বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০১৬

আব্দুদ্দাইয়ান মুহাম্মদ ইউনূছ

শিবির : নতুন সমাজ গঠনের অঙ্গীকার

বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর পূর্ব অংশে বাংলাদেশের অবস্থান। বাংলাদেশের উত্তরে ভারতের পশ্চিম বঙ্গ মেঘালয় ও আসাম, পূর্বে আসাম, ত্রিপুরা রাজ্য, মিজোরাম এবং বার্মা, দক্ষিণাংশ জুড়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমে পশ্চিম বঙ্গ অবস্থিত। মুসলিম দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট এ দেশটি পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। মোট জনসংখ্যা প্রায় ১২০ মিলিয়ন। জনসংখ্যার শতকরা ৮৮.৩ ভাগ মুসলমান, ১০.৫ শতাংশ হিন্দু, বৌদ্ধ ০.৬, খ্রিস্টান ০.৩ এবং অন্যান্য উপজাতীয় সম্প্রদায় ০.৪। ৬০৬-৬৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশের শাসক ছিলেন শশাংক, রাসূল (সা) তার কাছে ইসলামের দাওয়াতপত্র পাঠান। কিন্তু সে ইসলাম কবুল করেনি। হযরত ওমর (রা)-এর যুগে আবু তালেব, হামেদ উদ্দিন, মামুন, মোহাইমেন প্রমুখ ইসলামের দাওয়াত নিয়ে আসেন। ৮ম-১০ম শতক দেশময় ব্রাহ্মণদের অত্যাচার চলে, এমনকি মূর্তি পূজার খরচ বহন করেও নিুবর্ণের হিন্দুদের ধর্মীয় গ্রন্থ স্পর্শের অধিকার ছিল না। এ সময় সুলতান বায়েজীদ বোস্তামী, সুলতান মাহি সাওয়ার, শায়খ জালালুদ্দীন তিবরীজ প্রমুখ ইসলামের সুমহান দাওয়াত নিয়ে বিভিন্ন সময় আসেন, ইসলামের সত্যিকার আদর্শ প্রচার করতে অনেক অলী দরবেশ নিজেদের আত্মনিয়োগ করেন। ত্রয়োদশ থেকে ১৮শ শতক পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী অনুশাসন অনেকাংশ অনুসরণ করা হত। যদিও বিভিন্ন সময় রাজা শাসকগোষ্ঠীর কেউ কেউ ভোগ বিলাসে মত্ত হয়ে ইসলামী আদর্শ থেকে দূরে সরে আসত, কিন্তু মুজাদ্দেদে আলফেসানী (রহ) শাহজালাল (রহ)সহ অনেক ইসলামী ব্যক্তিত্ব তাঁদের সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে ইসলামের সত্যিকার রূপ জনগণের মাঝে প্রচার প্রসার ও প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালান। এ কেন্দ্রীক তাঁদেরকে জুলুম, নির্যাতনের শিকারও হতে হয়েছে।

১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে মীর জাফরকে বিশ্বাসঘাতকতায় নবাব সিরাজদ্দৌলার পতনের মাধ্যমে ভারত থেকে ১০৪৫ বছরের মুসলিম শাসন ও সভ্যতার উৎখাত হয়। জাতীয় সম্পদ লুটপাটের মাধ্যমে সোনার বাংলাকে ‘শ্মশান’ করা হয়। ঐতিহাসিকদের অনেকের মতে, ‘পলাশীর দুর্যোগপূর্ণ ঘটনা সমগ্র পৃথিবীর রাজনৈতিক মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পতন না হলে তুর্কি সাম্রাজ্যের এমন দুর্গতিপূর্ণ অবসান ঘটত না, আরব উপদ্বীপে ইঙ্গ-ফরাসী দখলদারী কায়েম হতো না, ভারত বর্ষকে ২০০ বছরের জন্য গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ হতে হত না। আর বিষফোঁড়ার মত সমগ্র মুসলিম বিশ্বের যন্ত্রণার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে যে ইহুদী রাষ্ট্রটি, সেই ইসরাঈলেরও অভ্যুদয় হতো না’ মূলত: ১৭৫৭-১৯৪৭ ইং সালের পূর্ব পর্যন্ত ইংরেজ শাসনামলে জুলুম শোষণে ভরে যায়। আধিপত্যবাদী শক্তি এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাসকে পদদলিত করতে চেয়েছে। কিন্তু এই মাটিতে যুগে যুগে জন্ম নিয়েছে সংগ্রামী মানুষেরা। শাহ মাখদুম, শাহজালাল, খানজাহান আলী (রহ), সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভীর মত ব্যক্তিত্ব এদেশে ইসলামী তাহযীব তামাদ্দুন সংরক্ষণ ও ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালান। তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহ, দুদু মিয়া, শেরে বাংলা প্রমুখ আমাদের স্বাতন্ত্র্য-চেতনা, স্বাধিকার আন্দোলনকে করেছে মূর্ত। দুইশত বছরের বৃটিশ শাসনের নিগড়কে এ দেশের জনগণ কখনই শান্তভাবে মেনে নেয়নি। তাই বৃটিশদের আধিপত্যের শৃংখল ভেঙ্গে মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করে। “কুরআন হাদিসের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার পরিবর্তে শাসকগোষ্ঠী নিজেদের মর্জিমতো দেশ পরিচালনা করায় পাকিস্তানের ২৩ বছরের শাসনকালে মানুষ শান্তি ও সুখের মুখ দেখতে পায়নি। অবশেষে ১৯৭১ সালে আবারও লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হল স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতির পাশাপশি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বে-ইনসাফী নির্বিচারে নির্যাতন, এ দেশের মাটি ও মানুষের শিকড়, সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে বিজাতীয় মঙ্গল সংস্কৃতির চর্চা সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ, একদলীয় শাসন কায়েম, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক জীবনকে চরম সংকটপূর্ণ করে তোলে।

অর্থনৈতিক অঙ্গনেও ‘উলট পালট করে দে মা লুটেপুটে খাই’ দর্শন আসন গেঁড়ে বসে। আমাদের সম্পদ ভারতে পাচার হতে থাকে। ইসলামী তাহজীব তামাদ্দুন নস্যাতের প্রক্রিয়া শুরু হয়। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আদর্শ ইসলামকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে উঠার পরিবর্তে ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে জাতির বিশ্বাসের শক্তিকে নস্যাতের ষড়যন্ত্র করা হয়। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়া, আদর্শ বর্জিত শিক্ষা ব্যবস্থা আদর্শ মানুষ উপহার দিতে ব্যর্থ হয়, ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্য দেশের শিক্ষানীতি এবং শিক্ষা কারিকুলামের প্রতিফলিত না হওয়ায় দেশপ্রেমিক, মানবদরদী নাগরিক তৈরির মাধ্যমে দেশের অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। সৎ, যোগ্য, খোদাভীরু মানুষের অভাবে জাতীয় সম্পদ যথার্থ উন্নয়ন ব্যবহৃত হয়নি; ফলে আমরা গরীব হিসেবে নিজেকে পরিচিত হই। সন্ত্রাস নির্ভর লেজুড় বৃত্তির ছাত্র রাজনীতি জাতির ভবিষ্যত ছাত্রসমাজকে নিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ৬, ১১, ১৮, ১৯, প্রভৃতির দফার কথা শুনে শুনে মানুষের ‘রফা’ শেষ। সোনার বাংলা, সবুজ বাংলা, নতুন বাংলার শ্লোগান এ দেশে শান্তি বয়ে আনতে পারেনি। ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে ধর্মহীনতা, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ বিশ্ব মানবতাকে মুক্তি দিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রমাণিত হল মানুষ কোনো দিনই মানুষের জন্য শান্তি ও মুক্তির পথ নির্ণয় করতে পারে না। মানুষের প্রকৃত শান্তি, কল্যাণ ও মুক্তি কোনো পথে তা তিনিই জানেন যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি হচ্ছেন বিশ্ব স্রষ্টা মহান আল্লাহ। আল্লাহর এই জমীনে সকল প্রকার জুলুম ও নির্যাতনের মূলোচ্ছেদ করে আল কুরআন ও হাদিসের আলোকে ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়ের সৌধের উপর এক আদর্শ ইসলামী সমাজ গড়ে তোলার মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ১৯৭৭ সালের ৬ই ফেব্র“য়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। 

যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে এদেশের তদানীন্তন শাসকগোষ্ঠী ইসলাম উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে “রাব্বি যিদনী ইলমা’’ শব্দটি উৎখাত করা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় শাসকদের ব্যর্থতা, দেশ গঠনের যথাযথ কর্মসূচি ও পরিকল্পনার অভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অস্ত্রের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবশক্তির এক বিরাট অংশের সামনে নেমে আসে অমানিশার অন্ধকার। উপরন্তু রক্ষী বাহিনী, লালবাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর নিপীড়ন-নির্যাতন দেশকে ঠেলে দেয় বিপর্যয়ের মুখে। ইসলামের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়, কিন্তু ইসলামপ্রিয় ছাত্রজনতা ইসলামী ছাত্র মিশন, দিশারী তরুণ সংঘ, ঝিংগে ফুলের আসর, অরুণ প্রাতের তরুণ দল, গোলাপ কুঁড়ির আসর, Youngman Muslim Association. স্বদেশ সাংস্কৃতিকগোষ্ঠী প্রভৃতি নামে কাজ করত। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নির্যাতিত, নিপীড়িত মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামী আদর্শ প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অপরিহার্যতা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। ১৯৭৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর সচেতন ছাত্রদের একটি সভা জনাব আবু নাসের মুহাম্মদ আব্দুজ্জাহেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের আর্থ সামজিক রাজনৈতিক অবস্থা মূল্যায়ন করে ছাত্র সংগঠনের আত্মপ্রকাশ সময়ের দাবী বলে বিবেচিত হয়। ছাত্র সংগঠনের নাম কি হবে? একেকজনের একেক প্রস্তাব। জনাব এ, কে, এম নাজির আহমদ প্রস্তাব করেন, ‘জাতীয় ছাত্রশিবির’ এভাবে বাংলাদেশ ছাত্রশিবির, বাংলাদেশ ছাত্র সমিতি, ইসলামী ছাত্রশক্তি বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। অবশেষে জনাব সিদ্দিক জামালের প্রস্তাবক্রমে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির নামটি গৃহীত হয়। সিদ্দিক বাজার কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে অধিকাংশের ভোটে উক্ত নাম পাশ হয়। পরবর্তীতে পূর্ব গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৭৭ সালের ৬ই ফেব্র“য়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে দুপুরবেলা আহ্বায়ক কমিটির নাম ঘোষিত হয়। জনাব মীর কাসেম আলী আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। অন্যান্য সদস্যগণ ছিলেন জনাব মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, বাশারাত হোসেন বকুল, আবু তাহের, এনামুল হক মঞ্জু প্রমুখ। ১৯৭৭ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে জনাব মীর কাসেম আলী কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। জনাব আব্দুল বারী প্রথম সেক্রেটারি জেনারেল মনোনীত হন। মীর কাসেম আলী এপ্রিল মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রাবেতায়ে আলমে ইসলামী বাংলাদেশ এর ডিরেক্টর হবার পর জনাব কামারুজ্জামান ১ মাসের জন্য ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এক মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তী সেশনেও তিনি কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁরা যখন কাজের সূচনা করেন তখন পথ চলার ছিল না অর্থ, ট্রেনের, বাসের, রিকশার ভাড়ার অভাবে হেঁটে হেঁটে কাজ করতেন। চিঠির মাধ্যমে দাওয়াত পৌঁছাতেন। নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন কাজ করে অর্থ সংগ্রহ করতেন যে অর্থ দিয়ে পরিচিতিসহ মৌলিক প্রকাশনা ছাপতেন, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটতেন। আজকে তাঁদের মোট ত্যাগের ফলশ্র“তিতে ‘টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া শিবির আছে দেশ জুড়িয়া’ শ্লোগান শুনতে পাই।

লক্ষ প্রাণে জাগলো সাড়া : মুক্তির পয়গাম
সুন্দর এই পৃথিবী। চারিদিকে চোখ জুড়ানো বিস্তীর্ণ শ্যামল শস্য ক্ষেত। গাছের ডালে ডালে রং বেরঙের ফুল, তারই মাঝে রঙ বেরঙের পাখপাখালী প্রজাপতির মন ভোলানো খেলা।.... মেঘের কোলে ভেসে বেড়াচ্ছে স্বাধীন ডানামেলা পাখিরা, রোদ হাসছে ঝিকমিক। কি সুন্দর! কি সুন্দর এই সৃষ্টি! সৃষ্টির সৌন্দর্য উপভোগ করে শেষ করা যায় না। বিশ্বের প্রতিটি অনু পরমাণু মেনে চলছে আল্লাহর আইন। আর এ জন্যেই এই বিশ্বজগত এত সুন্দর। মানুষ এই দুনিয়ার সুন্দরতম সৃষ্টি, আশরাফুল মাখলুকাত, কিন্তু এই দুনিয়ার দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই মানুষে মানুষে আজ সৃষ্টি হয়েছে ভেদাভেদ, হানাহানি বিদ্বেষ, তাহলে কি মানুষকে এই অশান্তির জন্য আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন? না, কখনই তা হতে পারে না। আল্লাহ মানুষকে বাতলে দিয়েছেন সরল শান্তির পথ সিরাতুল মুস্তাকীম। আল্লাহর দেখানো এই মুক্তির পথ বাদ দিয়ে মানুষ নিজে তার চলার পথ রচনার চেষ্টা করেছে বহুবার। মানবরচিত কোনো মতবাদই মানুষকে মুক্তির পথ দেখাতে পারল না, তাই মানুষের সামনে আজ একটি মাত্র পথ। তার স্রষ্টার দেয়া সহজ সরল পথ ইসলাম। বিংশ শতাব্দীর নির্যাতিত মানবতা মুক্তি পাবে একমাত্র ইসলামেরই পথে। তাই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সর্বত্রই আওয়াজ উঠেছে We Want Islam, We want Quran. একথা আজ পরীক্ষিত সত্য মানবতার মুক্তির জন্য ইসলামের বিজয় অনিবার্য।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির মুক্তিকামী মানুষের কানে কানে পৌঁছে দিচ্ছে মুক্তির পয়গাম। শিবিরের আদর্শের প্রতি “লাখো তরুণ” আকৃষ্ট হচ্ছে- আর শ্লোগান দিচ্ছে মুক্তি চাই, শান্তি চাই- ইসলামের বিজয় চাই, “ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু মানি না মানবো না।” কার্ল মার্কস, লেনিন, মাও সেতুং প্রমুখ ব্যক্তিবর্গের নেতৃত্ব প্রত্যাখ্যান করে ঘোষণা করছে- আমার নেতা তোমার নেতা: বিশ্বনবী মোস্তফা। মানবরচিত মন্ত্র নয় আল কুরআনের রাজ প্রতিষ্ঠায় দৃপ্ত অঙ্গীকার ব্যক্ত করে রাজপথ প্রকম্পিত করছে “আল কুরআনের আলো ঘরে ঘরে জ্বালো”। আমরা চাই দেশ গড়তে কুরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে। শিবির পথভ্রান্ত ছাত্র জনতার কাছে তুলে ধরল মুক্তির পয়গাম। লাখো তরুণের প্রাণে চেতনার সৃষ্টি হল। চারদিকে সাড়া জাগল। আর দলে দলে ভিড় জমাতে লাগল মুক্তির মোহনায় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের পতাকা তলে।

