ড. হাবিবুর রহমান

فَلْيُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يَشْرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا بِالْآخِرَةِ وَمَنْ يُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيُقْتَلْ أَوْ يَغْلِبْ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا (74) وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَلْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا وَاجْعَلْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ نَصِيرًا (75) الَّذِينَ آمَنُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا (76)

৭৪. পরকালের বিনিময়ে যেসব লোক দুনিয়ার জীবনকে বিক্রি করে দিয়েছে তাদের উচিত আল্লাহর পথে লড়াই করা। কারণ যে আল্লাহর পথে লড়াই করবে এবং জীবন বিলিয়ে দেবে (মারা যাবে) অথবা বিজয়ী হবে তাকে অচিরেই আমি বিরাট পুরস্কার দেবো। ৭৫. তোমাদের কী হয়েছে যে তোমরা আল্লাহর পথে অসহায় নর-নারী ও শিশুদের জন্য লড়বে না যারা দুর্বলতার কারণে নির্যাতিত হচ্ছে এবং ফরিয়াদ করছে, হে আমাদের রব! আমাদেরকে এই জালিমের জনপদ থেকে বের করে নাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাঠিয়ে দাও। ৭৬. যারা ঈমানের পথ অবলম্বন করেছে তারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে আর যারা কুফরির পথ অবলম্বন করে তারা তাগুতের পথে লড়াই করে কাজেই তোমরা শয়তানের চেলা-চামুণ্ডাদের সাথে লড়াই কর। নিশ্চয় শয়তানের কৌশল খুবই দুর্বল।

সূরার নামকরণ : এ সূরার প্রথম আয়াতে বর্ণিত

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً

এর মধ্যকার النِّسَاءٌ শব্দ থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে।
অথবা এই সূরার মধ্যে আল্লাহ তাআলা সমাজে নারী-পুরুষের সম্পর্কের সীমা, নারীদের উত্তরাধিকার (মিরাস) বণ্টনের নিয়ম-কানুনসহ নারীসমাজের অনেক খুঁটিনাটি বিষয় বর্ণনা করেছেন যার কারণে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে ‘সূরা নিসা’।

নাজিলের সময়কাল ও ঐতিহাসিক পটভূমি
সম্ভবত তৃতীয় হিজরির শেষ দিক থেকে শুরু করে চতুর্থ হিজরির শেষ দিকে বা পঞ্চম হিজরির প্রথম দিকের সময়কালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অংশে নাজিল হয়। নবী (সা:) এর সামনে সে সময় যেসব কাজ ছিল তা তিনটি বড় বড় ভাগে ভাগ করা যায়।
১. সবে গঠিত ইসলামী সমাজ সংগঠনের বিকাশ সাধন। জাহেলিয়াতের পুরাতন পদ্ধতির নির্মূল ঘটিয়ে নৈতিকতা, তমদ্দুন, সমাজরীতি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন নীতি-নিয়মের প্রচলনের তৎপরতা এগিয়ে চলছিল।
২. আরবের মুশরিক, ইহুদি ও মুনাফিকদের সম্মিলিত সংস্কার বিরোধী শক্তির সাথে ইসলামের যে ঘোরতর সংঘাত চলে আসছিল তা জারি রাখা।
৩. এ বিরোধী শক্তিগুলোর সকল বাধা উপেক্ষা করে ইসলামের দাওয়াতকে এগিয়ে নিয়ে এবং ইসলামকে বিজয়ীর আসনে অধিষ্ঠিত করা। এ সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে যতগুলো ভাষণ অবতীর্ণ হয়, তা সবই এই তিনটি বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত

