মঙ্গলবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৪

ছাত্রশিবির ঘোষিত বিভিন্ন দিবস

৬ ফেব্রুয়ারি- প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী

উপমহাদেশের রাজনীতির একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য সক্রিয় ছাত্ররাজনীতির শক্ত অবস্থান,বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছাত্র সংগঠনসমূহের রয়েছে ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ভূমিকা। ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের আদর্শ,উদ্দেশ্য,কর্মসূচি ও কর্মপদ্ধতির মাঝে পার্থক্য থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকতার ধারাবাহিকতায় এখানে যেমন রয়েছে ভিন্ন আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দলসমূহ তেমনি রয়েছে অনেক দলের অঙ্গীভূত ছাত্রসংগঠন। বাংলাদেশের বুকে রয়েছে পাকিস্তান আমল থেকে চলে আসা ছাত্র সংগঠনসমূহ। তারই পাশাপাশি কাজ করছে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে গড়ে ওঠা কতিপয় সংগঠন। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির স্বাধীন বাংলাদেশে গড়ে ওঠা,দলীয় লেজুড়বৃত্তিমুক্ত এক আলোকিত ছাত্রসংগঠনের নাম,একটি স্বতন্ত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে পথচলা শুরু করে একে একে ৩৫টি বছর পেছনে ফেলে এ সংগঠন রচনা করেছে এক গৌরবময় ইতিহাস। একটি গঠনমূলক গতিশীল গণতান্ত্রিক সংগঠন হিসেবে,একটি একক ও অনন্য অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে,মানুষ তৈরির কারখানা হিসেবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির জনতার মনে,লক্ষ তরুণের হৃদয়ে করে নিয়েছে তার স্থায়ী আসন । প্রথম কেন্দ্রীয় সভাপতি মীর কাসেম আলী ও প্রথম সেক্রেটারী জেনারেল মো.আব্দুল বারী।


১১ মার্চ- শহীদ দিবস
১১ মার্চ ইসলামী ছাত্রশিবির ঘোষিত শহীদ দিবস। ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহার চত্বরে ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত নবাগত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ছাত্রমৈত্রী, জাসদ ও ছাত্রলীগের অতর্কিত এবং নিষ্ঠুর হামলায় শাহাদাত বরণ করেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী সাব্বির, হামিদ, আইয়ুব,জাব্বার । ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সাব্বিরই ছিলেন ছাত্রশিবিরের ১ম শহীদ। সেদিন লোহার রড, পাইপগান, দা, কিরিচ দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে হত্যা করা হয় সাব্বিরকে, ইটের উপর মাথা রেখে আরেকটি ইট দিয়ে চুর্ণ-বিচুর্ণ করে মাথা থেকে আবদুল হামিদের মগজ বের করা হয় । মারাত্নক আহত আবদুল জাব্বার এবং আইয়ুব পরবর্তীতে শাহাদাৎ বরণ করেন।

৬ মে- বালাকোট দিবস
১৮৩১ ঈয়ায়ী সালের ৬ মে বালাকোট উপত্যকায় হযরত সাইয়্যেদ আহমদ বেরেলভী ও শাহ ইসমাইল শহীদ শতাধিক মুজাহিদ সঙ্গীসহ ইংরেজ ও শিখ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শাহাদাৎ বরণ করেন। ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের ইতিহাসে বালাকোট দিবস একটি বিশেষ মর্যাদাবান দিন।