৫ দফা কর্মসূচী : ঈমানের অপরিহার্য দাবী
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জাগতিক সফলতা আসল টার্গেট নয়। এই সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে “আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল (সা) প্রদর্শিত বিধান অনুযায়ী মানুষের সার্বিক জীবনের পুনর্বিন্যাস সাধন করে আল্লাহর সন্তোষ অর্জন।” মূলত আল্লাহর সন্তোষ অর্জনই প্রত্যেক ঈমানদারের দুনিয়ার জীবনের সকল কাজের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত। উল্লেখিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে শিবির ৫ দফা কর্মসূচী ঘোষণা করছে।

দাওয়াত : তরুণ ছাত্র সমাজের কাছে ইসলামের আহ্বান পৌঁছে তাদের মাঝে ইসলামী জ্ঞানার্জন এবং বাস্তব জীবনে ইসলামের পূর্ণ অনুশীলনের দায়িত্বানুভূতি জাগ্রত করা।
অহী প্রাপ্তির পর নবীগণ সর্বপ্রথম যে কাজ করেছেন তা হচ্ছে তৌহিদী জীবন ব্যবস্থার দাওয়াত, তাবলীগ ও প্রচার। আদর্শ প্রতিষ্ঠার পূর্ব শর্ত হলো সে আদর্শের ব্যাপক প্রচার। এ কারণে ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ নবীদের প্রথম বুনিয়াদী কাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সূরা নাহল এর ২৬ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে “আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এ দায়িত্ব দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে দূরে থাক।” দায়ী ইলাল্লাহর কাজ সর্বোত্তম কাজ, এ কাজ করলেই নবীর উম্মতের দাবী করা যথার্থ হবে। শেষ নবীর অবর্তমানে কিয়ামত পর্যন্ত সকল মুসলমানের উপর দাওয়াত দানের এ গুরুদায়িত্ব অর্পিত, কুরআনের ভাষায়- “তোমাদের মধ্যে কল্যাণের দিকে আহ্বানকারী একটি দল থাকা উচিত যারা মানুষকে ন্যায়ের আদেশ করবে এবং অন্যায় থেকে বিরত রাখবে।”

বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। এ দেশের শতকরা ৮৮ ভাগ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও মানুষের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গন কোনো ক্ষেত্রেই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত নেই। দেশে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় তরুণ সমাজ ইসলামের সত্যিকার পরিচয় জানতে পারছে না। ইসলামী ছাত্রশিবির একটি বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে, শিবির ছাত্রদের কাছে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, সাধারণ সভা, চা চক্র, বনভোজন, নবাগত সম্বর্থনা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, বিতর্ক সভা, রচনা ও বক্তৃতা প্রতিযোগিতা, সাধারণ জ্ঞানের আসর, পোস্টারিং, পরিচিতি, পুস্তিকা ও সামরিকী বিতরণ ইত্যাদির মাধ্যমে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ ছাড়াও গ্র“প দাওয়াতী কাজ, দাওয়াতী গ্র“প প্রেরণ, দাওয়াতী সপ্তাহ ও পক্ষ পালন, মোহররমাদের মাঝে কাজ, মসজিদ ভিত্তিক দাওয়াতী কাজের মাধ্যমে দাওয়াত সম্প্রসারণের প্রয়াস চালাচ্ছে। মেধাবী ও যোগ্যতা সম্পন্ন ছাত্রদের মাঝে টার্গেট ভিত্তিক দাওয়াতী কাজ, ছুটির সময় চলো গ্রামে যাই কর্মসূচী পালন, জনশক্তির প্রত্যেকে একজন স্কুল মানের বন্ধু রাখা, ডাকযোগে দাওয়াত ও কর্মী গঠন, গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী ও জাতীয় দিবস পালন, শিশু কিশোরদের উপযোগী বই প্রকাশ বার্ষিক পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত।

সংগঠন : আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ঘোষণা হচ্ছে “ তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না” সূরা ইমরান। মহানবী (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি জামায়াত (সংগঠন) থেকে বের হলো সে ইসলাম থেকে দূরে সরে গেল” তাওহীদের দাওয়াত দেয়ার পর আম্বিয়ায়ে কেরামের দ্বিতীয় বুনিয়াদী কর্মনীতি ছিল দাওয়াতপ্রাপ্তদেরকে ইসলাম কায়েমের জন্য সংঘবদ্ধ করা। ইকামতে দ্বীনের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম করার নির্দেশ সকল নবীদের যুগেই ছিল। তাই শিবির দ্বিতীয় দফা কর্মসূচী “যে সব ছাত্র ইসলামী জীবন বিধান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশ নিতে প্রস্তুত তাদেরকে সংগঠনের অধীনে সংঘবদ্ধ করা”। শিবিরের সংবিধান অনুযায়ী সদস্য ও সাথী এই দুই স্তরের কর্মী রয়েছে। তবে সাথী হওয়ার পূর্বে একজন ছাত্রকে আরও ২টি পর্যায় অতিক্রম করতে হয়, তাহলো সমর্থক এবং কর্মী। একজন কর্মী সাধারণত: নিুলিখিত কাজগুলি করে থাকে। ১. কুরআন ও হাদিস নিয়মিত বুঝে পড়ার চেষ্টা ২. নিয়মিত ইসলামী সাহিত্য পাঠ ৩. ইসলামের প্রাথমিক দাবীসমূহ মেনে চলার চেষ্টা ৪. বায়তুলমালে নিয়মিত এয়ানত দান ৫. নিয়মিত ব্যক্তিগত রিাপোর্ট সংরক্ষণ ৬. কর্মীসভা, সাধারণ সভা প্রভৃতি অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া ৭. সংগঠন কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন ৮. অপরের কাছে সংগঠনের দাওয়াত পৌঁছানো।

সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বশীল নিযুক্ত করা হয়। সদস্য ও সাথী শাখায় সংশ্লিষ্ট শাখার জনশক্তির প্রত্যক্ষ ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হন। জেলা শাখা সভাপতি নিযুক্ত করেন কেন্দ্রীয় সভাপতি, অবশ্য তিনি কার্যকরী পরিষদের সাথে পরামর্শ করে মনোনয়ন দেন। দায়িত্বশীলগণ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রত্যেক শাখায় বায়তুল মাল ধার্য থাকে। বায়তুল মালের আয়ের উৎস কর্মীদের এয়ানত, শুভাকাংখীদের দান, প্রকাশনীর মুনাফা, দায়িত্বশীলগণ সফরের মাধ্যমে কাজের তদারকি করেন, পরিকল্পনার মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার পর অধ:স্তন সংগঠন ঊর্ধ্বতন সংগঠনে রিপোর্ট প্রেরণ করে।

সারা দেশের সকল গ্রামে শিবির এক পরিচিত নাম। গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিবিরের মজবুত সংগঠন রয়েছে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রামেগঞ্জে, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সংগঠন সম্প্রসারণে পরিকল্পিত কাজ করা হয়।

প্রশিক্ষণ : এই সংগঠনের অধীনে সংঘবদ্ধ ছাত্রদেরকে ইসলামী জ্ঞান প্রদান, এবং আদর্শ চরিত্রবান রূপে গড়ে তুলে জাহেলিয়াতের সমস্ত চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার যোগ্যতা সম্পন্ন কর্মী হিসেবে গড়ার কার্যকরী ব্যবস্থা করা।

