শুক্রবার, ১১ মে ২০১৮

ঐতিহাসিক ১১মে কুরআনের কর্মীদের প্রেরনার উৎস

ভূমিকাঃ

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেছেন- আমি কুরআনে যা কিছু নাযিল করি তা ঈমানদারদের জন্য উপশমকারী ও রহমত, কিন্তু এ সত্ত্বেও তা জালেমদের জন্য ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে না।-সূরা বনী ইসরাঈল-৮২। এই আয়াতের বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছিল ১৯৮৫ সালে। সেদিন বিশ্ববাসী দেখেছিলো যে, সত্যিই যালিমরা কুরআনের আলোকে মুখের ফুদিয়ে নিভিয়ে দিতে চায়। যেহেতু তা তাদের জন্য অসহ্য। অন্যদিকে সেই কুরআন থেকেই চলার পাথেয় খুঁজে পায় কুরআনের কর্মীরা।

যেভাবে ঘটনা শুরুঃ

১৯৮৫ সালের ১০ এপ্রিল। একটি দিন একটি ইতিহাস। পৃথিবীর ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হলো এক জঘন্যতম ঘটনা। ভারতীয় ২ জন উগ্রবাদী হিন্দু নাগরিক পদ্মমোল চোপড়া ও শিতল শিং কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি মিসেস খাস্তগিরের আদালতে কুরআনের সকল কপি ও অনুবাদ বাজেয়াপ্ত করার আবেদন জানিয়ে একটি রিট আবেদন করেন। তাদের অভিযোগ সূরা বাকারার ১৯১ নং আয়াতের ব্যাপারে। যেখানে বলা হয়েছে- “(সীমা লঙ্ঘনের পর) যেখানেই তোমরা তাদের পাও সেখানেই তোমরা তাদের হত্যা করো। যে সব স্থান থেকে তারা তোমাদের বের করে দিয়েছে তোমরাও তাদেরকে সেসব স্থান থেকে বের করে দাও। (জেনে রেখ) ফেতনা ফাসাদ হত্যার চাইতেও বড় অপরাধ। তোমরা কাবা ঘরের পাশে তাদের সাথে কখনো যুদ্ধে লিপ্ত হয়ো না, যতোক্ষন পর্যন্ত তারা সেখানে তোমাদের আক্রমন না করে। তারা যদি তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে তাহলে তোমরাও তাদের সাথে যুদ্ধ করো। (মূলত) এভাবেই কাফেরদের শাস্তি (নির্ধারন করা হয়েছে)।”

তারা আয়াতের মর্ম এবং আগ-পিছ না বুঝেই প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে বোকার মত এই রিটটি দায়ের করে। তাদের আরো অভিযোগ ছিল- কুরআন যেহেতু কাফের মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করা, তাদের হত্যা করার কথা বলেছে, সেহেতু কুরআন একটি সাম্প্রদায়িক উস্কানীদাতা গ্রন্থ (নাউযুবিল্লাহ)। ভারতীয় সংবিধানের ২২৩ নং ধারা এবং সিআরপিসির ১১৫(ক) ও ২৯৯(ক) ধারাগুলোর উদ্ধৃতি দিয়ে আল কুরআনকে ভারতীয় সংবিধার বিরোধী বলে উল্লেখ করে। বিচারপতি পদ্ম খাস্তগির ভারতীয় সংবিধানে ঐশিগ্রন্থ সম্পর্কে যে বক্তব্য রয়েছে তা হজম করে উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে মামলাটি গ্রহণ করেন। এরপর ২২ এপ্রিল ’৮৫ সালে বিচারপতি তিন সপ্তাহের মধ্যে এফিডেভিট প্রদানের জন্য রাজ্য সরকারের প্রতি নির্দেশ দেন। এ ঘটনায় গোটা ভারত সহ সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের প্রতিটি মুসলিম দেশ এর প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। যার উত্তাল তরঙ্গের জলরাশি আছড়ে পড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠির এই বাংলাদেশে।