সূরার আলোচ্য বিষয়
১. পরিবার গঠনের নীতিমালা,
২. সমাজে নারী ও পুরুষের সম্পর্কের সীমা নির্দেশ,
৩. ঘরোয়া বিবাদ মিটানোর পদ্ধতি,
৪. এতিমের অধিকার নির্দিষ্ট করা,
৫. মিরাস (উত্তরাধিকার) বণ্টনের নিয়ম-কানুন,
৬. অর্থনৈতিক লেনদেন পরিশুদ্ধির নিয়ম-কানুন (জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি ও সুদমুক্ত ব্যবসা)
৭. অপরাধ ও দ্বন্ডবিধি,
৮. তাহারাত ও পাক-পবিত্রতার বিধিবিধান,
৯. মদ্য পানের ওপর বিধি নিষেধ,
১০. মুসলমানদের বিরোধী শক্তির মোকাবেলায় উদ্বুদ্ধকরণ,
১১. ঈমান ও নিফাকের পার্থক্য ও মুনাফিকদের কর্মনীতির সমালোচনা,
১২. মুসলমানদের উন্নত নৈতিক চরিত্রের শিক্ষা দান,
১৩. ইহুদি-খ্রিষ্টান ও মুশরিকদের ভ্রান্ত ধর্মীয় ধারণা-বিশ্বাস, নৈতিক চরিত্র, নীতি ও কর্মকান্ডের সমালোচনা করে সত্য দ্বীন ইসলামের দাওয়াত পেশ করাই মূলত এই সূরার আলোচ্য বিষয়।

নির্বাচিত আয়াতসমূহের মূল কথা
# আল-কুরআন ঈমানদারদেরকে অলসতামুক্ত করে মর্যাদাসম্পন্ন ও ঊর্র্ধ্ব তুলে ধরার উদ্যোগ নেয়। অন্তত যারা অলসতামুক্ত হয়ে মর্যাদাসম্পন্ন হতে চায়।
# তাদের অনুভূতিতে উত্তম ও চিরস্থায়ী আখেরাতের কল্যাণ লাভের বাসনা জাগায়। অন্তত যারা কল্যাণ চায়।
# দুনিয়া বিক্রি করে আখেরাত খরিদ করে নেয়ার প্রেরণা জোগায়। অন্তত যারা দুনিয়া বিক্রি করতে রাজি হয়।
# জান-মালের বিনিময়ে জান্নাতের ওয়াদা করে বাতিলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করে। অন্তত যারা জান্নাত পেতে চায়।

আয়াত-৭৪

فَلْيُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يَشْرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا بِالْآخِرَةِ وَمَنْ يُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيُقْتَلْ أَوْ يَغْلِبْ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا

“পরকালের বিনিময়ে যেসব লোক দুনিয়ার জীবনকে বিক্রি করে দিয়েছে তাদের (সেসব সৌভাগ্যবানের) উচিত আল্লাহর পথে লড়াই সংগ্রাম করা। কারণ, যে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করবে/লড়বে এবং জীবন বিলিয়ে দেবে (মারা যাবে) অথবা বিজয়ী হবে তাকে অচিরেই আমি বিরাট পুরস্কার দেব।”
ব্যাখ্যা : পবিত্র কুরআনের এ আয়াতে আল্লাহর পথে লড়াই করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ লড়াইয়ের নির্দেশ দেয়ার কারণ এই যে, ইসলামে আল্লাহর পথে ছাড়া অন্য কোনো রকমের যুদ্ধ বা লড়াইয়ের অনুমতি নেই।
# সম্পদ লাভের জন্য।
# আধিপত্য ও সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য।
# ব্যক্তিগত ও জাতিগত গৌরবের জন্য যে লড়াই করা হয় ইসলাম বা আল-কুরআন তার অনুমোদন দেয় না।
ইসলাম শুধুমাত্র আল্লাহর পথে তথা জমিনের বুকে আল্লাহর কালিমা সর্বোচ্চে তুলে ধরা এবং আল্লাহর বিধানকে গোটা জীবনের ওপর কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা, মানবসমাজে আল্লাহর বিধানের মাধ্যমে সুবিচার ও ইন্সাফ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধের/লড়াইয়ের অনুমতি দেয়। এ লড়াইয়ে নিহত হলে শহীদের মর্যাদা লাভ এবং বিজয়ী হলে গাজি।

জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ কী?
কোন নির্দিষ্ট জাতি-গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের জন্যই নয়। বরং আল্লাহ তাআলা সময় এবং পরিবেশের দাবিতে প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর জিহাদ ফরজ বা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। আল্লাহ পাক বলেছেন, كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَكُمْ

অর্থ: জিহাদ বা কিতাল তোমাদের ওপর ফরজ করা হয়েছে অথচ তা তোমাদের কাছে অসহ্য মনে হতে পারে। (সূরা আল বাকারা : ২১৬)
অন্যত্র আল্লাহ বলেন,

انْفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالًا وَجَاهِدُوا بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ

অর্থ: তোমরা বের হয়ে পড় হালকা অথবা ভারী সরঞ্জামের সাথে, আর জিহাদ কর আল্লাহর পথে নিজেদের মাল-সামানা ও জান-প্রাণ দিয়ে, এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা বুঝ। (সূরা আত-তাওবা : ৪১)
এই জিহাদ বা কিতাল আল্লাহ চালিয়ে যেতে বলেছেন ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না মানবরচিত সকল বাতিল ব্যবস্থা সম্পূর্ণ মূলোৎপাটন হয়ে আল্লাহর দেয়া আইন ও বিধান দ্বারা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। আল্লাহর নির্দেশ-

وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ

অর্থ: তোমরা কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই কর ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না পৃথিবী থেকে সকল প্রকার ফিতনা খতম হয়ে যায় এবং দ্বীন পুরোপুরি আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। (সূরা আনফাল : ৩৯)
আল্লাহর পক্ষ থেকে এ রকম অকাট্য দলিল প্রমাণ আসার পরও আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে যারা নিজেদেরকে খাঁটি মুসলমান বলে দাবি করে অথচ আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইন-কানুন, বিধানাবলি কায়েমের সংগ্রামে ময়দানে যেতে রাজি হয় না। বরং যারা যায় তাদেরকে এই মহা কল্যাণকর মুক্তির পথ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে, উপদেশ দেয় এবং এ পথের ভয়ঙ্কর পরিণতি সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করে বলে যে, তোমাদের ওপর অত্যাচার, জুলুম, নির্যাতন, নিষ্পেষণ চালানো হবে, পরিবার পরিজন এক মহা বিপদে পতিত হবে এবং সম্পদের ক্ষতি সাধিত হবে।

এই শ্রেণীর মানুষ দুনিয়ার জীবনের চাক-চিক্য, ভোগ বিলাস, আরাম আয়েশকেই বেশি পছন্দ করেছে। আখেরাতের মহা কল্যাণকর, অনাবিল আনন্দঘন ছায়ানিবিড় শীতল ঝর্ণাধারায় পরিবেষ্টিত চির সুখের অনন্ত জান্নাত সম্পর্কে তারা চিন্তা করে দেখে না। অথচ দুনিয়ার এই আরাম-আয়েশ, চাক-চিক্য আখেরাতের তুলনায় খুবই নগণ্য। সে বিষয়ে আল্লাহর বাণীকে তারা আদৌ মূল্যায়ন করে না। মহান আল্লাহর সুস্পষ্ট ঘোষণা-
أََرَضِيتُمْ بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا مِنَ الْآخِرَةِ فَمَا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا قَلِيلٌ
অর্থ: তোমরা কি আখিরাতের পরিবর্তে পার্থিব জীবনে পরিতুষ্ট হয়েছ? আখিরাতের তুলনায় পার্থিব জীবনের ভোগের উপকরণ তো অতি কিঞ্চিৎকর। (সূরা আত-তাওবা : ৩৮)
রাসূল (সা:) বলেছেন,

عَنْ مُسْتَوْرِدٍ (رضى) قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ « وَاللَّهِ مَا الدُّنْيَا فِى الآخِرَةِ إِلاَّ مِثْلُ مَا يَجْعَلُ أَحَدُكُمْ إِصْبَعَهُ هَذِهِ وَأَشَارَ يَحْيَى بِالسَّبَّابَةِ فِى الْيَمِّ فَلْيَنْظُرْ بِمَ يَرْجِعُ