একজন ছাত্রকে সংঘবদ্ধ করার পর তাদেরকে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা ও জাহেলিয়াতের তুলনামূলক জ্ঞানার্জনে সাহায্য করা ঈমানী দায়িত্ব। তাদেরকে এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে তারা জাহেলিয়াতের সমস্ত চ্যালেঞ্জ সাহসিকতা ও যুক্তি প্রয়োগে মোকাবিলা করতে পারে, এমন প্রশিক্ষণ দেয়া হয় যাতে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে বুঝতে ও পেশ করতে পারে এবং অনুপম চারিত্রিক মাধুর্যের অধিকারী হতে পারে। এ ছাড়াও শরীর চর্চা, খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনমূলক প্রোগ্রামের আয়োজন করে ছাত্রদের দৈহিক ও মানসিক বিকাশ ঘটানোর চেষ্টা করা হয়। এ লক্ষ্যে শিবির নিুের কাজসমূহ করে।

ক. পাঠাগার প্রতিষ্ঠা : শিবির জ্ঞানের রাজ্যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চায় এ কারণে যেখানেই সংগঠন আছে সেখানেই পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
খ. ইসলামী সাহিত্য পাঠ ও বিতরণ : ইসলামী জীবন ব্যবস্থার বিভিন্ন দিকের ওপর বই পড়তে হয়, কেননা জ্ঞানই মানুষের চিন্তার পরিশুদ্ধি আনে, ‘‘যিনি যত বই পড়েন ও অন্যদেরকে বিতরণ করেন” তিনি আদর্শ ততো বেশি বুঝতে ও প্রচার করতে পারেন।
গ. পাঠচক্র, আলোচনা ও সামষ্টিক পাঠ : কোনো বই বা বিষয় নিয়ে কয়েকজন মিলে গভীরভাবে বুঝবার
চেষ্টা করা এবং পরস্পর চিন্তার বিনিময় করা হয়।
ঘ. শিক্ষা শিবির ও শিক্ষা বৈঠক করার মাধ্যমে জনশক্তির চরিত্র ও স্বভাব সংশোধন, ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি ও
ইসলামী জ্ঞানার্জনের প্রতি তাগিদ করা হয়। শিক্ষা শিবির বিভিন্ন ধরনের হয়।

১. দায়িত্বশীল শিক্ষা শিবির ৫ থেকে ১০ দিনব্যাপী
২. দক্ষতা উন্নয়ন শিক্ষা শিবির ৭ থেকে ১৫ দিনব্যাপী সাধারণ শিক্ষা শিবির ৩ দিন
৩. স্কুলকর্মী শিক্ষা শিবির ৩ দিন
৪. সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের শিক্ষা শিবির।
ঙ. স্পীকারস ফোরাম : বক্তা তৈরির উদ্দেশ্যে গঠিত হয় স্পীকারস ফোরাম। এ কর্মসূচীর মাধ্যমে কর্মীদের মধ্যে বক্তৃতা শিক্ষা সম্পর্কে জ্ঞান জন্মে।
চ. লেখক শিবির : সাহিত্যমোদী ছাত্রদেরকে নিয়ে লেখক শিবির করা হয়। স্বরচিত কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প ইত্যাদির আসর জমানো এ শিবিরের কাজ।
ছ. শববেদারী বা নৈশ ইবাদত : কর্মীদের মধ্যে খোদাভীতির সৃষ্টি এবং তার উৎকর্ষ সাধনের জন্য শববেদারীর ব্যবস্থা রয়েছে। এ প্রোগ্রাম সাধারণত এশার নামাজের পর থেকে শুরু হয়।
জ. সামষ্টিক ভোজন : সাধারণত: কর্মীদের মাঝে পারস্পরিক সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর করার জন্য সামষ্টিক খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
ঝ. ব্যক্তিগত রিপোর্ট সংরক্ষণ : এর মাধ্যমে কুরআন, হাদিস, ইসলামী সহিত্য ও পাঠ্যপুস্তক অধ্যয়নের হিসাব স্পষ্ট থাকে।
ঞ. নফল ইবাদত ও দোয়া : নফল ইবাদতের ভিতর তাহাজ্জুদের গুরুত্ব সর্বাধিক। রাত জেগে নফল ইবাদত ও তাহাজ্জুদ আদায়ে উদ্বুদ্ধ করা হয়।
ট. এহতেসাব বা গঠনমূলক সমালোচনা : ইসলামী আন্দোলনের এক কর্মী অপর কর্মীর আয়না স্বরূপ। তাই প্রত্যেক কর্মী অপর কর্মীর ত্র“টি বিচ্যূতি সংশোধনের চেষ্টা করে।
ঠ. আত্মসমালোচানা : একজন কর্মীর জীবনকে গতিশীল রাখার জন্য আত্মসমালোচনা বা আত্ম বিশ্লেষণ অপরিহার্য।
ড. কুরআন তালিম। কুরআন ক্লাস কুরআন শেখা সহীহ করার জন্য এ কর্মসূচী উপযোগী।

ইসলামী শিক্ষা আন্দোলন এবং ছাত্র সমস্যা : আদর্শনাগরিক তৈরির উদ্দেশ্য ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধনের দাবীতে সংগ্রাম এবং ছাত্র সমাজের প্রকৃত সমস্যা সমাধানের সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদান।

মূলতঃ মুসলমানদের উপর কর্তব্য হলো নিজেরা উপার্জন করা এবং সমাজের সকল পর্যায়ে এ জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়া। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। মুসলিম জাতি হিসেবে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মুসলমান বানানোর শিক্ষা নেই। এখানে রয়েছে বিজাতীয় শিক্ষা তা-ও আবার অনুৎপাদনশীল। ইসলামী ছাত্রশিবির দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন ছাড়া জাতির জন্য কাংখিত সুনাগরিক তৈরি সম্ভব নয়। তাই ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনে আপোষহীন ভূমিকা পালন করে আসছে। শহীদ আবদুল মালেক ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ। আজও শিবির শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য পোস্টারিং, পত্রিকায় বিবৃতি, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করছে।

ছাত্র সমস্যা সমাধানে শিবির নিুের কাজ করছে :
ক. লেন্ডিং লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা- গরীব ছাত্রদেরকে বিনা মূল্যে পাঠ্যবই সরবরাহ করার জন্য লেন্ডিং লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করা হয়।
খ. কোচিং ক্লাস- কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সুবিধাজনক স্থানে পরীক্ষার পূর্বে ছাত্রদের জন্য কোচিং এর ব্যবস্থা করা হয়, ইসলামী আন্দোলনের কোনো শিক্ষক/ মেধাবী কর্মীরা এতে শিক্ষকতা করেন।
গ. ভর্তি সহায়িকা প্রকাশ-বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তিচ্ছুদের সহযোগিতার উদ্দেশ্যে প্রকাশ হয়।
ঘ. প্রশ্নপত্র বিলি- বিগত বছরের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র যোগাড় করে বিলির ব্যবস্থা।
ঙ. স্টাইপেন্ড- যাকাতের টাকা সংগ্রহ করে এবং বিভিন্ন শিক্ষানুরাগী ধনী ব্যবসায়ীদের সাথে যোগাযোগ করে গরীব মেধাবী ছাত্রদের জন্য ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়।
এছাড়াও সমষ্টিগত সমস্যা সমাধান যেমন ভর্তি, আসন সমস্যা, শিক্ষকের অভাব, পাঠাগারের অভাব, শিক্ষা উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা প্রভৃতির জন্য শিবির সমস্যার কারণ নির্ণয় করে নিন্দা প্রস্তাব পেশ করে বা বিবৃতি দিয়ে দাবী পেশ করে। এর পরেও দাবী পূরণ না হলে গণতান্ত্রিক কর্মসূচী দেয়।

