ড. মুহা: রফিকুল ইসলাম

مَن جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا ۖ وَمَن جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَىٰ إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ (১৬০) قُلْ إِنَّنِي هَدَانِي رَبِّي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ دِينًا قِيَمًا مِّلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۚ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ (১৬১) قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (১৬২(

১৬০) যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে হাজির হবে সৎকাজ নিয়ে তার জন্য রয়েছে দশগুণ প্রতিফল আর যে ব্যক্তি অসৎকাজ নিয়ে আসবে সে ততটুকু প্রতিফল পাবে যতটুকু অপরাধ সে করেছে এবং কারো প্রতি জুলুম করা হবে না৷ ১৬১) হে মুহাম্মাদ! বলো, আমার রব নিশ্চিতভাবেই আমাকে সোজা পথ দেখিয়ে দিয়েছেন৷ একদম সঠিক নির্ভুল দীন, যার মধ্যে কোনো বক্রতা নেই, ইবরাহিমের পদ্ধতি, যাকে সে একাগ্রচিত্তে একমুখী হয়ে গ্রহণ করেছিল এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না৷ ১৬২) বলো, আমার নামাজ, আমার ইবাদাতের সমস্ত অনুষ্ঠান, আমার জীবন ও মৃত্যু সবকিছু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য। (সূরা আল আনআম : ১৬০-১৬২)

নামকরণঃ
এ সূরার ১৬ ও ১৭ নং রুকুতে কোন কোন আনআমের (গৃহপালিত পশু) হারাম হওয়া এবং কোন কোনটির হালাল হওয়া সম্পর্কিত আরববাসীদের কাল্পনিক ও কুসংস্কারমূলক ধারণা বিশ্বাসকে খণ্ডন করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে এ সূরাকে আল আনআম নামকরণ করা হয়েছে। (তাফহিমুল কুরআন)

নাজিল হওয়ার সময়কালঃ
ইবনে আব্বাস রা:-এর বর্ণনা মতে, এ সম্পূর্ণ সূরাটি একই সাথে মক্কায় নাজিল হয়েছিল। হযরত মুআয ইবনে জাবালের চাচাতো বোন হযরত আসমা বিনতে ইয়াযিদ বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটনীর পিঠে সওয়ার থাকা অবস্থায় এ সূরাটি নাজিল হতে থাকে। তখন আমি তাঁর উটনীর লাগাম ধরে ছিলাম। বোঝার ভারে উটনীর অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যেন মনে হচ্ছিল এই বুঝি তার হাড়গোড় ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। হাদিসে এ কথাও সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, যে রাতে এ সূরাটি নাজিল হয় সে রাতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটিকে লিপিবদ্ধ করান। (তাফহিম)

আলোচ্য বিষয়ঃ
আলোচ্য আয়াতসমূহে মহান আল্লাহ ভালো কাজের সুফল এবং সিরাতুল মুসতাকিমের আলোচনা করেছেন। এ দু’টি বিষয়ের পাশাপাশি সকল কাজের জীবনের সমস্ত কর্মতৎপরতা তথা সফলতা এবং ব্যর্থতা সবকিছুই একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য- এ বিষয়টি এখানে পরিষ্কারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। মানুষের কর্মের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী হবে তার সার-নির্যাস এখানে বিদ্যমান। সর্বোপরি এখলাসের সাথে এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মুমিনের সবকিছু নিবেদন করতে হবে সে ব্যাপারটি এখানে বর্ণিত হয়েছে।