অর্থ: হযরত মুসতাওরাদ (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা:) বলেছেন, আল্লাহর শপথ পরকালের তুলনায় দুনিয়া শুধু এতটুকু যে, তোমাদের কেউ যদি তার এই অঙ্গুলি (রাবি অনামিকা অঙ্গুলির দিকে ইশারা করলেন) সমুদ্রে ডুবিয়ে বের করে আনে, অতঃপর সে দেখবে যে, সেই অঙ্গুলিতে কতটুকু পানি এসছে। (সহীহ মুসলিম)
বস্তুত যারা এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের সুখ-শান্তি বিকিয়ে দিয়ে আখেরাতকে কিনে নিবে তাদের আল্লাহর পথে লড়াই করা উচিত। এ লড়াইয়ের পরিণতি যাই হোক, সেটা আল্লাহর অনুগ্রহ বলে বিবেচিত হবে, সেটা শাহাদত বরণই হোক আর বিজয় লাভই হোক।
পক্ষান্তরে যারা আখেরাত বিসর্জন দিয়ে দুনিয়া খরিদ করেছে তারা সর্বতোভাবে এক ক্ষতিকর ব্যবসায় নিমজ্জিত। প্রকৃতপক্ষে দুনিয়ার জিন্দেগি ধোঁকা বৈ কিছুই নেই। আল্লাহর বাণী-

اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَامًا وَفِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانٌ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ

অর্থ: তোমরা ভালোভাবে জেনে নাও, দুনিয়ার জীবনটা শুধুই একটা ক্রীড়া-কৌতুক সাজ-সজ্জা, বাহ্যিক চাক-চিক্য ও তোমাদের পরস্পরের গৌরব, অহঙ্কার করা আর ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির দিক দিয়ে একজন অন্যজন হতে অগ্রসর হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা ছাড়া আর কিছুই নেই। এর উপমা হলো বৃষ্টির মত, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদেরকে আনন্দ দেয়, তারপর তা শুকিয়ে যায়, তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও, তারপর তা খড়-কুটায় পরিণত হয়। আর আখিরাতে আছে কঠিন আজাব এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর দুনিয়ার জীবনটা তো ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়। (সূরা হাদিদ : ২০)

আল্লাহর পথে জিহাদ না করার পরিণতি
মায়া মরীচিকাময় ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার জীবনের মোহে পড়ে যারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে না, আল্লাহর রাস্তায় বের হবে না আল্লাহ তাদের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রেখে দিয়েছেন। আল্লাহর ঘোষণা-

إِلَّا تَنْفِرُوا يُعَذِّبْكُمْ عَذَابًا أَلِيمًا وَيَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ وَلَا تَضُرُّوهُ شَيْئًا وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

অর্থ: যদি তোমরা এই জিহাদে (তাবুক অভিযান) বের না হও তাহলে আল্লাহ তোমাদের কঠিন যন্ত্রণাদায়ক আজাব দেবেন এবং তোমাদের পরিবর্তে অন্য কোন সম্প্রদায়কে আনয়ন করবেন আর আল্লাহকে তোমরা সামান্যতম ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ হচ্ছেন সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান। (সূরা আত-তাওবা : ৩৯)
আলোচ্য আয়াতটি নবম হিজরির জিলকদ মাসে তৎকালীন দুই পরাশক্তি রোম এবং পারস্যের সাথে সংঘটিত তাবুক অভিযানে যারা যেতে অস্বীকার করেছিল এবং গড়িমসি করেছিল তাদের উদ্দেশ্যে নাজিল হয়।
এই ঘোষণা আসার পরও যারা জিহাদে অংশগ্রহণ করবে না এবং জিহাদ সম্পর্কে কোনো চিন্তা-ভাবনা করে না এবং জিহাদবিমুখ জেন্দেগির মধ্যে মুক্তির পথ খুঁজবে, জান্নাত পাওয়ার আশা করবে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেন, তাদের মৃত্যু হবে মোনাফিকের মৃত্যু। আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ (رضى) قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ مَنْ مَتَ وَ لَمْ يَغْزُوْا وَ لَمْ يُحَدِّثْ بِهِ نَفْسُهُ مَاتَ عَلى شُعْبَةٍ مِّنَ النِّفَقِ

অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা:) বলেছেন, যে ব্যক্তি জিহাদে শরিক হলো না কিংবা জিহাদ সম্পর্কে কোন চিন্তা-ভাবনাও করল না। আর এই অবস্থায় সে মারা গেল সে যেন মুনাফিকের মৃত্যু বরণ করল। (সহিহ মুসলিম)

মুজাহিদের মর্যাদা : আল্লাহর কাছে মর্যাদা ও সফলতা পাওয়ার মাধ্যম হচ্ছে জিহাদ। আল্লাহর ঘোষণা-

الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِنْدَ اللَّهِ وَأُوْلَئِكَ هُمْ الْفَائِزُونَ

অর্থ: যারা ঈমান আনে হিজরত করে এবং নিজেদের সম্পদ ও নিজেদের জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে তারা আল্লাহর নিকট মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ এবং তারাই সফলকাম। (সূরা আত তাওবা : ২০)
আল্লাহর পথে জিহাদ করলে আল্লাহর জান্নাত পাওয়া যাবে, এ পথ ছাড়া অন্য পথে জান্নাতের গ্যারান্টি নেই। আল্লাহ বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنجِيكُمْ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ(10)تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنتُمْ تَعْلَمُونَ(11)يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ(12)

অর্থ: হে মুমিনগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন একটা ব্যবসার সন্ধান দিব যা তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা করবে। সে ব্যবসা হলো এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা জানতে। (এ পথে জিহাদ করলে) আল্লাহ তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে যার পাদদেশ দিয়ে নদী/ঝর্ণা ধারা প্রবাহিত এবং স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। ইহাই মহা সাফল্য। (সূরা সফ : ১০-১২)
এ ছাড়াও আরো একটা উপকারিতা পাওয়া যাবে তা হলো-
وَأُخْرَى تُحِبُّونَهَا نَصْرٌ مِنَ اللَّهِ وَفَتْحٌ قَرِيبٌ وَبَشِّرْ الْمُؤْمِنِينَ
অর্থ: এবং তিনি দান করবেন আরো একটি অনুগ্রহ যা তোমরা পছন্দ কর, তা হলো আল্লাহর সাহায্য ও আসন্ন বিজয়। মুমিনদেরকে এই সুসংবাদ দান করুন। (সূরা সফ : ১৩)

আয়াত- ৭৫

وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنْ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَل لَنَا مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا وَاجْعَل لَنَا مِنْ لَدُنْكَ نَصِيرًا

‘তোমাদের কী হয়েছে যে, আল্লাহর পথে অসহায় নারী-পুরুষ ও শিশুদের জন্য লড়াই কর না? যারা দুর্বলতার কারণে নির্যাতিত হচ্ছে, তারা ফরিয়াদ করে বলছে, হে আমাদের রব! এই জনপদ থেকে আমাদের বের করে নাও যার অধিবাসীরা জালিম এবং তোমার পক্ষ হতে আমাদের জন্য কোনো বন্ধু, অভিভাবক পাঠাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের সাহায্যকারী বানিয়ে দাও।’

ব্যাখ্যা : এখানে এমন সব মজলুম নারী-পুরুষ ও শিশুদের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যারা শারীরিক দুর্বলতা ও অসঙ্গতির কারণে মদিনায় হিজরত করতে পারে নাই। অন্য দিকে কাফিরদের জুলুম ও নির্যাতন থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার ক্ষমতাও ছিল না। এদের মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস ও তাঁর মা সালমা ইবনে হিশাম, ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদ, জান্দাল ইবনে সুহাইল (রা.) এর মত সাহাবীরাও ছিলেন, তাদের ওপর কাফেরদের নির্যাতন ছিল অবর্ণনীয়। তাই তারা এরূপ প্রার্থনা করে। মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে আল্লাহ্ তায়ালা তাঁদের প্রার্থনা পূর্ণ করেছিলো