কুরআনের কর্মীদের খুনে রঞ্জিত চাঁপাইনবাবগঞ্জঃ

১০ মে জুময়ার নামাজ শেষে বায়তুল মোকাররম মসজিদ থেকে হাজার হাজার ইসলামী ছাত্র-জনতার মিছিল ও সমাবেশ মিলিত হলে লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। পরের দিন ১১ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আলিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ জনাব হোসোইন আহমদ ঈদগাহ ময়দানে বিকাল ৩টায় প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেন। সভার প্রস্তুতির জন্য পুরো জেলাতে লিফলেট বিলি ও মাইকিং করা হয়। এর আগের দিন শুক্রবার মসজিদে জুময়ার খুৎবায় এবং নামাজ শেষে ঈমাম সাহেবেরা পরের দিন সমাবেশে অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান জানায়। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে আবেগ ও উত্তেজনা বইতে থাকে। আবাল-বৃদ্ধ সবাই সেই সমাবেশে অংশগ্রহনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। কিন্তু ১১ মে হঠাৎ করেই তৎকালীন পুলিশ সুপার আওলাদ হোসেন এবং মেজিস্ট্রেট ওয়াহেদুজ্জামান মোল্লার নেতৃত্বে সভাস্থলে ১৪৪ ধারা জারি করে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করে। পুলিশ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। ওয়াহেদুজ্জামান মোল্লা দম্ভ করে চিৎকার দিয়ে বলে উঠে- “এই মুহুর্তে স্থান ত্যাগ করতে হবে নইলে গুলির আদেশ দিব, শালা মৌলবাদীদের সাফ করে দেব।” এতে জনতা উত্তেজিত হয়ে উঠে। তাছাড়া ঘটনার দিন বেলা ১১টার সময় সমাবেশের আহ্বায়ক মাওলানা হোসাইন আহমদকে এসপি অফিসে ডেকে সমাবেশ বন্ধ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু ইতোমধ্যে ইসলামী জনতা, কুরআন প্রেমিক কর্মীরা দলে দলে আসতে থাকে ঈদগাহ ময়দানের দিকে। ১৪৪ ধারার কোন পরোয়াই করেননি তারা। তবে প্রশাসনের এমন বাড়াবাড়িতেও শান্তিপ্রিয় জনতা কোন ধরনের উশৃঙ্খল আচরণ করেন নি। তারা নেতৃবর্গের নির্দেশের অপেক্ষায় ছিলেন। অবস্থা যখন চরম পর্যায়ে তখন শুধুমাত্র -দোয়া করে জনতাকে শান্ত করে- চলে যাব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সেই আবেদনও শুনেনি ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াহেদুজ্জামান মোল্লা। এসময় মোল্লা এই সুযোগ দেয়া হবে না বলে গালি-গালাজ করতে থাকে, “বেটা মৌলবাদীদের দেখে নেব” বলেও প্রকাশ্যে হুমকী দেয়। এসময় ইসলামী জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়লে কুখ্যাত ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াহেদুজ্জামান মোল্লার নির্দেশে এলোপাথাড়ী গুলবর্ষন শুরু করে পুলিশ। ঘটনাস্থলেই ঝরে পড়ে ৮টি তাজা গোলাপ। আহত হন অসংখ্য কুরআন প্রেমিক কর্মী। লাশ আর আহতদের স্তুপে ভরে গেল ঈদগাহ ময়দান। পলায়নরত অসহায় মানুষের পিছু ধাওয়া করে শহরের অভ্যন্তরেও গুলি চালাতে থাকে। টুপি, পাঞ্জাবী আর দাড়ি দেখলেই নির্মমভাবে তাদের উপর আক্রমণ চালানো হয়। সেদিন শুধু কুখ্যাত ম্যাজিস্ট্রেটের কারনেই এমন হৃদয়বিদার ঘটনা ঘটে।পুলিশের নৃশংসতা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, গুরতর আহতদের নিয়ে রাজশাহী হাসপাতালের উদ্দেশে থানার সামন দিয়ে একটি বাস যাচ্ছিল তখন সেই বাসেও তারা হামলা চালায় এবং গুলি করে। এতে আহত হয় গাড়ির হেলপার, মারা যান রেল শ্রমিক নজরুল ইসলাম। আহতদের নামিয়ে দৈহিক নির্যাতন চালানো হয় এবং নিখোঁজ হয় কয়েকজন আহত ব্যক্তি। কেবল হত্যা আর জখম করেই ক্ষান্ত হয়নি পুলিশ, বেশ কয়েকজন হতাহতদেরকে গুম পর্যন্ত করে ফেলেছিল। জানাজার মুহুর্তে লাশ কেড়ে নিয়ে আসা হয়েছিল তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে। এভাবেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। কুরআনের কর্মীদের খুনে রঞ্জিত হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটি।