মানবতার মুক্তির জন্য সংগ্রাম
নবী রাসূলগণ প্রতি যুগেই অসহায় নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলন করেছেন। কারণ, মানুষের রচিত আদর্শ হলো শোষণ ও বঞ্চনার নিকৃষ্টতম হাতিয়ার। এ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় ইসলামী বিপ্লব। মহানবী (সা) এ উদ্দেশ্যেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। সূরা তওবার ৩৩ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে “তিনিই আপন রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, যাতে করে তিনি সমগ্র বাতিল দ্বীন বা মতাদর্শের উপর দ্বীনে হককে বিজয়ী করে তুলতে পারেন”। খোদার দ্বীন পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে অসহায় মানবতা মুক্তি পাবে না। এরশাদ হচ্ছে : তোমাদের কি হয়েছে? তোমরা কেন আল্লাহর পথে সংগ্রাম করছ না। অথচ অসহায় দুর্বল নির্যাতিত নারী পুরুষ এবং শিশুগণ চীৎকার করে বলছে : হে আমাদের রব, জালিম অধিবাসীদের এদেশ থেকে বের করে নাও। আর আমাদের জন্য তোমার নিকট হতে সাহায্যকারী বন্ধু পাঠাও, অধিপতি নিয়োগ কর।” (নিসা-৭৫) কুরআনের এ নির্দেশ ব্যস্তবায়নের জন্য শিবির অর্থনৈতিক শোষণ রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং সাংস্কৃতিক গোলামী হতে মানবতার মুক্তির জন্য ইসলামী বিপ্লব সাধনের সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। এ কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য শিবির যেসব কাজ করছে-

ক. ক্যারিয়ার সৃষ্টি : ইসলামী বিপ্লব শুধু শ্লোগানে সম্ভব না, এ জন্য Career সম্পন্ন কর্মী বাহিনী প্রয়োজন Career design Centre (C.D.C) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে শিবির লোক তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে :
খ. নেতৃত্ব সৃষ্টি : সঠিক নেতৃত্ব না হলে কোনো কর্মসূচীই বাস্তবায়িত হয় না। এজন্য বিভিন্ন সেক্টরে নেতৃত্ব দানের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা কাজ হচ্ছে।
গ. সুশৃংখল : কর্মীবাহিনী গঠন।
ঘ. জ্ঞান অর্জন : রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ বেশি অংশগ্রহণের চেয়ে ঐ সংক্রান্ত জ্ঞান অর্জন করাকেই প্রাধান্য দেয়া হয়।
শিবির নগ্নতা অশ্লীলতার বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি শিশু ও সাহিত্যে সম্পর্কে আন্দোলন জোরদার করার চেষ্টা করছে, জনশক্তিকে ভাষা শিক্ষা ও টেকনিক্যাল জ্ঞান অর্জনে উদ্বুদ্ধকরছে।

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি : শিবির এক স্বতন্ত্র ধারা
বাংলাদেশে যেসব ছাত্র সংগঠন রয়েছে তা মূলতঃ তিনতি ভাগে বিভক্ত করা যায়
১. ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী ছাত্র সংগঠন : বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিশ, বাংলাদেশ ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন প্রভৃতি।
২. জাতয়িতাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী : জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, গণতান্ত্রিক জাতীয় ছাত্রদল।
৩. বাঙ্গলী জাতীয়তাবাদ ও বাম আদর্শে বিশ্বাসী ঃ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট প্রভৃতি।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ মূলত বৃটিশ আমলের নিখিলবঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগেরই অংশ। ৪৭ সালের ১৪ আগস্টের পর পর নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নামে কাজ শুরু করে। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনে ছাত্রলীগ নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হলে বিদ্রোহী অংশ শামসুল হুদা চৌধুরী ও শাহ আজিজুর রহমানকে বাদ দিয়ে রাজশাহীর নাঈমুদ্দিনকে আহ্বায়ক করে ছাত্রলীগ গঠন করে। সে থেকে ছাত্রলীগ শাহ আজিজ গ্র“প ও নাঈমুদ্দীন গ্র“প নামে প্রথম ভাঙ্গন দেখা দেয়। এর পর নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়। বিভিন্ন সময় ভাঙনের পর বর্তমান পর্যায় আসে। ছাত্রলীগ এ দেশে ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদী আন্দোলন করছে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করলেও মূলতঃ ১৯৭৮ সালের ২৬ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসিতে, শিক্ষকগণের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিতে গেলে বিক্ষোভের সম্মুখীন হন, তারপর ছাত্রলীগের একটি অংশসহ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছাত্রদের নিয়ে একাধিকবার মিটিং করে ১৯৭৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ১০১ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটির চূড়ান্তের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে।

ছাত্রদল ও ছাত্রলীগসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠন নেতৃবৃন্দ ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের মধ্যে অনেক সময় দলীয় স্বার্থ ত্যাগ করতে কুণ্ঠাবোধ করে না, তাদের আভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে একাধিকবার দলীয় প্রধান কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। কর্মীদের হাতে নেতা লাঞ্চিতের ঘটনা ঘটেছে। মেধা নয় অস্ত্র ও পেশী শক্তি বলে এবং আঞ্চলিকতার কারণে বা বড় নেতাদের আশীর্বাদ নেতা হওয়া যায়। কর্মীদের রাজনৈতিক দলের কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহার করা হয়। সন্ত্রাসের মাধ্যমে শিক্ষাঙ্গন দখলের জন্য মাস্তান লালন করা হয়। ক্ষমতাই হচ্ছে রাজনীতির টার্গেট। ইসলামী ছাত্রশিবির ছাত্র রাজনীতিতে এক স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেছে। শিবিরে কোনো ধরনের Grouping নেই। তাকওয়া ও যোগ্যতাই হচ্ছে দায়িত্ব প্রাপ্তির মানদন্ড, আঞ্চলিকতার কোনো ধরনের ঠাঁই নেই। নেতৃত্বে নির্বাচন কেন্দ্রীক আভ্যন্তরীণ কোন্দল বা দলাদলি নেই। শিবির কোনো দলের লেজুড়বৃত্তি করে না। কর্মীদের জ্ঞান, যোগ্যতা ও চরিত্র সংশোধনমূলক কর্মসূচী পালনকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আদর্শ প্রচারের জন্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কাজ করছে। শত উসকানী অপপ্রচার ও বাধার মোকাবিলায় সহনশীলতা সাহসিকতা ও প্রজ্ঞার সাথে ইলাল্লাহর দায়িত্ব পালন করছে।

এক নজরে ১৯৭৭-১৯৯৮ বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে শিবির : ১৯৭৮ সাল: ১৯৭৮ সালের ৬ ফেব্র“য়ারি প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী সম্মেলন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মূর্তি তৈরির বিরুদ্ধে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে। এ সময় কয়েকজন নেতা ও কর্মীকে আটক করে। ১৯৭৮ সালের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রাম হাজী মহসীন কলেজের শিবির নেতা অজিজুল হকের উপর হামলা করে, ফলে তার এক পা কেটে ফেলতে হয়। এ সেশনে ইসলামী শিক্ষা সেমিনার করা হয়।
১৯৭৯ সাল : ঢাকার হোটেল ইডেন চত্বরে কেন্দ্রীয় সাথী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৮০ সাল : ৮০ সালের ২২-২৯ মার্চ ঢাকায় ইসলামী শিক্ষাবিদদের নিয়ে আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন করা হয়। ৮০ সালের জুলাই মাসে সরকার ভারতে গ্যাস রফতানীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে ৩১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বট তলা থেকে বিরাট বিক্ষোভ মিছিল বের করে। ১৮ আগস্ট মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষার দাবীতে মিছিল বের করে। শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ হামলা চালায়। এ বছর ৮টি জেলার বন্যা দুর্গত লাখো মানুষের সহায়তায় শিবির অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মানবতার দুশমন ইসরাইল জেরুজালেমকে তাদের অবৈধ রাজধানী ঘোষণা করলে ৮ সেপ্টেম্বর নিন্দা বিবৃতি প্রদান করে। এবং তুরস্কের সামরিক জান্তা ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ব্যাপক নির্যাতন চালালে OIC র সেক্রেটারি জেনারেলের নিকট তারবার্তা প্রেরণ করা হয়। একই সালে কাবা শরীফে হামলার প্রতিবাদে মুসলিম রাষ্ট্র প্রধানদের নিকট তারবার্তা পাঠানো হয়।
১৯৮১ : ১৯৮১ সালের ১৫ ও ১৬ জানুয়ারি ঢাকার রমনা গ্রীনে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় কর্মী সম্মেলন, প্রধান অতিথি ছিলেন বিচারপতি মুনএম। এ উপলক্ষ্যে প্রকাশিত স্মারকে কবি শামসুর রাহমান, সুফিয়া কামাল, শাহজাহান সিরাজ প্রমুখ শুভেচ্ছাবাণী প্রদান করেন, ৮১ সালে শিবিরের অন্যতম অগ্রযাত্রা চাকসু বিজয়।