সে সময়ের জাহেলিয়াতের ধারক বাহকদের নির্যাতনের মাত্রা নিরপরাধ মানুষদের প্রতি যেরূপ ছিল বর্তমান জাহেলিয়াতের ধারক এবং বাহকরাও তথা শয়তানের চেলা-চামুন্ডাদের উন্মত্ততা যেন তার থেকেও শতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিকে শয়তানের মদদপুষ্ট ইসলামবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও তাদের আনুগত্যকারী দুনিয়া লোভী অপরাধীচক্র প্রকাশ্যে ও গোপনে আল-কুরআনের অনুসারী ইসলামপ্রিয় জনগোষ্ঠীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করছে, সুযোগ পেলে প্রকাশ্যে ও গোপনে হত্যা করছে, বাড়ি-ঘর লুটপাট করছে, ফসলের ক্ষেত দখল করছে। এ অবস্থায় একশ্রেণীর মুসলমান একামতে দ্বীন ও ইসলামী দাওয়াতের সকল প্রকার কাজ-কর্ম থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে নিয়ে বাতিলের সাথে মিলে মিশে দুনিয়ায় বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে এবং আর এক শ্রেণী বলছেন, আমরা কোনো রাজনীতি করি না, দুনিয়ার কোন ঝামেলার মধ্যে আমরা নেই বলে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। এদেরকে উদ্দেশ করে আল্লাহ তাআলা বলছেন, এ সকল নির্যাতিত বনি আদমের ফরিয়াদ কি তোমাদের কর্ণকুহুরে পৌঁছাচ্ছে না। জালিমদের হাত থেকে এদের মুক্ত করার জন্য তোমরা কেন জিহাদে অংশ নিচ্ছ না? অনুরূপ বক্তব্য আল্লাহ সূরা তাওবায় পেশ করেছেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَا لَكُمْ إِذَا قِيلَ لَكُمْ انفِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ اثَّاقَلْتُمْ إِلَى الْأَرْضِ أَرَضِيتُمْ بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا مِنْ الْآخِرَةِ فَمَا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا قَلِيلٌ

অর্থ: হে ঈমানদাররা! তোমাদের কী হলো? যখন তোমাদেরকে আল্লাহর পথে বের হতে বলা হলো তখন তোমরা দুনিয়াকে আঁকড়ে ধরলে, তোমরা কি দুনিয়ার জীবনকে আখেরাতের তুলনায় বেশ পছন্দ করেছ? অথচ আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী। (সূরা আত তাওবা : ৩৮)
অন্যায়, নিষ্ঠুরতা, জুলুম, নির্যাতন, মিথ্যা, প্রতারণা, ওয়াদাভঙ্গ, নির্লজ্জতা, স্বার্থপূজা, আমানতের খেয়ানত, বলপ্রয়োগ, মজলুম অসহায় নারী-শিশুর নির্যাতনের দৃশ্য খুবই করুণ ও মর্মঘাতী যা ঈমানদারদের জিহাদের প্রেরণা জোগায়। এ সকল মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক দৃশ্য যদি ঈমানদারদের জিহাদের প্রেরণা না জোগায় তাহলে বুঝতে হবে ঈমানদারদের ঈমানের দাবি শূন্যের কোঠায়।
প্রসঙ্গত একটা বিষয় প্রণিধানযোগ্য তৎকালে যে ভূখন্ডের সংখ্যাগুরু অধিবাসীরা অত্যাচারী জালিম ইসলামের পরিভাষায় সেটাকে ‘দারুল হরব’ অর্থাৎ যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় যোগ্য ভূমি বলে গণ্য করতো; তা ছিল মক্কা। মক্কা মুহাজির মুসলমানদের মাতৃভূমি হলেও তা কুরআনের দৃষ্টিতে ‘দারুল হরব’ অর্থাৎ কাফিরের দেশ। কেননা সেখানে আল্লাহর শরিয়ত তখনো চালু হয়নি। মুহাজিরদের নিজ মাতৃভূমির বিরুদ্ধে লড়াই করে মজলুম মুসলমান ভাইদের নিরাপদ ও হেফাজত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যা বর্তমান পৃথিবীর সকল মুসলমানকে শামিল করেছে। কাজেই-