তাফসিরঃ
আয়াত নং ১৬০
مَن جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا ۖ وَمَن جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَىٰ إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে হাজির হবে সৎকাজ নিয়ে তার জন্য রয়েছে দশগুণ প্রতিফল।
প্রাগুক্ত আয়াতের প্রথম অংশে মহান আল্লাহ মানবতার জন্য ভালো কাজের পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। একজন মানুষ দুনিয়ায় সব ধরনের লোভ-লালসা, ভোগ-বিলাস, ইন্দ্রিয় চাহিদামুক্ত হয়ে এবং বন্ধুমহলের ক্রমাগত উন্নতি দেখেও যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় পথ অনুসরণ না করে ধৈর্যসহকারে মহান রবের পথে জীবন অতিবাহিত করে তার জন্য আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে প্রাগুক্ত পুরস্কার রয়েছে। মহান আল্লাহ এ বোনাস ঘোষণা কালামে হাকিম এবং হাদিসের অসংখ্য স্থানে প্রদান করেছেন। যেমন- তিনি সূরা আন নামলের ৮৯ নং আয়াতে বলেন,
مَن جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ خَيْرٌ مِّنْهَا وَهُم مِّن فَزَعٍ يَوْمَئِذٍ آمِنُونَ
যে ব্যক্তি সৎকাজ নিয়ে আসবে সে তারচেয়ে বেশি ভালো প্রতিদান পাবে এবং এ ধরনের লোকেরা সেদিনের ভীতি বিহবলতা থেকে নিরাপদ থাকবে৷ মহান আল্লাহ সূরা ইউনুসের ২৬ নং আয়াতে আরো বলেন,
لِّلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَىٰ وَزِيَادَةٌ ۖ وَلَا يَرْهَقُ وُجُوهَهُمْ قَتَرٌ وَلَا ذِلَّةٌ ۚ أُولَٰئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
যারা কল্যাণের পথ অবলম্বন করেছে তাদের জন্য আছে কল্যাণ এবং আরো বেশি৷ কলঙ্ক-কালিমা বা লাঞ্ছনা তাদের চেহারাকে আবৃত করবে না৷ তারা জান্নাতের হকদার, সেখানে তারা থাকবে চিরকাল৷ মহান আল্লাহ অনুরূপ সূরা আল কাসাসের ৮৪ নং আয়াতে বলেন,
مَن جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ خَيْرٌ مِّنْهَا ۖ وَمَن جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَى الَّذِينَ عَمِلُوا السَّيِّئَاتِ إِلَّا مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
যে কেউ ভালো কাজ নিয়ে আসবে তার জন্য রয়েছে তারচেয়ে ভালো ফল এবং যে কেউ খারাপ কাজ নিয়ে আসে তার জানা উচিত, অসৎ কর্মশীলরা যেমন কাজ করতো তেমনটিই প্রতিদান পাবে৷


এ ছাড়া তিনি সূরা আস সাবার ৩৭ নং আয়াতে বলেন,
وَمَا أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُم بِالَّتِي تُقَرِّبُكُمْ عِندَنَا زُلْفَىٰ إِلَّا مَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ لَهُمْ جَزَاءُ الضِّعْفِ بِمَا عَمِلُوا وَهُمْ فِي الْغُرُفَاتِ آمِنُونَ
তোমাদের এই ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন নয় যা তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে; হ্যাঁ, তবে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে৷ এরাই এমন লোক যাদের জন্য রয়েছে তাদের কর্মের দ্বিগুণ প্রতিদান এবং তারা সুউচ্চ ইমারতসমূহে নিশ্চিন্তে নিরাপদে থাকবে৷ তিনি সূরা আল মুমিনের ৪০ নং আয়াতে বলেন,
وَمَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَٰئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ يُرْزَقُونَ فِيهَا بِغَيْرِ حِسَابٍ
আর নারী হোক বা পুরুষ- যে নেক কাজ করবে সে যদি ঈমানদার হয় তাহলে তারা সবাই জান্নাতে প্রবেশ করবে৷ সেখানে তাদেরকে বেহিসাব রিজিক দেয়া হবে৷

ওই ব্যক্তিদের পুরস্কারের ব্যাপারে নবী করিম সা: বলেছেন,
عَنْ اِبْن عَبَّاس رَضِيَ اللَّه عَنْهُمَا أَنَّ رَسُول اللَّه صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فِيمَا يَرْوِي عَنْ رَبّه تَبَارَكَ وَتَعَالَى إِنَّ رَبّكُمْ عَزَّ وَجَلَّ رَحِيم مَنْ هَمَّ بِحَسَنَةٍ فَلَمْ يَعْمَلهَا كُتِبَتْ لَهُ حَسَنَة فَإِنْ عَمِلَهَا كُتِبَتْ لَهُ عَشْرًا إِلَى سَبْعمِائَةٍ إِلَى أَضْعَاف كَثِيرَة . وَمَنْ هَمَّ بِسَيِّئَةٍ فَلَمْ يَعْمَلهَا كُتِبَتْ لَهُ حَسَنَة فَإِنْ عَمِلَهَا كُتِبَتْ لَهُ وَاحِدَة أَوْ يَمْحُوهَا اللَّه عَزَّ وَجَلَّ وَلَا يَهْلَك عَلَى اللَّه إِلَّا هَالِك . وَرَوَاهُ الْبُخَارِيّ وَمُسْلِم وَالنَّسَائِيّ
ইবন আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বর্ণনা করেছেন: “তোমাদের মহিমান্বিত আল্লাহ বড় করুণাময়। কেউ যদি ভালো কাজের ইচ্ছা করে, কিন্তু ওই কাজ সাধন করতে না পারে তবুও তার জন্য একটি পুণ্য লেখা হয়। আর যদি সে ওই কাজটি সাধন করে তবে তার জন্য দশটা পুণ্য লেখা হয় এবং তার ভালো নিয়তের কারণে এটা বৃদ্ধি হতে হতে সাতশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পক্ষান্তরে কেউ যদি কোনো খারাপ কাজের ইচ্ছা করে, কিন্তু তা করে না বসে তবে ওর জন্যও একটা পুণ্য লেখা হয়। আর যদি তা করে ফেলে তবে একটা মাত্র পাপ লেখা হয় এবং সেটাও ইচ্ছা করলে মহান আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। (বুখারি, মুসলিম ও নাসায়ী)