শহীদ হলেন যারাঃ

কুরআনে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষনা করেছেন- “যারা আল্লাহতায়ালার পথে নিহত হয়েছে তাদের তোমরা (কখনো) মৃত বলো না বরং তারাই হচ্ছে (আসল) জীবিত (মানুষ), কিন্তু (এ বিষয়টির) কোন চৈতন্যই তোমরা রাখ না- বাকার ১৫৪।” এমন মর্যাদারই অধিকারী হলেন চাঁপাইনবাগঞ্জের সেই ৮ জন ভাই। তাঁরা আমাদের দৃষ্টিতে মৃত হলেও মূলত আল্লাহর দৃষ্টিতে তারাই হলেন প্রকৃত জীবিত মানুষ। তাঁরা আল্লাহর নিকট থেকে খাবারও পেয়ে থাকেন। কি সৌভাগ্য সেই ভাইগুলোর! বয়স্করা থেকে শুরু করে একদম শিশুরা পর্যন্ত এ সৌভাগ্যের অংশিদারী হয়ে গেলেন। যারা শহীদের এমন মর্যাদায় ভুষিত তারা হলেন-

১. হরিপুর ১নং উচ্চবিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র শহীদ শাহাবুদ্দীন

২. শংকরবাটী উচ্চবিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেনির ছাত্র শহীদ সেলিম।

৩. নবাবগঞ্জ আলিয়া মাদরাসার ৯ম শ্রেণীর ছাত্র শীষ মোহাম্মদ।

৪. শংকরবাটী উচ্চবিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেনির ছাত্র রাশিদুল হক।

৫. কাশিমপুর এ.কে ফজলুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণীর ছাত্র আব্দুল মিতন।

৬. কৃষকদের মধ্য থেকে শহীদের নেতৃত্ব দেন শহীদ আলতাফুর রহমান।

৭. রিক্সা চালকদের মধ্য থেকে শহীদের নেতৃত্ব দেন শহীদ মোক্তার হোসেন

৮. রেল শ্রমিকদের মধ্য থেকে শহীদের নেতৃত্ব দেন শহীদ নজরুল ইসলাম।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে সেখানে শহীদের সংখ্যা ১১, চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসীদের মতে ২০ এর অধিক। নিখোঁজ ৮-৯ জন। কিন্তু প্রেসনোটে শহীদের সংখ্যা বলা হয়েছে মাত্র ৬ জন!