# মুসলমানরা যে পতাকা রক্ষার জন্য লড়াই করবে তা হচ্ছে তার ঈমান ও আকিদা, জন্মভূমির জন্য নয়।
# মুসলমানরা যে পতাকা প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে তা হচ্ছে কুরআনের আইন-বিধানের প্রতিষ্ঠা, মাতৃভূমির জন্য নয়।
# মুসলমানরা ইসলামের হাতে ক্ষমতা দেয়ার জন্য লড়াই করবে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে দেয়ার জন্য নয়।
# স্বদেশ ও মাতৃভূমিকে ইসলামের অধীন করার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লড়াই করবে। এ ছাড়া অন্যসব দৃষ্টিভঙ্গি বাতিল বা জাহেলি।

আয়াত- ৭৬

الَّذِينَ آمَنُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا

“যারা ঈমানদার তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে আর যারা কাফের তারা তাগুতের পথে লড়াই করে। ষড়যন্ত্র আসলে খুবই দুর্বল।”
ব্যাখ্যা : এ আয়াতে আল্লাহ ঈমানদারদের উৎসাহ উদ্দীপনা বৃদ্ধি করা, তাদের চলার পথ আলোকিত করা ও দুটো পথের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য চিহ্নিত করার জন্য আর একটি মনস্তাত্ত্বিক পর্যালোচনা করেছেন।
এটা আল্লাহর একটি দ্ব্যর্থহীন ফয়সালা আল্লাহর পৃথিবীতে একমাত্র আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে লড়াই করা হচ্ছে ঈমানদারদের কাজ। যথার্থ ও সত্যিকার মুমিন এই কাজ থেকে কখনো বিরত থাকবে না। আল্লাহর বাণী-

لَا يَسْتَأْذِنُكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالْمُتَّقِينَ

অর্থ: যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান আনে তারা নিজ সম্পদ ও জীবন দ্বারা জিহাদে অংশগ্রহণ করা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার প্রার্থনা তোমার নিকট করে না। আল্লাহ মুত্তাকিদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত। (সূরা তওবা : ৪৪)
অন্যত্র আল্লাহ বলেন,

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

অর্থ: অতএব, তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজদের অন্তরে কোনো দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। (সূরা নিসা : ৬৫)
আর আল্লাহর পৃথিবীতে আল্লাহ বিরোধী ও খোদাদ্রোহীদের রাজত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তাগুতের পথে লড়াই করা হচ্ছে শয়তানের বা কাফেরদের কাজ। কোন ঈমানদার ব্যক্তি এ কাজ করতে পারে না। আল্লাহ বলেন,

أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا

অর্থ: তুমি কি তাদেরকে দেখ নাই যারা দাবি করে যে, তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তারা বিশ্বাস করে, অথচ তারা তাগুতের কাছে বিচার প্রার্থী হতে চায়। যদিও উহা প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং শয়তান তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়। (সূরা নিসা : ৬০)

فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا

আপাতদৃষ্টিতে শয়তান ও তার সাথীরা রকমারি কৌশল অবলম্বন করে বিরাট প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে আসে। তাদের প্রস্তুতি ও কৌশল দেখে ঈমানদার কখনো ভীত হয় না, কারণ তারা নিশ্চিত জানে এ লড়াইয়ে তাদের নিজেদের বা তাদের জাতির বা তাদের আত্মীয়স্বজনের কোনো স্বার্থ জড়িয়ে নেই।
এ লড়াই শুধু আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর আইন ও বিধানের জন্য। এ লড়াইয়ে তারা একটা বাতিলপন্থী মানবগোষ্ঠীর মোকাবেলা করছে, যারা সত্যের ওপর বাতিলকে বিজয়ী করতে চায়, যারা মানবরচিত মতবাদকে আল্লাহর মতবাদের ওপর বিজয়ী করতে চায়, যারা জুলুম অবিচারকে আল্লাহর ন্যায়বিচারের ওপর বিজয়ী করতে চায়।
অথচ মুসলমানদেরকে জুলুম-নির্যাতন, অন্যায়-অবিচার তথা জাহেলিয়াতকে উৎখাত করে তদস্থলে আল্লাহর দ্বীন (জীবনব্যবস্থা) প্রতিষ্ঠার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেন,
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
অর্থ: তিনিই (আল্লাহ) তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহকারে পৃথিবীর বুকে বিদ্যমান সকল দ্বীনের ওপর উহাকে বিজয়ী করার জন্য। (সূরা সফ : ৯)
অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
شَرَعَ لَكُمْ مِنْ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ
অর্থ: তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দ্বীন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহকে, আর যা আমি ওহি করেছি তোমাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহিম, মূসা ও ঈসাকে, এই বলে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং এ ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি করো না। (সূরা শুরা- ১৩)

মুমিনেরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে লড়াই করে যে, এই লড়াইয়ে তাদের পৃষ্ঠপোষক ও অভিভাবক আল্লাহ, আর তারা যাদের বিরুদ্ধে লড়বে তাদের অভিভাবক শয়তান, আর শয়তানের চক্রান্ত অত্যন্ত দুর্বল। এখান থেকেই মুমিনের চেতনায় লড়াইয়ের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়ে যায় যে, এই লড়াই শুরু করার আগেই শেষ কোথায় তা জানা হয়ে যায়। এরপর এ লড়াইয়ে শহীদ হোক বা বেঁচে থাক্ তাতে কিছু যায় আসে না। আল্লাহর পথে জিহাদের এই উভয় দিক সম্পর্কে নির্ভুল ধারণা লাভের কারণেই একজন মুমিন দুনিয়ার সব পিছুটানকে উপেক্ষা করে আল্লাহর পথে লড়াই-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, উক্ত দারসুল কুরআন থেকে মুমিনদের জন্য শিক্ষা হচ্ছেঃ

১. ঈমানের দাবিতে সত্যবাদিতার প্রমাণ দিয়ে মহা পুরস্কার পেতে হলে আখেরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবনকে বিক্রি করে দিতে হবে।
২. আখেরাতের সুখ-শান্তি পেতে হলে আল্লাহর পথে লড়াই করতে হবে।
৩. এ লড়াই হতে হবে শুধুমাত্র-
ক) আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে;
খ) আল্লাহর বাণী সর্বোচ্চে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে;
গ) গোটা জীবনের উপরে আল্লাহর বিধানকে কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা দানের উদ্দেশ্যে;
ঘ) মানবসমাজে আল্লাহর বিধান মোতাবেক ইনসাফ ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে।
৪. নিশ্চিত বিশ্বাসী হতে হবে এ লড়াইয়ে নিহত হলে শহীদ, বিজয়ী হলে গাজি। উভয়টাই আল্লাহর অনুগ্রহ, আর আল্লাহর অনুগ্রহ মানেই মহা পুরস্কার। (জান্নাতুল ফেরদাউস)
৫. মজলুম, অসহায় নারী-পুরুষ, শিশুদের জাহেলিয়াতের নাগপাশ থেকে মুক্ত করার দৃষ্টিভঙ্গি তীব্র করতে হবে, যে দৃষ্টিভঙ্গি সার্বক্ষণিক জেহাদের প্রেরণা জোগাবে।
৬. তাগুত তথা শয়তানি শক্তির বিশাল প্রস্তুতি ও রকমারি কলাকৌশল দেখেও ভীত সন্ত্রস্ত হওয়া যাবে না, কারণ শয়তানের কৌশল খুবই দুর্বল।
৭. নিশ্চিত বিশ্বাসী হতে হবে, যাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম তাদের অভিভাবক শয়তান আর ঈমানদারদের অভিভাবক আল্লাহ।
উপরোক্ত শিক্ষার আলোকে আমরা যেন সার্বক্ষণিক আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে মশগুল থাকতে পারি এবং জান্নাতের পথের যাত্রী হিসেবে সব সময় আল্লাহর পথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারি আল্লাহ সে তৌফিক দান করুন। আমিন।


লেখক : বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