 

নবী করিম সা: এ ব্যাপারে আরো বলেন:

عَنْ أَبِي ذَرّ رَضِيَ اللَّه عَنْهُ قَالَ : قَالَ رَسُول اللَّه صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَآله وَسَلَّمَ يَقُول اللَّه عَزَّ وَجَلَّ مَنْ عَمِلَ حَسَنَة فَلَهُ عَشْر أَمْثَالهَا وَأَزِيد وَمَنْ عَمِلَ سَيِّئَة فَجَزَاؤُهَا مِثْلهَا أَوْ أَغْفِر وَمَنْ عَمِلَ قُرَاب الْأَرْض خَطِيئَة ثُمَّ لَقِيَنِي لَا يُشْرِك بِي شَيْئًا جَعَلْت لَهُ مِثْلهَا مَغْفِرَة وَمَنْ اِقْتَرَبَ إِلَيَّ شِبْرًا اِقْتَرَبْت إِلَيْهِ ذِرَاعًا وَمَنْ اِقْتَرَبَ إِلَيَّ ذِرَاعًا اِقْتَرَبْت إِلَيْهِ بَاعًا وَمَنْ أَتَانِي يَمْشِي أَتَيْته هَرْوَلَة وَرَوَاهُ مُسْلِم عَنْ أَبِي كُرَيْب عَنْ أَبِي مُعَاوِيَة وَعَنْ أَبِي بَكْر بْن أَبِي شَيْبَة عَنْ وَكِيع عَنْ الْأَعْمَش بِهِ وَرَوَاهُ اِبْن مَاجَهْ عَنْ عَلِيّ بْن مُحَمَّد الطَّنَافُسِيّ عَنْ وَكِيع بِهِ .
আবু যার রা: থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, “মহিমান্বিত আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি একটি ভালো কাজ করবে তার জন্য অনুরূপ দশটি পুণ্য রয়েছে এবং আমি তারচেয়ে বেশি প্রদান করবো। আর যে ব্যক্তি একটি খারাপ কাজ করবে, তার অনুরূপ একটি মাত্র পাপ তার জন্য লেখা হবে আমি ওটাও ক্ষমা করে দেবো। যে ব্যক্তি ভূপৃষ্ঠ বরাবর পাপ করে আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে কিন্তু আমার সাথে কাউকে শরিক করবে না, আমি সেই পরিমাণ ক্ষমা তার প্রতি নাজিল করবো। যে ব্যক্তি আমার দিকে অর্ধহাত অগ্রসর হবে আমি তার দিকে একহাত অগ্রসর হবো। আর যে ব্যক্তি আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হবে, আমি তার দিকে দু’হাত অগ্রসর হবো। যে ব্যক্তি আমার দিকে হেঁটে আসবে আমি তার দিকে দৌড়িয়ে যাবো। (ইমাম মুসুলম ও ইবনু মাজাহ) ইবন কাসির রহ: এ আয়াতের ব্যাখ্যায় এসব হাদিস বর্ণনা করেছেন।
ভালো কাজের বাস্তবায়ন, নিয়ত সবকিছু বরকতময়। এখানে একনিষ্ঠ নিয়ত থাকতে হবে। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি একমাত্র লক্ষ্য হতে হবে। দুনিয়ার হিসাবে কতটা সফল অথবা ব্যর্থ তা বিবেচ্য নয়। আবার দুনিয়ার জীবনে মানুষ কতটা সফল বা ব্যর্থ বললো সেটাও কোনো বিষয় নয়, বরং আমরা কতটা সৎ নিয়তের সাথে কাজ করেছি, তার ওপরেই নির্ভর করবে মহান আল্লাহর পুরস্কার।