এখনো সেই শহীদেরা নেপথ্য থেকে আমাদেরকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের রক্তগুলো আমাদের শক্তিতে রুপান্তরিত হচ্ছে হরদম। যখনই তাঁদের কথা মনে হয় তখনই মনের অজান্তেই গেয়ে উঠি-

আমি আমার এ দুটি আঁখি কি করে ধরে রাখি

অঝোরে কান্না বেরিয়ে আসে

যখন মাসের পরে মাস পেরিয় ১১ মে আসে......।

কে এই মোল্লা ওয়াহেজ্জামানঃ

শুরুতে তার নাম ছিল ওয়াহেদুজ্জামান মোল্লা। কিন্তু যখন ১১ মে তিনি সফলতার (!?) সাথে কুরআনের কর্মীদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করে ঐসময়কার আন্দোলনকে দমন করলেন তখন স্বৈরশাসক হু.মু এরশাদ তাকে প্রমোশন দেন। হু.মু এরমাদ মুখে ইসলামের কথা বললেও এটা হলো তার ইসলাম প্রীতির বাস্তব নমুনা। শুধু প্রমোশন দিয়েই ক্ষান্ত হননি বরং তার নামের পিছনের অংশের মোল্লা শব্দটিকে নামের শুরুতে এনে লাগিয়ে দেন। এভাবে দিন চলতে থাকলো। কথায় আছে চোরে চোরে মাস্তুত ভাই। আসলো আওয়ামীলীগ সরকারের আমল। হু.মু এরশাদের সেই প্রমোশনের সেই ধারাকে অব্যাহত রাখতে গিয়ে মোল্লাকে করা হয় খাদ্য ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রনালয়ের সচীব। কথায় বলে রতনে রতন চেনে আর ঘাধায় চেনে মুলা। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়ে সেই কুখ্যাত মোল্লাকে করা হলো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচীব। আর এবার ১৫ জানুয়ারী’১৪ ইং তারিখে মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামানকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচীব থেকে প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়।

যারা ইসলামের শত্র“ তারা দেশেরও শত্র“। প্রথম আলোর এক রিপোর্টে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে সংকট ব্যবস্থাপনাবিষয়ক একটি সেমিনারে অংশ নেয়ার জন্যে মোল্লাকে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো হয়েছিল। তিনি ওয়াশিংটনে পৌঁছলেও সেমিনারে অংশ না নিয়ে নিউইয়র্কে বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটান। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকরা তার উপর ভীষন ক্ষুব্ধ হয়ে ওয়াশিংটন যাওয়া আসা, থাকা-খাওয়া বাবদ সমুদয় টাকা ফেরত দিতে বলেন। টাকা ফেরত দিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি সচীব ওয়াহেদুজ্জামানকে কঠোর ভাষায় চিঠি লেখেন। টাকা শোধ না করলে ভবিষ্যতে তার মার্কিন ভিসা পেতে সমস্যা হবে বলেও জানানো হয়। মার্কিন রাষ্ট্রদূত তার চিঠিতে আরও লেখেন যে, “মার্কিন সরকার গভীর হতাশার সঙ্গে লক্ষ্য করেছে, ওয়াশিংটনে সংকট ব্যাস্থাপনা বিষয়ক সেমিনারে অংশ নেয়ার প্রতিশ্র“তি দেয়া সত্ত্বেও আপনি তা না করে নিউইয়র্কে বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। আপনার এই দায়িত্বহীন আচরনের কারনে ভবিষ্যতে পররাষ্ট্র দপ্তরের জঙ্গীবাদ বিরোধী কর্মসূচীর আওতায় বাংলাদেশীদের প্রশিক্ষন নেওয়া হুমকীর মধ্যে পড়বে।....বাস্তবতা হলো আপনি জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে সংকীর্ণ ব্যক্তি স্বার্থকে বেছে নিয়েছেন।’’

শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনে যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়া বাবদ সমুদয় টাকা যুক্তরাষ্ট্রকে ফেরত দিতে হয়েছে। টাকার পরিমান ছিল ৮ হাজার ৭৮২ ডলার বা ৫ লাখ ৯৭ হাজার ২৩৭ টাকা। এই হলো মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামানের একটি কান্ড। এমন যে আরও কত কান্ড আছে তার কয়টারই বা আমরা হিসাব রাখি। যেই ব্যক্তির জাতীর দায়িত্ব সম্পর্কে এতটুকু সচেতনতা নাই সেই ব্যক্তিকে যদি অনেক বড় দায়িত্ব দেয়া হয় তাহলে দেশের কি হবে তা আর খুলে বলার দরকার নাই। কুরআনের অবমাননা করতে সহযোগিতা করায় হু.মু এরশাদ ৯ বছর রাজত্ব করে ১০ বছর জেল খেটেছিলেন, জানিনা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তাকে এভাবে লাই দিয়ে বড় বড় দায়িত্ব দিয়ে দেশ, জাতি ও নিজের কি ক্ষতি করতে যাচ্ছেন!

যালিমরা কখনই কুরআনকে সহ্য করতে পারে নাঃ

আমরা শুরতেই কুরআনের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম। সেখান থেকেই এটা স্পষ্ট যে, যালেমরা কুরআনকে সহ্য করতে পারে না। তারা সবসময় অন্ধকারেই থাকতে চায়। আলোকে দেখলেই তারা ভয়ে অস্থির হয়ে উঠে। তারা চায় যেভাবেই হোক কুরআনের আলোকে নিভিয়ে দিয়ে অন্ধকারের রাজ প্রতিষ্ঠা করতে। বাদুর বা চামচিকা আলো দেখলে নাকি অনেক ভয় পায়, এজন্যই তারা দিনে বের না হয়ে রাতে বের হয়। জালেমরা হলো সেই চামচিকার মতো। কিন্তু সেই চামচিকা মার্কা জালেমরা চাইলেইতো আর সব কিছু হয়ে যায় না। আলো প্রস্ফটিত হবেই তাতে অন্ধকারের যতই কষ্ট হোক না কেন। আর সেই কথাটি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অনেক সুন্দর করে কুরআনে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ সূরা সফের ৮ নং আয়াতে বলেছেন- “এ লোকেরা মুখের ফুৎকারেই আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়, অথচ আল্লাহ তাঁর এ নূরকে পরিপূর্ণ করে দিতে চান, তা কাফেরদের কাছে যতই অপছন্দনীয় হোক না কেন।” মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামানরা সব সময়েই চাইবে কুরআনের নূরকে নিভিয়ে দিয়ে অন্ধকারে ডুবে থাকেত, কারন আলো এসে পড়লে যে তাদের চামচিকার মতো চিৎকার শুরু হয়ে যাবে।

কিছুদিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতা, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের উপ ত্রাণ ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এবং সমাজকর্ম বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী শ্রী সূর্য কুমার পবিত্র কুরআন শরীফকে নর্দমায় ছুঁড়ে ফেলে। এমন ধৃষ্টতা দেখানোর পরও রাবি প্রশাসন কোন এক অজ্ঞাত কারনে এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপই গ্রহন করেনি। অথচ শিক্ষার্থী সহ সকলেরই দাবী ছিল তাকে ক্যাম্পাস থেকে অন্তত বহিষ্কার করা।

এসব কারনেই হয়তো বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর এক আল্লাহ জিন্দাবাদ কবিতায় লিখেছেন-

“উহারা চাহুক পায়রার খোপ ডোবার ক্লেদ

আমরা চাহিব উদার আকাশ প্রেম অভেদ...”

