্জন যা করেছো সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছো? (তিরমিজি শরিফ) উল্লিখিত হাদিসের চারটি বিষয়ই সময়ের সাথে সম্পর্কিত।

মাওলানা মওদূদী (রহ) সূরা আসরের তাফসির করতে গিয়ে সময়ের গুরুত্ব এইভাবে তুলে ধরেছেন: পরীক্ষার হলে একজন ছাত্রকে প্রশ্নপত্রের জবাব দেয়ার জন্য যে সময় দেয়া হয়ে থাকে তার সাথে এর তুলনা করা যেতে পারে। ইমাম রাযী একজন মনীষীর উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছেন : ‘একজন বরফওয়ালার কাছ থেকে আমি সূরা আসরের অর্থ বুঝেছি। সে বাজারে জোর গলায় হেঁকে চলছিল- দয়া কর এমন এক ব্যক্তির প্রতি যার পুঁজি গলে যাচ্ছে।’ তার কথা শুনে আমি বুঝলাম এটিই হচ্ছে আসলে- সময়ের কসম। মানুষ আসলে বড়ই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে- বাক্যের ব্যাখ্যা। মানুষকে যে আয়ুষ্কাল দেয়া হয়েছে তা বরফ গলে যাওয়ার মত দ্রুত অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে। একে যদি নষ্ট করে ফেলা হয় অথবা ভুল কাজে ব্যয় করা হয় তাহলে সেটিই মানুষের জন্য ক্ষতি। সময়ের গুরুত্ব উপলব্দি করার জন্য আমরা একজন বুদ্ধিমান রাজার গল্প উল্লেখ করতে পারি।

একজন বুদ্ধিমান রাজার গল্প: অনেক বছর আগে একটা দেশে জনগন তাদের জন্য প্রতি বছর একজন করে রাজা নির্বাচন করতো। নির্বাচিত রাজার নির্ধারিত মেয়াদ এক বছর পূর্ণ হলে তারা তাকে সমুদ্রের মাঝে একনির্জন দ্বীপে নির্বাসনে দিয়ে আসত। দ্বীপে যাবার সময় জনগন বিদায়ী রাজাকে মুল্যবান সাজে সজ্জিত করে মুল্যবান বাহনে চড়িয়ে সবার কাছ থেকে বিদায় নিত। বিদায়ী মুহুর্তটা বিদায়ীরাজার জন্য যতই বেদনা কর হোক না কেন তাও জনুগন নৌকায় করে রাজাকে নির্জন দ্বীপে নির্বাসনে দিয়ে আসত।

একদিন তারা ফিরে আসার সময় এক যুবককে সাগরে একটুকরা কাঠের উপর ভাসতে দেখে তাকে তুলে নিয়ে আসল। তারা যুবককে রাজা হবার নিয়মকানুন ও নির্বাসনের কথা জানিয়ে রাজা হওয়ার অনুরোধ করল। প্রথম যুবক রাজি না হলেও পরে রাজি হয়ে যায়। রাজা হবার ৩ দিন পরে রাজা মন্ত্রীকে বলল, পূর্ববর্তী রাজাদের রেখে আসা নির্বাসন দ্বীপে বেড়াতে নিয়ে যাবার জন্য। মন্ত্রী প্রথম বারন করলেও পরে নিয়ে গেলেন। নতুন রাজা দ্বীপে গিয়ে দেখলেন, দ্বীপটি গহীন জঙ্গল ও হিংস্র জন্তু জানোয়ারের ডাকে ভরপুর এবং পূর্ববর্তী রাজাদের কে হিংস্র জন্তু জানোয়ারে খাওয়া অবশিষ্ট কংকাল। নবরাজার বুঝতে আর বাকী নেই তার পরিনতি কি হবে? তাই রাজ্যে ফিরে এসেই রাজা একশত জন খুব সাহসী ও সামর্থপূর্ন শ্রমিককে বাছাই করে সেই দ্বীপের জঙ্গল পরিস্কার ও হিং¯্র জন্তু জানোয়ার তাড়ানো জন্য নির্দেশ দিলেন। কিছু দিনের মধ্যেই রাজা আবার গিয়ে দেখে আসলে তার দ্বীপটি পরিস্কার করে ফেলা হয়েছে। তারপর রাজা ২য় পর্যায়ে তাদের কে দায়িত্ব দিলে দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে ফলজ ঔষধি গাছের বাগান করতে এবং কিছু উপকারী পশু পাখির বিচরন ক্ষেত্র হিসাবে দ্বীপটি সাজাতে। আর রাজা বিভিন্ন স্থানে ভ্রমনে যাবার জন্য দ্বীপের সাথে সংযুক্ত করে একটি বন্দর তৈরী করতে। কয়েক মাসের মধ্যে দ্বীপটি হয়ে গেল একটি সুন্দর স্থান। জনগন মহাখুশি নবরাজার চালচলন ও সাদাসিদে জীবন যাপন দেখে।

নিদিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর জনগন রাজাকে মুল্যবান সাজে সজ্জিত করে বিদায়ী মুহুর্তে অন্য রাজাদের মত বেদনা ভারাক্রান্ত মলিন চেহারা ও ক্রন্দন করতে দেখলো না। বরং দেখলো হাস্যজ্জলভাবে সবার থেকে বিদায় নিচ্ছেন। হতভম্ব জনগন রাজাকে প্রশ্ন করলেন আপনি এই কঠিন সময় কেন হাসছেন? রাজা উত্তর দিলেন তোমরা জানো না জ্ঞানী লোকেরা কি বলেন, “যখন তুমি এসেছিলে ভবে, কেদেছিলে তুমি হেসেছিল সবে, এমন জীবন তুমি করিলে যাপন, মরিলে হাসিবে তুমি কাদিবে ভুবন।” আমি তেমনি জীবন যাপন করেছি। তোমাদের পূর্বের রাজারা এই নির্দিষ্ট সময় রাজ্য নিয়ে আরাম আয়েশের মশগুল থেকে কাটিয়েছে। আর আমি অতীত রাজাদের থেকে নেওয়া অভিজ্ঞতাকে বর্তমান সময়কে ভবিষ্যতের চিন্তায় পরিকল্পিত ভাবে কাজে লাগিয়েছি। ভবিষ্যতের আরাম আয়েশের চিন্তায় আমি বিপদ সংকুল দ্বীপ কে মনোমুগ্ধকর সুন্দর বাসস্থানে পরিনত করেছি যা তোমাদের রাজ্য থেকেও আরামদায়ক।

এই গল্প থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা- দুনিয়ার জীবনে আমরা প্রত্যেকেই একজন প্রতিনিধি বা খলিফা। আমাদের জীবনের নিদিষ্ট আয়ুস্কালটা পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতির সময় মাত্র। এই সময়টাকে পরিকল্পিত ভাবে কাজে না লাগায়ে দুনিয়ার নানান রং-তামাশায় বিভোর হয়ে পরবর্তী অনন্ত জীবনের কথা ভুলে গেলে আমাদের পরিনতিও হবে ভয়াবহ। আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদাররা! আল্লাহকে ভয় করো। আর প্রত্যেককেই যেন লক্ষ রাখে, সে আগামীকালের জন্য কি প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। আল্লাহকে ভয় করতে থাক। আল্লাহ নিশ্চিতভাবেই তোমাদের সেই সব কাজ সম্পর্কে অবহিত যা তোমরা করে থাক”। (সুরা হাশর : ১৮) সময়ের গুরুত্ব উপলব্দি করার জন্য নিন্মোক্ত বিষয়গুলো লক্ষ্যণীয়-
১. আখিরাতে মুক্তি পেতে হলে দুনিয়ার সময় কাজে লাগাতে হবে।
২. সময় আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে আমানত।
৩. সময়ের সঠিক ব্যবহার যারা করে তারাই সফলকাম।