কিন্তু যাদের চিন্তায় এবং নিয়তে বৈপরীত্য আছে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠেীকে খুশি করার জন্য কিছু করে, অথবা দুনিয়ার বাহবা পাওয়ার জন্য করে, কেউ বড় নেতা বলবে, অথবা কেউ বড় বিদ্বান বলবে, কেউ দাতা বলবে এসব নিয়তে হলে তার সব কিছু ব্যর্থ এবং শূন্য হয়ে যাবে। তার সব আমল খারাপ আমল হিসেবে বিবেচ্য হবে। এ জন্য মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَمَن جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَىٰ إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُون
আর যে ব্যক্তি অসৎকাজ নিয়ে আসবে সে ততটুকু প্রতিফল পাবে যতটুকু অপরাধ সে করেছে এবং কারো প্রতি জুলুম করা হবে না৷
এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ আরো অনেক আয়াতে সতর্ক করেছেন। যেমন-
মহান আল্লাহ সূরা আন নমলের ৯০ নং আয়াতে আরো বলেন,
وَمَن جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَكُبَّتْ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ هَلْ تُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
যারা অসৎ কাজ নিয়ে আসবে, তাদের সবাইকে অধোমুখে আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে৷ তোমরা কি যেমন কর্ম তেমন ফল- ছাড়া অন্য কোনো প্রতিদান পেতে পার?


আল্লাহ তাআলা সূরা ইউনুছের ২৭ নং আয়াতে আরো বলেন,
وَالَّذِينَ كَسَبُوا السَّيِّئَاتِ جَزَاءُ سَيِّئَةٍ بِمِثْلِهَا وَتَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ ۖ مَّا لَهُم مِّنَ اللَّهِ مِنْ عَاصِمٍ ۖ كَأَنَّمَا أُغْشِيَتْ وُجُوهُهُمْ قِطَعًا مِّنَ اللَّيْلِ مُظْلِمًا ۚ أُولَٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
আর যারা খারাপ কাজ করেছে, তারা তাদের খারাপ কাজ অনুযায়ীই প্রতিফল পাবে৷ লাঞ্ছনা তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে৷ আল্লাহর হাত থেকে তাদেরকে বাঁচাবার কেউ থাকবে না৷ তাদের চেহারা যেন আঁধার রাতের কালো আবরণে আচ্ছাদিত হবে৷ তারা দোজখের হকদার, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে৷
মহান আল্লাহ সূরা আস সাবার ৩৮ নং আয়াতে বলেন,
وَالَّذِينَ يَسْعَوْنَ فِي آيَاتِنَا مُعَاجِزِينَ أُولَٰئِكَ فِي الْعَذَابِ مُحْضَرُونَ
যারা আমার আয়াতকে ব্যর্থ করার জন্য প্রচেষ্টা চালায় তারা শাস্তি ভোগ করবে৷
তিনি সূরা আল মুমিনের ৪০ নং আয়াতে বলেন,
مَنْ عَمِلَ سَيِّئَةً فَلَا يُجْزَىٰ إِلَّا مِثْلَهَا ۖ وَمَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَٰئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ يُرْزَقُونَ فِيهَا بِغَيْرِ حِسَابٍ
যে মন্দ কাজ করবে সে যতটুকু মন্দ করবে ততটুকুরই প্রতিফল লাভ করবে৷ আর নারী হোক বা পুরুষ যে নেক কাজ করবে সে যদি ঈমানদার হয় তাহলে তারা সবাই জান্নাতে প্রবেশ করবে৷ সেখানে তাদেরকে বেহিসাব রিজিক দেয়া হবে৷