১৯৮২ : ৮১ সালের ২১ জানুয়ারি ডাকসু নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত বিশাল মিছিলে বোমা হামলা করলে সাইফুল্লাহ ও তফাজ্জলের পা উড়ে যায়। একই বছরের ১১ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাগত সম্বর্ধনায় হামলা চালালে শাব্বির আইয়ুব, জাব্বার শহীদ হন।
১৯৮৩ : ঢাকা বিশ্ববদ্যালয় বটতলায় আয়োজিত প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী সম্মেলনে হামলা চালানো হয়। এতে সেক্রেটারি জেনারেলসহ অনেকেই আহত হন।
১৯৮৪ : স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা পালন করে।
১৯৮৫ : ভারতের আদালতে কুরআন বাজেয়াপ্ত করার মামলা করলে দেশব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করে। ১১ মে চাঁপাই নবাবগঞ্জে আহ্বান করা হয় ছাত্র গণজমায়েত। এতে ৮ জন শাহাদাত বরণ করেন।
১৯৮৬ : কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ছাত্র সমাজ হামলা চালায়।
১৯৮৭ : ৮৭ সালের ২৯ ও ৩০ মার্চ ঢাকার শেরে বাংলা নগরে কেন্দ্রীয় সাথী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। রংপুর কারমাইকেল কলেজে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়। ৬ নভেম্বর IFSO-র প্রোগ্রামে কুমিল্লায় আজও বিদেশী অতিথিদের সংবর্ধনা দেয়া হয়। কিন্তু নেতৃবৃন্দ ভারত, পাকিস্তান ও মালয়েশিয়া সফর করেন।
১৯৮৮ : ১৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির নেতা আইনুল হককে গুম করে। ১২ ফেব্র“য়ারি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা বার্ষির্কীতে হামলা চালানো হয়। অস্ত্রের রাজনীতি থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য ১৫ ফেব্র“য়ারি সন্ত্রাস বিরোধী দিবস পালন করা হয়। ৩ মার্চ ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেবেশের আয়োজন করে।
১৯৮৯ : শিবিরকে কথিত নিষিদ্ধ ঘোষণা খবর সরকারি ষড়যন্ত্র আখ্যায়িত করে নিন্দা প্রস্তাব পেশ করা হয়। ২ জুন ছাত্র রাজনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে ছাত্র সমস্যার সমাধান এবং স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনকে গতিশীল করার লক্ষ্যে ৯ দফা দাবীর ভিত্তিতে ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ। ১৮ জুন শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবীতে বিক্ষোভ সমাবেশ, শিবিরের ৩১ জন নেতা ও কর্মীরা খুনীদের বিচার ও দেশব্যাপী সন্ত্রাস বন্ধের দাবীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর নিকট স্মারক লিপি পেশ, ১ নভেম্বর প্রেসিডেন্টের সচিবালায়ে খুনীদের বিচারের দাবীতে স্মারক লিপি দেয়া হয়।
১৯৯০ : স্বৈরাচারের পতনের দুর্বার গণআন্দোলন, ছাত্র সমস্যার সমাধানে ভূমিকা পালন করা হয়। ফিলিস্তীনে ইসরাইলী বর্বরতার নিন্দা জানানো হয়। বিশ্বব্যাপী মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের ঐক্য কামনা করে প্রস্তাব পাশ করা হয়। ১৭ আগস্ট কাশ্মীরে মুসলিম হত্যা বন্ধ করে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ফিরিয়ে দেবার দাবীতে বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর ভারতের তথাকথিত বাংলা বিশ্বকোষ বাতিলের দাবীতে বিক্ষোভ করা হয়। ১২ আগস্ট কুয়েতে বাংলাদেশেসহ সকল প্রবাসী নাগরিকদের জানমালের প্রতি হুমকি বন্ধ এবং অবিলম্বে কুয়েত হতে দখলদার ইরাকী সৈন্যের নিঃশর্ত প্রত্যাহারের দাবী জানিয়ে বিক্ষোভ করা হয়।
১৯৯১ : ১৭ মার্চ চ, বি খোলার দাবীতে সাংবাদিক সম্মেলন করা হয়। ১০ এপ্রিল ৫ সদস্যের এক প্রতিনিধিদল মাননীয় স্পীকারের সাথে সাক্ষাত করে ১২ দফা দাবী সম্বলিত স্মারক লিপি পেশ করে। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চকে “গণতন্ত্র হত্যা বিদস” আখ্যায়িত করে তা পালন করা হয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ষড়যন্ত্রের নিন্দা জানানো হয়। ৪ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ করে ৭ দফা দাবী দেয়া হয়। এ বছর বাল্টিক প্রজাতন্ত্র এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুনিয়ার স্বাধীনতার প্রতি বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃতি প্রদান করায় অভিনন্দন জানানো হয়।
১৯৯২ : ১৫ ও ১৬ ফেব্র“য়ারি উত্তরা রাজউক মাঠে সাথী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ৩ মার্চ রমজানকে স্বাগত জানিয়ে মিছিল করে।
১৯৯৩ : আর মায়ের বুক খালি নয় লেখাপড়া শিখতে দাও, শিক্ষাখাতে ৩০% ব্যয় বরাদ্ধ বই খাতা কলমসহ শিক্ষা উপকরণের দাম কমানোসহ ৯ দফা দাবিতে দেশব্যাপী কর্মসূচি। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের চক্রান্তের প্রতিবাদে ৬ আগস্ট মিছিল করা হয়। ১৭ আগস্ট “সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গন ও ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা শীর্ষক সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা হয়। কাশ্মীরের হযরত বাল মসজিদ অবরোধ ও গণহত্যার প্রতিবাদে ২৯ আগস্ট ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। জামাতে তালাবার সম্মেলনে অংশ গ্রহণের জন্য ২১-২৯ আগস্ট পাকিস্তান সফর। ২৯ এপ্রিল রোহিঙ্গাদের প্রতি সরকারের সহযোগিতার দাবীতে মিছিল করা হয়।
১৯৯৪ : ২৬ ফেব্র“য়ারি হযরত বাল মসজিদে হামলার প্রতিবাদে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল করা হয়, ৭ ফেব্র“য়ারি বসনিয়াতে গণহত্যার বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়ে মিছিল করা হয়।
১৯৯৫ : ১২ মার্চ সরাদেশে সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ছাত্র গণজামায়েত অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৯৬ : জনশক্তির ভাষা শিক্ষা ও টেকনিক্যাল জ্ঞান অর্জনের প্রতি উদ্ধুদ্ধ করাকে বার্ষিক পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কেয়ারটেকার সরকারের দাবীতে দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচী পালিত হয়। কেয়ারটেকার সরকার সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হলে “এ বিজয় জনতার, এ বিজয় গণতন্ত্রের, এ বিজয় কেয়ারটেকার আন্দোলনের” ব্যানার সম্বলিত শোকরানা সবাবেশ ও মিছিল করা হয়।
১৯৯৭ : সংবিধান সংশোধন করা হয়। সহ-সভাপতি পদ রহিত হয়। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ তুরস্ক, সুদান, পাকিন্তান, ভারত, সৌদি আরব সফর করেন। সংগঠনের শিক্ষা বিভাগ এর কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়। গধহ ঢ়ড়বিৎ চষধহহরহম এর উদ্যোগ নেয়া হয়।