সময় ব্যবস্থাপনার উপকারিতা: পরিকল্পিত সময় ব্যয় করার অনেক উপকারিতা রয়েছে-
১. অল্প সময়ে সুন্দরভাবে অধিক কাজ করা সম্ভব
২. গুরুত্বানুসারে কাজ করতে সাহায্য করে
৩. অপরিকল্পিত সময় ব্যয় থেকে বিরত রাখে
৪. সময়-সুযোগ কাজে লাগাতে সাহায্য করে
৫. পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করা সম্ভব হয়
৬. ভারসাম্য রক্ষা সম্ভব হয়
৭. অগ্রগতি পর্যালোচনা সম্ভব হয়।

পরিকল্পিত সময় ব্যয় সম্ভব হয় না কেন? অনেক কারণে পরিকল্পিত জীবন যাপন করা সম্ভব হয় না। কারণসমূহ নিম্নরূপ:
১. জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে সিরিয়াস না হওয়া
২. অগ্রাধিকার তালিকা না থাকা
৩. দৈনিক পরিকল্পনা না থাকা
৪. খুঁত খুঁতে স্বভাবের মন
৫. ব্যক্তিগতভাবে অগোছালো
৬. হঠাৎ প্রতিবন্ধকতা আসা
সময় ব্যয় পর্যালোচনা: সময় অপচয় হয় কি না এজন্য সময় ব্যয়ের পর্যালোচনা করা দরকার। কিভাবে পর্যালোচনা করা যায় নি¤েœ একটি প্রফর্মা দেয়া হলো-

সময় কাজ
সকাল ৫:০০ - ৬.০০ মি: ঘুম থেকে ওঠা এবং ফ্রেশ হওয়া, নামাজ আদায়
সকাল ৬:০০ - ৭:০০ মি: কুরআন ও হাদিস অধ্যয়ন এবং ইসলামী জ্ঞানার্জন
সকাল ৭:০০ - ৭:১৫ মি: নাস্তা খাওয়া
সকাল ৭:১৫ - ৭:৩০ মি: কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি
সকাল ৭:৩০ - ৮:০০ মি: কলেজে যাত্রা
সকাল ৮:০০ - ১:০০ মি: ক্লাস
দুপুর ১:০০ - ৩:৩০ মি: নামাজ আদায়, বাসায় ফেরা, খাওয়া, বিশ্রাম
বিকেল ৩:৩০ - ৫:৩০ মি: নামাজ আদায় ও অন্যান্য কাজ
বিকেল ৫:৩০ - ৭:০০ মি: ফ্রেশ হওয়া, নামাজ আদায়, নাস্তা খাওয়া, পরিবারের সাথে সময় কাটানো
সন্ধ্যা ৭:০০ - ১১:০০ মি: পড়ালেখা, নামাজ, খাওয়া ও অন্যান্য
রাত ১১:০০ - ৫:০০ মি: ঘুমানো

কিভাবে সময় ব্যবস্থাপনা করবেন?
১. ভারসাম্যপূর্ণ করা
২. কাজের পরিকল্পিত সময় নির্ধারণ
৩. কাজের মধ্যে বৈচিত্র্য আনা
৪. একটি কাজের সময়সূচি পরিবর্তিত হলে অন্যটি পরিবর্তন না করা
৫. কাজের রিভিউ/পর্যালোচনা
৬. স্টাডি টাইম-টেবিল যথাযথভাবে কাজে লাগানো

সময়সূচি কেন বাস্তবায়িত হয় না? বিভিন্ন কারণে সময়সূচি বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। কারণগুলো হচ্ছে নিম্নরূপ:

১. অবাস্তব সময়সূচি।
২. অস্পষ্ট সময়সূচি
৩. ডেড লাইনের আগ মুহূর্তের জন্য কাজ রেখে দেয়া
৪. প্রতিদিন কাজ না করে এক সাথে করার জন্য কাজ জমিয়ে রাখা