১১ মে- কোরআন দিবস
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৮৫ সালের ১০ ই এপ্রিল । পদ্মমল চোপরা ও শীতল সিং নামের দুই ব্যাক্তি কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি মিসেস খাস্তগীরের আদালতে কুরআনের সকল আরবী কপি ও অনুবাদ বাজেয়াপ্ত করার আবেদন জানিয়ে একটি রীট আবেদন করেন। এর প্রেক্ষিতে ১২ই এপ্রিল, ১৯৮৫ বিচারপতি তিন সপ্তাহের মধ্যে এফিডেভিট প্রদানের জন্য রাজ্য সরকারের প্রতি নির্দেশ দেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ভারতসহ সারা বিশ্ব প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে । বাংলাদেশের মুসলিম জনতাও এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাতে থাকে মিছিল সমাবেশের মাধ্যমে ।
বাংলাদেশে কুরআন দিবসের মূল প্রেক্ষাপট চাপাইনবাবগঞ্জ জেলা । সেদিন (১১ই মে) বিকাল ৩ টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ ঈদগাহ ময়দানে এক প্রতিবাদী জনসভার আয়োজন করা হয়। ঐ দিন সকালের দিকে প্রতিবাদ কমিটিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডেকে চাপ দিয়ে সভা স্থগিতের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। প্রশাসন নিজ উদ্যোগে সভা স্থগিত করা হয়েছে মর্মে সভা শুরুর কয়েক ঘন্টা আগে থেকে মাইকিং করা শুরু করে। কিন্ত সাধারণ জনগণ ও ছাত্ররা প্রশাসনের বাধা উপেক্ষা করে ঈদগাহময়দানে সমবেত হতে থাকে। উচ্ছসিত জনতার মিছিল শ্লোগানে এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। এ সময় কুখ্যাত ম্যাজিস্ট্রেট ওহেদুজ্জামান মোল্লা ক্ষিপ্ত হয়ে জনতাকে গালি গালাজ করতে থাকে এবং কোনভাবেই এখানে সমাবেশ করতে দেয়া হবে না বলে জানায়। এ পরিস্থিতিতে মাওলানা ইসারুল হক ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে শুধুমাত্র মুনাজাত করেই সভা শেষ করে চলে যাওয়ার অনুমতি চান। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট ওহেদুজ্জামান মোল্লা এ আবেদন প্রত্যাখান করে । এক পর্যায়ে পুলিশ লাঠি চার্জ শুরু করলে জনতার সাথে পুলিশের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ম্যাজিস্ট্রেট নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালাতে নির্দেশ দিলে ঘটনা স্থলেই এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে ৮ জন মৃত্যু বরন করেন। বিশ্ব মুসলিমের প্রতিবাদের মুখে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এ মামলাটি খারিজের জন্য এটর্নী জেনারেলকে নির্দেশ দেয়। ১৩ই মে কলিকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি বি. সি. বসাকের আদালতে স্থানান্তরিত হলে মামলাটি তিনি খারিজ করে দেন।

২৩ জুন- ঐতিহাসিক পলাশী দিবস
১৭৫৭ সালের এই দিনে দেশপ্রেমের এক বিরল দৃষ্টান্ত উপ-মহাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে । পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ থেকে ২৩ মাইল দক্ষিণে ভাগিরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে সংঘটিত হয়েছে দেশ মাতৃকা রক্ষার যুদ্ধ , স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার যুদ্ধ । সেই যুদ্ধে ব্রিটিশ অধিপত্যবাদের জয় হয়েছিল আর পতন হয়েছিল বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদৌল্লার। দক্ষিণ ভারতে ফরাসীদের সাথে সংগ্রামে খ্যাতিপ্রাপ্ত দুইজন ব্রিটিশ সেনাপতি ক্যাপ্টেন ক্লাইভ ও অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের নেতৃত্বে একদল সৈন্যকে জাহাজযোগে মাদ্রাজ থেকে বাংলায় পাঠানো হয়। তাদের উদ্দেশ্য সিরাজদ্দৌল্লাকে সিংহাসন থেকে উচ্ছেদ করা । এ জন্য ব্রিটিশরা ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেয় । ক্লাইভ ভারতীয় ধনকুবের জগৎশেঠ, রাজ কর্মচারী রায় দুর্লভ, রাজ বল্লভ এবং রাজ পরিবারের আখির চাঁদ, উর্মী চাঁদ, ঘষেটি বেগম, প্রমুখের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে । এদের মাধ্যমে নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের সাহায্য প্রার্থনা করে । ব্রিটিশরা জয়ী হলে মীর জাফরকে বাংলার মসনদে বসার আশ্বাস দেয়া হয় । ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন যুদ্ধ শুরু হয় । মীর জাফরের বিশ্বাস ঘাতকতায় ক্লাইভের ৮শ সৈন্যসহ সর্বমোট তিন হাজার সৈন্যের কাছে ২৮ হাজার অশ্বারোহী ও ৫০ হাজার পদাতিক সৈন্য নিয়ে নবাব বাহিনীর পরাজয় ঘটে । সেদিন বিশ্বাসঘাতকদের জয় হয়। পরে নবাব সৈন্যদের সংগঠিত করে যুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ধরা পড়ে মীর জাফরের পুত্র মীরনের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন। এরপর ঘটনা খুব দ্রুত ঘটতে থাকে। মীর জাফর মসনদে বসেন।পলাশী যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১ কোটি ৮০ লাখ পাউণ্ড দাবি করা হয়। একের পর এক নবাব বদল হতে থাকে। ১৭৬৪ সালে বক্সারের চূড়ান্ত যুদ্ধে ব্রিটিশরা বাংলার ক্ষমতা দখল করে নেয় । ক্রমান্বয়ে গোটা ভারত বর্ষ ব্রিটিশ অধিপত্যবাদের কবলে নিপতীত হয়। ভারতবাসীকে দীর্ঘ পৌনে দুইশ বছর গোলামির শৃংখলে আবদ্ধ থাকতে হয় ।