কুরআন একটি শক্তিঃ

আমরা বরাবরই দেখে আসছি কোন সবল ব্যক্তি অন্য কোন দূর্বল ব্যক্তিকে ‘শক্তি’ মনে করে না। সবলের কাছে দূর্বলের যেহেতু কোন মূল্যই নাই সেহেতু তাকে শক্তি মনে করার প্রশ্নই আসে না। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) যখন কুরআনের দাওয়াত দেয়া শুরু করলেন তখন কাফের-মুশরিকরা যদি সেটাকে শক্তি মনে না করতো তাহলে মুহাম্মদের (সাঃ) বিরোধিতা করার কোন প্রয়োজনই তাদের ছিল না। আবু জেহেলরা জাহেল হলেও তারা বুঝেছে যে, কুরআন একটি শক্তি এবং আগামীদিনে এই শক্তিই তাদেরকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়বে আর সেই কারনেই তারা এই ছোট্ট শক্তিকে হত্যা করার জন্য যারপরনাই কোন চেষ্টার ত্র“টি করেছিল। তারা আল্লাহর রাসূলকে মক্কায় ঢুকতে দিবে না, হজ্জ করতে দিবে না। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কুরআনের দূর্বল কর্মী হলেতো তাঁকে কখনো বাধা দিত না। যেহেতু তারা রাসূলকে (সাঃ) সেরকম দূর্বল ভাবে না সেহেতু তারা মনে করেছিল যে, মুহাম্মদ (সাঃ) মক্কায় ঢুকলেই আমাদের সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে। আবার দেখুন সেই জাহেলরা কুরআনের কর্মীকে (সাঃ) শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েই তাঁর সাথে চুক্তিতে স্বাক্ষর করলো। কুরআন বা রাসূল (সাঃ) যদি শক্তিই না হয়ে থাকবে তাহলে চুক্তি করারই বা কি দরকার ছিল।

আজকে ভারতে কুরআন পোড়ানো হচ্ছে কেন? অবশ্যই তারা এই কুরআনকে একটি শক্তি মনে করে। ভারতের হাইকোর্ট কুরআনেকে নিষিদ্ধ করতে চাচ্ছে কেন, এছাড়াতো অন্য কোন কারন নেই যে, তারা এই কুরআনকে একটি শক্তি মনে করে। আমেরিকায় যখন ৯/১১ এর ঘটনা ঘটলো তখন খৃষ্টানরা কুরআনের প্রতি ঝুকে পড়লো, দলে দলে মানুষ মুসলমান হতে লাগলো। আর এই কারনেই কুরআনকে শক্তি হিসেবে ধরেই মার্কিন পাদ্রি টেরি জেনিস ১১ সেপ্টেম্বর বার্ষিকীতে পবিত্র কুরআন পোড়ানোর কর্মসূচী ঘোষনার পর তা প্রত্যাহার করে নিলেও সেদিন কয়েকটি স্থানে কুরআন অবমাননা করা হয় আর তা করা হয় কঠোর পুলিশি প্রহরার মধ্য থেকে।

ইরানের সর্বচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনী ২০১০ সালে বলেছিলেন “সালমান রুশদির বিশ্বাসঘাতকতার মধ্য দিয়ে যে চরম অপকর্মের সূত্রপাত হয়েছিল, ডেনমার্কের বিকৃত মানষিকতা সম্পন্ন কার্টুনিষ্ট এবং হলিউডের ইসলাম বিদ্বেষী চলচিত্র পরিচালকেরা তা অব্যাহত রেখেছে। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী ও ইহুদীবাদী শক্তিগুলো এখন ইসলাম ও মহাগ্রন্থ আল কুরআনকে তাদের হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।”

এখন দেখুন বাংলাদেশে যারা ইসলামী আন্দোলন করে তাদের প্রতিপক্ষরা তাদেরকে একটি শক্তিই মনে করে। যদিওবা ইসলামী সংগঠনগুলো বিরোধী সংগঠনের তুলনায় একেবারেই ছোট। এত ছোট হওয়ার পরেও তারা ইসলামী আন্দোলনকে এত বড় করে দেখে কেন? কারন এটাই তারা যতবড়ই হোকনা কেন তারা মূলতো অন্ধকারেই নিমজ্জিত। আর তারা কখনোই চায় না যে এখানে আলো প্রস্ফোটিত হোক। তারা অন্ধকারে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করে। সেই কারনেই তারা ছোট আলোক শিখাটুকুকেও নিভিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। কিন্তু তাদের কাজ হলো বোকার মতো। যেহেতু আল্লাহ সূরা সফে বলেছেন যে- তাঁর এই নূরকে কখনই নিভিয়ে দেয়া যাবে না, বরং তা উদ্ভাসিত হবেই, এতে তাদের যত কষ্টই হোক। মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামানরা যতোই চেষ্টা করুক এই জমিন থেকে কুরআনের আলোকে মুছে ফেলতে তাতে তাদের কোন লাভই হবে না। যেহেতু কুরআন হেফাজতের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের।