আয়াত নং ১৬১
এ দীন পরিপূর্ণভাবে সঠিক এবং একনিষ্ঠ। যে বা যারা এটা অনুকরণ অনুসরণ করবে তারা সব ধরনের বাঁকা পথমুক্ত হয়ে সঠিক পথ প্রাপ্ত হবে এবং সব ধরনের পুরস্কারপ্রাপ্ত হবে। সেই সঠিক দীনের পরিচয় প্রদান করে মহান আল্লাহ বলেন,
قُلْ إِنَّنِي هَدَانِي رَبِّي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ دِينًا قِيَمًا مِّلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۚ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ
মহান আল্লাহ নবী করিম সা:কে আদেশ করছেন এ সংবাদ প্রদান করার জন্য যে, আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ, তিনি সঠিক পথের হেদায়েত দান করেছেন। এমন পথ যাতে কোনো বক্রতা নেই এবং সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম। সে ধর্মটি হলো মিল্লাতে ইবরাহিম। তিনি সকল ধরনের শিরক থেকে মুক্ত।
মহান আল্লাহ এ দীন সম্পর্কে সূরা আল বাকারার ১৩০ নং আয়াতে বলেন,
وَمَن يَرْغَبُ عَن مِّلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَن سَفِهَ نَفْسَهُ ۚ وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا ۖ وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ
এখন কে ইবরাহিমের পদ্ধতিকে ঘৃণা করবে? হ্যাঁ, যে নিজেকে মূর্খতা ও নির্বুদ্ধিতায় আচ্ছন্ন করেছে সে ছাড়া আর কে এ কাজ করতে পারে? ইবরাহিমকে তো আমি দুনিয়ায় নিজের জন্য নির্বাচিত করেছিলাম আর আখেরাতে সে সৎকর্মশীলদের মধ্যে গণ্য হবে৷


তিনি সূরা আল-হজের ৭৮ নং আয়াতে বলেন,
وَجَاهِدُوا فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ ۚ هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ ۚ مِّلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ ۚ
আল্লাহর পথে জিহাদ করো যেমন জিহাদ করলে তার হক আদায় হয়৷ তিনি নিজের কাজের জন্য তোমাদেরকে বাছাই করে নিয়েছেন এবং দীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সঙ্কীর্ণতা আরোপ করেননি৷ তোমাদের পিতা ইবরাহিমের মিল্লাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাও৷
মহান আল্লাহ সূরা আন নাহলের ১২০ থেকে ১২৩ নং আয়াতে এ ব্যাপারে বলেন,
﴿إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً قَانِتًا لِّلَّهِ حَنِيفًا وَلَمْ يَكُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ﴾﴿شَاكِرًا لِّأَنْعُمِهِ ۚ اجْتَبَاهُ وَهَدَاهُ إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ﴾﴿وَآتَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً ۖ وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ﴾﴿ثُمَّ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ أَنِ اتَّبِعْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۖ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ﴾
১২০) প্রকৃতপক্ষে ইবরাহিম নিজেই ছিল একটি পরিপূর্ণ উম্মত, আল্লাহর হুকুমের অনুগত এবং একনিষ্ঠ৷ সে কখনো মুশরিক ছিল না৷ ১২১) সে ছিল আল্লাহর নিয়ামতের শোকরকারী৷ আল্লাহ তাকে বাছাই করে নেন এবং সরল সঠিক পথ দেখান৷ ১২২) দুনিয়ায় তাকে কল্যাণ দান করেন এবং আখেরাতে নিশ্চিতভাবেই সে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হবে৷ ১২৩) তারপর আমি তোমার কাছে এ মর্মে অহি পাঠাই যে, একাগ্র হয়ে ইবরাহিমের পথে চলো এবং সে মুশরিকদের দলভুক্ত ছিল না৷