বিভিন্ন সময় যাঁরা ধরেছেন তরী
১৯৭৭ : মীর কাসেম আলী বর্তমানে রাবেতা আলমে ইসলামীর ডিরেক্টর।
১৯৭৮-৭৯ : জনাব মুহাম্মদ কামারুজ্জামান বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, বাড়ি শেরপুর জেলার মুদাপাড়া গ্রামে।
১৯৭৯-৮১ : জনাব মুহাম্মদ আবু তাহের বর্তমানে আমীর, জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরী, বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারার উত্তর পাকয়া গ্রামে।
১৯৮১-৮২ : জনাব মুহাম্মদ এনামুল হক মনজু- সাবেক সংসদ সদস্য, বাড়ি কক্সবাজার জেলার চকরিয়ায়।
১৯৮২ : (আংশিক) জনাব আহমদ আব্দুল কাদের বাচ্চু বর্তমানে কলেজের অধ্যাপক, বাড়ি হবিগঞ্জ।
১৯৮২-৮৩ : সাইফুল আলম খান মিলন- জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী অন্যতম নেতা, বাড়ি শরীয়তপুর জেলার সদর থানা।
১৯৮৬-৮৭ জনাব মোঃ তাসনীম আলম, বর্তমানে কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদ সদস্য ও প্রচার বিভাগ সেক্রেটারি, জামায়াতে ইসলামী, রাজশাহী, মহানগরী, বাড়ি নাটোর লালপুর।
১৯৮৫-৮৬ : জনাব ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোঃ তাহের- WAMY র দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সাবেক পরিচালক, বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম।
১৯৮৭-৮৯ : জনাব মুহাম্মদ শামছুল ইসলাম বর্তমান সেক্রেটারি, জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরী। বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া।
১৯৮৯-৯১ : জনাব ডা. আমিনুল ইসলাম মুকুল এফ. আর, সি, এস শেষ পর্বের পরীক্ষার্থী। বাড়ি নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ।
১৯৯১-৯২ : জনাব আবু জাফর মোঃ ওবায়েদুল্লাহ, রেজিস্ট্রার, চট্টগ্রাম বেসরকারী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। ভোলা জেলার চরফ্যাশনে।
১৯৯৩ : জনাব হামিদ হোসাইন আজাদ- লন্ডনে উচ্চ শিক্ষারত। বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার লোহাগড়ায়।
১৯৯৪-৯৫ : জনাব রফিকুল ইসলাম খান- সিনেট সদস্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
১৯৯৬-৯৭ : জনাব মুহাম্মদ শাহজাহান- ব্যবসা করছেন। বাড়ি কক্সবাজার জেলার উখিয়ায়।
১৯৯৮-৯৯ : জনাব মতিউর রহমান আকন্দ- জামায়াতে ইসলামীর রোকন ও উত্তরা থানা থানার একটি ওয়ার্ড সভাপতি। বাড়ি মোমেনশাহী জেলার মুক্তাগাছা।
২০০০ : জনাব এহসানুল মাহবুব জোবায়ের- বর্তমানে সেক্রেটারি, জামায়াতে ইসলামী সিলেট মহানগরী। বাড়ি সিলেট।
২০০০-বর্তমান : জনাব নূরুল ইসলাম বুলবুল। বাড়ি চাঁপাইনব্বগঞ্জ।

সাংগঠনিক কাঠামো প্রসঙ্গে
প্রতিবছর জানুয়ারি মাস থেকে সেশন শুরু হয়। সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। কার্যকরী পরিষদের সাথে পরামর্শ করে সেক্রেটারি জেনারেল মনোনয়ন দেন কেন্দ্রীয় সভাপতি, কার্যকরী পরিষদ ও সেক্রেটারিয়েটের সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় সংগঠন গঠিত হয়। প্রতি ৬৫ জন সদস্যে ১ জন হারে কার্যকরী পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। অবশিষ্ট সংখ্যার জন্য ১ জনসহ যাদের সংখ্যা নির্বাচিত সদস্যদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি হবে না এমন সংখ্যক সদস্যকে কেন্দ্রীয় সভাপতি ইচ্ছে করলে মনোনয়ন দিতে পারবেন এবং প্রাক্তন সদস্যদের মাঝ থেকে অনুর্ধ্ব ২ জনকে মনোনয়ন দিতে পারবেন। সারাদেশে ৯৫ টি শাখা রয়েছে। দুয়ের অধিক সদস্য নিয়ে শাখা গঠিত হয়। সদস্য সংখ্যা ২০, জেলা শাখা ৭৩, কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত ২টিসহ সাথী শাখা সংখ্যা? যে সকল সদস্যের ছাত্র জীবন সমাপ্ত হয় তাদের নিয়ে ভ্রাতৃ শিবির গঠিত হয়। ছাত্রীদের মাঝে “ইসলামী ছাত্রী সংস্থা”। পৃথকভাবে কাজ করে। কিশোরদের সাথে “ফুলকুঁড়ির” তৎপরতা রয়েছে। ছাত্র সংবাদ, কিশোর কণ্ঠ, , Student Views, Juvenile Voice সংগঠনের নিয়মিত প্রকাশনা। প্রকাশনা বিভাগের মাধ্যমে স্টীকার, পোস্টার, কলম, চাবির রিং, চিঠির প্যাড, ইসলামী সাহিত্যসহ অনেক কিছু প্রকাশ করা হয়। সংগঠনের সাথী ও সদস্যরাই সাংবিধানিক জনশক্তি। এ ছাড়াও প্রায় ১ লাখ কর্মী এবং ৬ লাখের মত সমর্থক রয়েছে। সংগঠনের নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্যানভাসের অনুমতি নেই। যে কোনো পর্যায়ের দায়িত্বশীল নির্বাচনকালে ব্যক্তির আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি আনুগত্য, তাকওয়া, আদর্শের সঠিক জ্ঞানের পরিসর, সাংগঠনিক প্রজ্ঞা, শৃংখলা বিধানের যোগ্যতা, মানসিক ভারসাম্য, উদ্ভাবনী ও বিশ্লষণী শক্তি, কর্মের দৃঢ়তা অনড় মনোবল, আমানতদারী এবং পদের প্রতি লোভহীনতার প্রতি নজর রাখা হয়। সংগঠন পরিচালনার জন্য সংবিধান রয়েছে। এতে মোট ৫০টি ধারা রয়েছে।