কুরআন না মানার পরিনামঃ

একবার মহাকবি ডঃ মুহাম্মদ ইকবালের নিকট একজন বন্ধু জিজ্ঞাসা করলেন- বন্ধু তুমিতো অনেক বই পড়েছ, আচ্ছা এসব বইয়ের মধ্যে তোমার কাছে সবচেয়ে ভাল লেগেছে কোন বইটি? কবি বললেন- বন্ধু একটু বসো আমি ভিতরের রুম থেকে আসছি। কবি যখন ভিতরের রুম থেকে বেরিয়ে আসলেন তখন তাঁর হাতে একটি বই, বইটি বন্ধুর হাতে দিলেন। বন্ধু যখন তা খুললেন দেখলেন এই বই আর অন্য কোন বই নয়, এটা হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রেরিত মহাগ্রন্থ আল কুরআন।

এই হলো একজন প্রকৃত পন্ডিতের অবস্থা।

ডঃ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ যখন অনেক বড় বড় পন্ডিতদের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতেন তখন এই কথাটা বলতেন- আপনারা সকলেই অনেক বড়মাপের পন্ডিত। আপনারা অনেক জ্ঞানী, আপনারা অনেক কিছুই জানেন কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখবেন, যাদের মধ্যে কুরআনের কোন জ্ঞান নাই তারা পন্ডিত ঠিকই তবে তার সেই পন্ডিত শব্দের পূর্বে একটা শব্দ বসবে আর সেটা হলো “মুর্খ” অথ্যাৎ তারা হলো মূর্খ পন্ডিত। আর যারা এমন মূর্খ পন্ডিত তাদের ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন- “যে ব্যক্তি আমার স্মরণ (কুরআন) থেকে বিমুখ হবে তার জন্য (জীবনে) বাঁচার সামগ্রী সঙ্কুচিত হয়ে যাবে। (সর্বপরি) তাকে আমি কেয়ামতের দিন অন্ধ বানিয়ে হাজির করবো। সে (নিজেকে এভাবে দেখার পর) বলবে, হে আমার মালিক তুমি আমাকে কেন (আজ )অন্ধ বানিয়ে উঠালে? দুনিয়াতেতো আমি চক্ষুষ্মান ব্যক্তিই ছিলাম। আল্লাহ বলবেন, (আসলে দুনিয়াতেও) তুমি এমনই (অন্ধ) ছিলে। আমার আয়াতসমূহ তোমার কাছে এসেছিল কিন্তু তুমি তা ভুলেছিলে। এভাবে আজ তোমাকেও ভুলে যাওয়া হবে।- সূরা ত্বহা-১২৪-২৬ নং আয়াত।