১৫ আগষ্ট- ইসলামী শিক্ষা দিবস
পাকিস্তান আমলে সর্বশেষ শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয় ১৯৬৯ সালে । এতে শিক্ষাব্যবস্থার আদর্শিক ভিত্তি কি হবে, তা নিয়ে জনমত জরিপের আয়োজন করা হয় । এর অংশ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে ১৯৬৯ সালের ১২ আগষ্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি.এস.সি. তে আয়োজন করা হয় একটি আলোচনা সভার। এই আলোচনা সভায় বামপন্থীদের বিরোধীতামুলক বক্তব্যের মধ্যে শহীদ আব্দুল মালেক মাত্র ৫ মিনিট বক্তব্য রাখার সুযোগ পান । অসাধারণ মেধাবী বাগ্মী আব্দুল মালেকের সেই ৫ মিনিটের যৌক্তিক বক্তব্যে সভার মোটিভ পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়ে যায় । উপস্থিত শ্রোতারা আব্দুল মালেকের বক্তব্যের সাথে ঐক্যমত্য পোষণ করে । আব্দুল মালেকের ত্বত্ত্ব ও যুক্তিপূর্ণ সংক্ষিপ্ত বক্তব্য ক্ষিপ্ত করে দেয় ইতোপূর্বে বক্তব্য রাখা ইসলাম বিরোধী বক্তাদের । এই ঘটনার প্রেক্ষিতে যুক্তি ও বান্তবতার লড়াইয়ে পরাজিত বাম ও ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠী ক্ষিপ্ত হয়ে তোফায়েল, রাশেদ খান মেনন গংদের নেতৃত্বে আক্রমন চালায় ছাত্রদের ওপর । সকল সংগীকে নিরাপদে বিদায় দিয়ে শহীদ আব্দুল মালেক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশ দিয়ে যাবার পথে লোহার রড-হকিষ্টিক নিয়ে তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে পিশাচ বাহিনী ধর্মনিরপেক্ষ ও বাম সন্ত্রাসীরা । রক্তাক্ত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ছাত্র আব্দুল মালেক । তিনদিন পর ১৫ আগষ্টে শাহাদাত বরন করেন।

৬ ই ডিসেম্বর- বাবরী মসজিদ দিবস
১৯৯২ সালের ৬ ই ডিসেম্বর ভারতের কংগ্রেস ক্ষমতাসীন থাকাকালীন উগ্রবাদী হিন্দুরা উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা শহরে অবস্থিত ষোড়শ শতকের এই অনুপম মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শনটি ধ্বংশ করে । হিন্দু শাস্ত্রীয় রামের জন্মস্থান ও মন্দিরের স্থলে সম্রাট বাবর মসজিদ নির্মান করেছেন মর্মে হাস্যকর অভিযোগ এনে কংগ্রেস সরকারের পৃ্ষ্টপোষকতায় এই নিন্দিত ধ্বংসকান্ড সংগঠিত হয় ।
ভারতের প্রথম মুঘল সম্রাট বাবর ১৬শ শতকের কোন এক সময় অযোধ্যা শহরে এই মসজিদটি নির্মান করেন ।
পরবর্তিতে ১৯৯২ সালের আজকের দিনে কট্টর ও উগ্র হিন্দুবাদী কংগ্রেস সরকারের মদদে উগ্র হিন্দুরা এলাহবাদ হাইকোর্টের নিষেধাঙ্গার তোয়াক্কা না করেই এই অমার্জনীয় অন্যায় কাজে লিপ্ত হয় । সেদিন মুম্বাই, আহেমদাবাদ, বেনারস এবং জয়পুরসহ ২ সহস্রাধিক নিরিহ মুসলমান শাহাদাত বরন করেন ।

১৭ রমযান- ঐতিহাসিক বদর দিবস
হিজরী দ্বিতীয় বর্ষের রমযান মাসের এই দিনে বদর প্রান্তরে ইসলামের প্রথম সম্মুখ যুদ্ধে মহান রাববুল আলামীন সরাসরি সাহায্য দানের মাধ্যমে মুসলমানদের বিজয় দান করেন। তাই এ দিবসকে ইয়াওমুল ফুরকান বা সত্য মিথ্যার পার্থক্যের দিন বলা হয়। সত্যপথের অনুসারী অল্প সংখ্যক রোযাদার মুসলমানরা বিশাল অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত মিথ্যার অনুসারী কাফের মুশরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করে সত্যমিথ্যার চির পার্থক্য সূচিত হয়ে যায়। মহানবী (সাঃ )-এর সাথে জনবল ছিল মাত্র ৩শ' ১৩ জন। এদের ৭০ জন মুহাজির ও বাকীরা আনসার। অপরদিকে কাফের, কুরাইশ বাহিনীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার । তন্মধ্যে ১০০ জন অশ্বারোহী, ৭০০ জন উস্ট্রারোহী ও বাকীরা পদব্রজী ছিল। যুদ্ধে কাফের কুরাইশ বাহিনী শোচনীয় পরাজয় বরণ করে এবং তারা যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পলায়ন করে । ৭০ জন কাফের নিহত ও ৭০ জন বন্দি হয়। অপরদিকে মুসলমানদের মধ্য হতে ১৪ জন শহীদ হন।

সংশ্লিষ্ট