জাতির প্রত্যাশা পূরণে ছাত্রশিবির
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এ দেশের সবচেয়ে সুশৃঙ্খল সংগঠন : প্রতিষ্ঠার পর অতি অল্পসময়ের মধ্যে ছাত্রসমাজের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিতে সক্ষম হয়। দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একক প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনে রূপান্তরিত হয়। দেশের হত্যশাগ্রস্ত ছাত্রজনতার মাঝে আশার সঞ্চার হয়। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অভিভাবকমহল শিবিরকে মনে করে চরিত্র গঠনের অনন্য কারখানা। যে সময় অন্যান্য মতাদর্শী ছাত্ররা সিনেমা হলে ঢুকে সে সময় শিবির কর্মীরা মুয়জ্জিনের কণ্ঠে আজানের ধ্বনি শুনে মসজিদে যায়। তাই অনেক অভিভাবক নিজেদের সন্তানদের চরিত্র গঠনের জন্য শিবিরের দায়িত্বশীলদের হাতে তুলে দেয়।
খ. শিবির হতাশাগ্রস্ত ছাত্র জনতার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত : মদ, গাজা, হেরোইনে আসক্ত একজন ছেলে শিবিরের সংস্পর্শে এসে মাদকাসক্তি ছেড়ে দিয়ে কুরআন, হাদিস, ইসলামী সাহিত্য অধ্যায়নের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
গ. শিবির বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান : প্রতিষ্ঠানে আমদের অনেক নিয়ম কানুন মেনে চলতে হয়, সময়ের প্রতি সচেতন থাকতে হয়। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবার পর অনেক কিছু শিখতে পারি। তেমনি শিবিরের যোগদানের পর প্রতিদিনই নতুন নতুন কিছু শেখার অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। এমনকি আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেসব বিষয় শেখার সুযোগ নেই। শিবির কর্মীদের সেসব বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

ঘ) শিবির জাতির বিশ্বস্ত এক প্রতিষ্ঠান : অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের অনেকেই চাঁদাবাজীতে অভ্যস্ত। টাকা আত্মসাতের অসংখ্য ঘটনা ঘটে। কিন্তু শিবিরকর্মীদের আমানতদারীতার স্বীকৃতি সর্বত্রই, তাই দেখা গেছে এবারের বন্যার সময় অনেকেই আদর্শিকভাবে শিবির বিরোধী হলেও বন্যাদুর্গতদের সাহায্যে শিবির কর্মীদের টাকা দিয়েছেন, কারণ তাদের দৃঢ় বিশ্বাস শিবিরকর্মীরা যথাযথ স্থানে পৌঁছাবে।
ঙ. আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত এক কাফেলা : এবারের বন্যা, ৯১, ৮৮, ৮৫সহ অতীতের বিভিন্ন দুর্যোগে শিবির আর্তমানবতার পাশে দাঁড়িয়ে মানুষের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করেছে।

চ. বিশ্ব মুসলিমের হৃদয় স্পন্দন : বসনিয়া, চেচনিয়া, কাশ্মীর, আলজেরিয়া, রোহিঙ্গা, ফিলিস্তিনী, তুরস্ক, মিসর, আফগানিস্তান, সুদান, পৃথিবীর যে প্রান্তেই মুসলমানদের রক্ত ঝরেছে, আধিপত্যবাদী শক্তি নগ্ন ধাবা বিস্তার করেছে, প্রতিবাদী শিবির রাজপথে নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। দেশব্যাপী কর্মসূচি পালন করেছে।
ছ. অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে আপোষহীন : আতীতে বিভিন্ন সময় সরকার ও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন ভূমিকা পালন করেছে।
জ. স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী: যখনি ভারত কর্তৃক আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে হুমকি স্বরূপ কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ফারাক্কা, দহগ্রাম, আঙ্গরপোতা, তালপট্রিসহ আমাদের জাতীয় স্বার্থে আঘাত হেনেছে। শিবির “জীবনের বিনিময়ে হলেও দেশের স্বাধীনতা রক্ষার শপথ নিয়ে” গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ঝ. অপসংস্কৃতির মোকাবিলায় : আদর্শিক সংস্কৃতি চর্চায় শিবিরের অবদান অনস্বীকার্য। সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী, পাঞ্জেরী, প্রত্যয়, টাইফুন, উচ্চারণ শিল্পীগোষ্ঠী, রেনেসাঁ, দুর্নিবার, কল্লোল, বিপরীত উচ্চারণ, প্রবাহ, অঙ্গীকার, প্রতীতি, ব্যতিক্রমসহ দেশজুড়ে সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুলে সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। অডিও ভিডিও ক্যাসেট প্রকাশ করে আদর্শিক সংস্কৃতির ধারা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট রয়েছে।

ঞ. ছাত্রদের নানামুখী সমস্যা সমাধানে শিবির বিশ্বস্ত বন্ধুর ভূমিকা পালন করছে। শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান, মেধাবী গরীব ছাত্রদের বৃত্তি প্রদানসহ নানামুখী ছাত্র কল্যাণমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ট. ত্যাগ কুরবাণী ও শাহাদাতের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে : আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য সবকিছু উজাড় করতে শিবিরকর্মীরা প্রস্তুত। এ যাবৎ ১১৮ জন নেতা ও কর্মীরা শাহাদাত, অসংখ্য তরুণের পঙ্গু ও কারাবরণ তারই প্রমাণ।

প্রকৃতপক্ষে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় একটি স্বাধীন দেশের উপযোগী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচীর অনুপস্থিতে দেশে আজ অতিরিক্ত রাজনীতি প্রভাবিত লেজুড়বৃত্তির যে ছাত্র আন্দোলন চলছে তা কারও পছন্দ নয়। অস্ত্রে ও অর্থের যোগান দিয়ে ছাত্রদের ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানে হত্যাকান্ড চলে তার কোনো বিচার হয় না। কোনো আদর্শিক মটিভেশন বা চরিত্রগঠনমূলক কর্মসূচী অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেই। ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিদ্বন্দ্বী সকল ছাত্র সংগঠনের সম্মিলিত শক্তির সাথে এককভাবে মুকাবিলা করে সবচাইতে বৃহৎ ছাত্র সংগঠনে পরিণত হয়েছে। ইসলামী ছাত্রশিবির একদল সুশৃংখল কর্মীবাহিনী গড়ে তুলেছে যারা ইসলামী আদর্শের বিজয়ের জন্য জীবনের সব কিছু বিলিয়ে দিতেও প্রস্তুত, অল্প সময়ে শিবিরের এই অগ্রগতির পিছনে যে জিনিসটি কাজ করছে তা হলো এই সংগঠনের (১) আদর্শ ইসলাম (২) বৈজ্ঞানিক কর্মসূচী (৩) শিবির কর্মীদের অনুপম চরিত্র।

আজ আমাদের দেশে সম্পদের অভাব নেই। অভাব সৎ চরিত্রবান যোগ্য নাগরিকের। ইসলামী ছাত্রশিবির একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ইসলামের বিজয় নিশান উড্ডীন করার জন্য জনশক্তির যোগ্যতা বৃদ্ধি ও চারিত্রিক উৎকর্ষতা সাধনে সদা প্রচেষ্টায় নিয়োজিত। এ দেশের আশাহত মানুষের আশা আকাক্সক্ষার প্রতীক বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। সকল প্রকার অপপ্রচার ও বাধার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে, মানুষের সত্যিকার কল্যাণ ও মুক্তির জন্য ইসলামী ছাত্রশিবির ইসলামী বিপ্লবের যে আওয়াজ তুলেছে, সেই বিপ্লবের সফলতার ওপর নির্ভর করছে জাতির ভবিষ্যত। বিশ্বব্যাপী ইসলামী পুনর্জাগরণের যে ঢেউ সূচিত হয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির সেই পূনর্জাগরণ আন্দোলনে উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।

বিপন্ন বিশ্বের নির্যাতিত মানবতার মুক্তির জন্য বুকভরা আশা নিয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। শিবিরই তাদের আশা আকাংখার প্রতীক।

এই প্রবন্ধটি ২০০২ সালে প্রকাশিত "প্রেরণার মিছিল" হতে সংগৃহীত 

সংশ্লিষ্ট