যেই কুরআন আসলো মানুষের মুক্তির জন্য আমরা যদি সেই কুরআনকেই অবমাননা করি তাহলে আমাদেরকে কঠিন শাস্তি পেতেই হবে। তাছাড়া এটা কোন সাধারণ ব্যক্তির বাণী নয়, স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কর্তৃক নাযিলকৃত আল কুরআন। আল্লাহ এ প্রসঙ্গে সূরা ত্বহার ২ নং আয়াতে নিজেই বলেছেন “(হে নবী) আমি (এ) কুরআন এজন্য নাজিল করিনি যে, তুমি এর দ্বারা কষ্ট পাবে।” অথচ দূর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা অনেকেই এই কুরআনকে আমাদের কষ্টের কারন হিসেবেই ধরে নিয়েছি। আর মুসলমানরা যেহেতু আজ কুরআন বিমুখ তাই তাদেরকে প্রতি পদে পদে বিপদের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। আজকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে, সমগ্র বিশ্বে কোন জাতি সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত, নিপিড়িত, নিগৃহিত, অপমানিত তাহলে উত্তর একটাই “মুসলমান”। অথচ এমনটাতো হওয়ার কথা ছিল না। এ বিষয়টাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনুল করিমে খুব সুন্দর করে বলেছেন- “তোমরা কি (তাহলে) আল্লাহর কিতাবের একাংশ বিশ্বাস করো এবং আরেক অংশ অবিশ্বাস করো? (সাবধান) কখনো যদি কোন (জাতি কিংবা) ব্যক্তি (দ্বীনের অংশ বিশেষের উপর ঈমান আনয়নের) এ আচরণ করে তাদের শাস্তি এ ছাড়া আর কি হবে যে, পার্থিব জীবনে তাদের লাঞ্ছনা ভোগ করতে হবে, তাদের পরকালেও কঠিনতম আযাবের দিকে নিক্ষেপ করা হবে। তোমরা যা করছো আল্লাহ তায়ালা সে সবকিছু থেকে মোটেও উদাসীন নন। -সূরা বাকারা-৮৫।

শেষ কথাঃ

শেষে এসে বলতে চাই কুরআন শুধু মুসলমানদের নামকাওয়াস্তে কোন ধর্মীয় গ্রন্থ নয়। বরং কুরআন সকল মুসলমানের কলিজার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে আছে। কুরআনে হাত দেওয়া মানে মুসলমানের কলিজায় হাত দেওয়া। যেমনটি হয়েছিল সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে। তাঁরা তাঁদের কলিজা বিলিয়ে দিয়েছে ঠিকই কিন্তু কুরআনের অবমাননা কিছুতেই মেনে নেয়নি। আর বাংলাদেশের এই ঘটনার ফলে সারা বিশ্বে একটি জনমত সৃষ্টি হয় এবং এর ফলশ্র“তিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এই মামলাটি খারিজের জন্য এটর্ণী জেনারেলকে নির্দেশ দেয়। ১৩ মে মামলাটি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি বি.সি বাসক বামনের আদালতে স্থানান্তরিত হয় এবং তিনি উক্ত মামলাটি খারিজ করে দেন। সেই থেকেই তৌহিদী জনতা এই দিনটিকে “কুরআন দিবস” হিসেবে পালন করে আসছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ঈদগাহ মাঠে যেন আজো শোনা যাচ্ছে কিশোর শীষ মোহাম্মদের আর্তনাদ, আব্দুল মতিন আর সেলিমের গগণ বিদারী শ্লোগান- “আল কুরআনের অপমান সইবে না আর মুসলমান”। এই আওয়াজ প্রতিটি দেওয়ালে ধ্বনী-প্রতিধ্বনীত হলেও কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনি সিংহাসনে বসে থাকা শাসক দলের। তারা দেখে কালো চশমা আর কানে তুলো দিয়ে। অন্ধ এবং কালা হয়ে। না দেখে না শুনে নির্মমভাবে শহীদ করেছে আমাদের কুরআন প্রেমিক ভাইগুলোকে। তবে শাসকদেরকে এজন্য ধন্যবাদ যে তারা মাত্র ৮ জন ভাইকে শহীদ করে কেয়ামত পর্যন্ত আমাদের প্রেরণার উৎস বানিয়ে রাখলো। সেই শহীদেরা প্রতি নিয়তই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-

আল কুরআনকে ভালবেসে, প্রাণ দিয়েছিল যারা

আজকে দেখ সামনে এসে, রক্ত মাখা শহীদ বেশে

ফের দাঁড়িয়েছে তারা.....।