রাসূল সা: যখন সকালে উঠতেন তখন এ দীনের ব্যাপারে বলতেন,
عَنْ اِبْن أَبْزَى عَنْ أَبِيهِ قَالَ كَانَ رَسُول اللَّه صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَصْبَحَ قَالَ أَصْبَحْنَا عَلَى مِلَّة الْإِسْلَام وَكَلِمَة الْإِخْلَاص وَدِين نَبِيّنَا مُحَمَّد وَمِلَّة أَبِينَا إِبْرَاهِيم حَنِيفًا وَمَا كَانَ مِنْ الْمُشْرِكِينَ
ইবন ইবযি তার পিতা বর্ণনা করেছেন যে, যখন সকাল হতো তখন রাসূলুল্লাহ সা: বলতেন, “আমরা মিল্লাতে ইসলাম ও কালিমায়ে ইখলাসের ওপর এবং আমাদের নবী মুহাম্মদ সা:-এর দীনের ওপর এবং আমাদের পিতা একনিষ্ঠ ইবরাহিমের মিল্লাতের ওপর সকাল শুরু করলাম, যিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। (মুসনাদে আহমাদ ও তাফসির ইবন কাসির)
নবী করিম সা: আরো বলতেন,
عَنْ اِبْن عَبَّاس رَضِيَ اللَّه عَنْهُمَا أَنَّهُ قَالَ : قِيلَ لِرَسُولِ اللَّه صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَيّ الْأَدْيَان أَحَبّ إِلَى اللَّه تَعَالَى ؟ قَالَ الْحَنِيفِيَّة السَّمْحَة.
ইবন আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা:কে জিজ্ঞেস করা হয়, “হে আল্লাহর রাসূল সা:! আল্লাহর কাছে কোন দীন সবচেয়ে প্রিয়?” তিনি উত্তরে বললেন, “ইবরাহিম হানিফ (আ:)-এর ধর্ম।” (মুসনাদে আহমাদ, তাফসির ইবন কাসির)

তাফসির সাদীর বর্ণনার আলোকে বলা যায়, মহান আল্লাহ কর্তৃক নবী করিম সা:কে এ ঘোষণা প্রদান করতে বলেছেন যে, তিনি যে পথে আছেন সেটাই সরল সঠিক পথ। এ দীন সকল দীনের মাঝে মধ্যবর্তী এবং ন্যায়ানুগ জীবনব্যবস্থা। এর সাথে যুক্ত সঠিক আকিদা-বিশ্বাস, সৎ আমল, সকল উত্তম কার্যাবলি, মন্দ থেকে নিষেধাজ্ঞা এবং যার সাথে রয়েছে মহান আল্লাহর প্রেরিত সকল আম্বিয়া।

আয়াত নং ১৬২
অত্র আয়াতে মহান আল্লাহ মানুষের সকল কর্মতৎপরতার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে বলেছেন,
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
বলো, আমার নামাজ, আমার ইবাদাতের সমস্ত অনুষ্ঠান, আমার জীবন ও মৃত্যু সবকিছু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য।
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির তানতাবিতে বলা হয়েছে: এখানে পুনরায় স্মরণ করানো হচ্ছে যে, সব কিছুর অভীষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে মহান আল্লাহ তাআয়ালা। এমন কোনো কাজ করা হবে না, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়। এখানে একনিষ্ঠ এখলাস এবং নিয়তের বিশুদ্ধতার কথা বলা হয়েছে।
এর ব্যাখ্যায় তাফসিরে ইবন আশুরে বলা হয়েছে, ‘মাখলুকের সমগ্র কর্মকাণ্ড একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য নিবেদিত হবে, অন্য কারো জন্য নয়। কেননা অন্য কেউ নতুন কিছু সৃষ্টি বা আবিষ্কারের নেয়ামতের অধিকারী হতে পারে না, যা মহান আল্লাহই কেবল হতে পারেন। যেমন- তিনি সূরা আল আনআমের প্রথম আয়াতে বলেন,
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَجَعَلَ الظُّلُمَاتِ وَالنُّورَ ۖ ثُمَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِرَبِّهِمْ يَعْدِلُونَ
প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি পৃথিবী ও আকাশ সৃষ্টি করেছেন এবং অন্ধকার ও আলোর উৎপত্তি ঘটিয়েছেন৷ তবুও সত্যের দাওয়াত অস্বীকারকারীরা অন্যদেরকে তাদের রবের সমকক্ষ দাঁড় করাচ্ছে৷

শিক্ষাঃ
এ আয়াতসমূহ থেকে আমরা যেসব শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি তা হচ্ছে-
১.সর্বাবস্থায় কাজের নিয়ত সঠিক ও বিশুদ্ধ করে নিতে হবে।
২.সকল কাজ মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হচ্ছে কি না, তা খুব ভালো করে চিন্তা করতে হবে।
৩.কোন ব্যক্তির অনুরোধ যদি মহান আল্লাহ ও রাসূল সা:-এর আদেশ-নিষেধের পরিপন্থী হয় অবশ্যই তা বর্জন করতে হবে।
৪.সর্বাবস্থায় যত ছোট গোনাহ হোক না কেন তা বর্জন করার চেষ্টা করতে হবে।
মহান আল্লাহ প্রাগুক্ত আয়াতের আলোকে জীবন গঠনের তৌফিক দান করুন।

লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