সময়সূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন
১. আত্মবিশ্বাস
২. অ্যাডভান্সড পরিকল্পনা করা
৩. সময়সূচি নিজের সুবিধা অনুসারে তৈরি করা
৪. সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করা
৫. অন্যান্য কাজের সাথে খাপ খাইয়ে সময়সূচি করা
৬. কাল নয় আজই শুরু করুন।

সময় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কতিপয় বিষয়
১. যে কোন কাজের মধ্যে সময় বাঁচানোর চেষ্টা
২. সময় ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা
৩. কাজ দ্রুত শুরু করা
৪. কাজ ও দায়িত্ব বন্টন
৫. ভ্রমণের সময় স্টাডি করা
৬. এক সাথে অনেক কাজ করা
৭. কোন কাজে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় না দেয়া

সময় বাঁচানোর আরও কয়েকটি ইঙ্গিত : হিশাম আল তালিব এ সম্পর্কে তাঁর বইতে চমৎকার আলোচনা করেছেন। তার সার-সংক্ষেপ হচ্ছে:
১. দিনের শুরুতে সকল কাজের লিখিত পরিকল্পনা নেয়া এবং হয়ে গেলে একটি একটি করে কেটে নিন
২. টেলিফোনে না জানিয়ে কারও কাছে না যাওয়া
৩. কাগজ কলম বা ছোট নোট সব সময় সাথে রাখবেন
৪. বিশ্রামের সময়কে নামাজের সময়ের সাথে মিলিয়ে পরিকল্পনা করুন
৫. লেখাপড়া করে, কোন কিছু মুখস্থ করে বা গঠনমূলক কিছু করে অবসর সময়ের সদ্ব্যবহার করুন
৬. সাক্ষাৎ-সূচি করার সময় উভয়ই যেন সঠিক সময় ভালোভাবে বুঝে নেন সে দিকে লক্ষ্য রাখবেন
৭. দূরে যেতে হলে সম্ভাব্য সময়ের চেয়ে বেশি সময় হাতে রাখা
৮. যে কোন কাজ করার সময় প্রয়োজনীয় সকল উপাদান হাতের কাছে নিয়ে নিবেন
৯. আপনার সময়ক্ষেপণ হতে পারে এমন চিন্তাশূন্য এবং আত্মকেন্দ্রিক লোক এড়িয়ে চলবেন
১০. চিঠি বা টেলিফোনে সেরে নেয়া যায় এমন কাজের জন্য ব্যক্তিগত ভাবে যাবেন না
১১. কারো সাথে অ্যাপয়মেন্ট নিয়ে কথা বলতে যাওয়া এবং কত সময় কথা বলবেন তা জানানো
১২. সেল্ফ ম্যানেজার : নিজেই নিজের ম্যানেজার- ব্যবস্থাপক হতে হবে।

সময়কে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোর টিপস :
১. টু-ডু লিস্ট তৈরি করা
২. নিজের সক্ষমতাকে জানা
৩. একটি ভালো পরিকল্পনা করা
৪. পরিকল্পনাকে নিয়মিত পর্যালোচনা করা
৫. কাজের পর্যলোচনা করা
৬. সময়ব্যবস্থাপনার টিপসসমূহ মেনে চলা
৭. ঘুমানোর আগে সারা দিনকে পর্যালোচনা করা
৮. প্রতিদিনের একই ধরনের সমস্যাগুলো থেকে মুক্ত থাকা
৯. সম্ভব হলে কিছু কাজ অন্য কাউকে দিয়ে করানো
১০. সময় এবং কাজকে উপভোগ করা

জীবনকে অর্থবহ, সমৃদ্ধ ও সুখস্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সময় সচেতন ও পরিকল্পিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়া। আদর্শ মানুষ ও সুন্দর জীবনের জন্য প্রয়োজন একটি পরিকল্পিত সময় ব্যবস্থাপনা। আমরা আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সফলতা পেতে চাইলে এর কোনোই বিকল্প নেই।

লেখক : সেক্রেটারী জেনারেল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।

সংশ্লিষ্ট