শহীদ ডা. মিজানুর রহমান মিজান

০১ জানুয়ারি ১৯৬৭ - ১৮ অক্টোবর ১৯৯৩ | ৬০

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

শাহাদাতের ঘটনা

ফুল কখনো নিজের জন্য ফোটে না সে নিজেকে অপরের জন্য প্রস্ফুটিত করে। ফুল ফোটে সুরভি ছড়ায়। কিন্তু ফুল যদি সুরভি ছড়ানোর ঠিক আগ মুহূর্তে ঝরে পড়ে তখন আর কোন কিছু ভাল লাগে না। আর সে ফুল কেউ ইচ্ছা করে নষ্ট করে তাহলে তার প্রতিটি পদক্ষেপই বিস্ময় হয় শহীদি ঈদগাহে ডা. মিজানুর রহমান তেমনি একটি ফুল যাকে সুরভি ছড়ানোর ঠিক আগ মুহূর্তে বাতিলের নির্মম বুলেটের আঘাতে ঝরে পড়েছে।

বাল্যজীবন
চাঁদপুর জেলার সদর থানার রামপুর গ্রাম। গ্রামের জনাব মুখলেছুর রহমান মজুমদার চট্টগ্রাম বন্দরে চাকুরী করতেন। থাকতেন বন্দরে। কলোনীর সরকারি বাসভবনে। তার স্ত্রী মিসেস রাসেদা বেগম। দুটো কন্যাসন্তান তাদের। তারপর ১৯৬৭ সালে মিসেস রাসেদা বেগমের কোলে নতুন একটি ফুটফুটে শিশু। বোন দুজনই পেল আদরের ভাইকে।

শিক্ষা জীবন
স্বাধীনতার পর ভর্তি করানো হয় বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক বিদ্যালয়য়ে। অল্প কিছুদিনের মাঝেই শিক্ষকসহ সকলের নজরে পড়লেন। প্রতিটি ক্লাসেই সাফল্যে স্বাক্ষর রাখেন মেধাবী ছাত্র হিসেবে। তিনি প্রতিটি ক্লাসেই প্রথম স্থান অধিকার করে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হলেন বন্দর কর্তৃপক্ষাধীন উচ্চ বিদ্যালয়ে সেখানেও তিনি তার পূর্বের অবস্থান ধরে রেখে ১৯৮৩ সালে কুমিল্লা বোর্ডে অধীনে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। তারপর ভর্তি হলেন শতাব্দীর সেরা বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম কলেজে। ইতোমধ্যেই তিনি ছাত্রশিবিরে যোগদান করে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

সংগঠনের পরামর্শ ও শিক্ষার সুন্দর পরিবেশের কারণে তিনি এইচএসসিতে আরও ভাল রেজাল্ট করেন। মানুষের প্রতি ভালবাসা তার সহজাত বৈশিষ্ট্য মানবতার সেবার মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি ভর্তি হলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। যখন তিনি চতুর্থ বর্ষের ছাত্র তখন চট্টগ্রামসহ সারা উপকূলীয় অঞ্চলে বয়ে গলে এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়। হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ল। অসুস্থ হয়ে মারা গেল অনেক লোক। তখনও পূর্ণ ডাক্তার হননি তিনি, তাই বলে মানুষের সেবা করার এমন সুযোগ তিনি হাত ছাড়া করেননি। তাছাড়া মানব সন্তানের কষ্ট সহ্য করার মত মন তার ছিল না।

তিনি তার সহপাঠী ও অন্য ছাত্রদের নিয়ে গড়ে তোলে চিকিৎসা টিম। লাশের পর লাশ পড়ে আছে, তারই মাঝে ক্ষুধাক্লিষ্ট ডায়রিয়া আক্রান্ত মানুষগুলো কাতরাচ্ছে। ডা. মিজান সেবা দিতে লাগলেন তাদের। মানুষের সেবার মাঝে তিনি নিজের কষ্টের কথা ভুলেই গেলেন। তার সঙ্গীরা অনেকবার হাল ছেড়ে বসে ছিলেন তিনি তাদের বুঝানোর চেষ্টা করেছেন, তাদের লক্ষ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে। দেড় বছর পর তিনি এমবিবিএস পাস করলেন। মানুষের সেবা করা থেকে তার পরিবার যেন বঞ্চিত না হয় সেজন্য তার ভাই বোনদের মেডিক্যালে ভর্তি করালেন। ১৯৯৩ সালে ৭ এপ্রিল তিনি ইন্টারনি শুরু করেন। ইন্টারনি পাশাপাশি তিনি দরিদ্র মানুষদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করতেন। তার অমায়িক ব্যবহারে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সকলে মাঝে পরিচিত হলেন দুঃখী মানুষের প্রিয়জন হিসেবে। মহৎ অন্তরের ডা. মিজানুর রহমান মানুষের কষ্টকে সহ্য করতে পারতে না। তাইতো তিনি অবসরে তাদের চিন্তা মগ্ন থাকতেন।

নব্য ফেরাউনদের তান্ডবে শিকার দু’বন্ধু
১৯৯৩ ডিসেম্বর ১৮ অক্টোবর। শান্তশিষ্ট মায়ের সাথে সকালের নাস্তা সেরে ১১টার সময় রুটিন মত বন্ধুদের সাথে তিনিও ওয়ার্ডে গিয়েছিলেন সেখানেই দেখা হল তার প্রিয় বন্ধু বোরহানের সাথে। কাজের ফাঁকে একটু চা পান করেন। সামান্য আড্ডা পত্রিকার পাঠক বন্ধুর সাথে সময় দান আবার ওয়ার্ডে গিয়ে উিউটি পালন, এরকম একটা পরিকল্পনা ছিল তার। বন্ধুরা যখন আসরে মেতেছেন ডা. মিজান, বোরহান, ফরিদ তখনও তারা জানেন না একটু পরেই ঘাতকের বুলেট ঝাঁঝরা করে দেবে তাদের বুক।

আগে থেকে লুকিয়ে থাকা চমেকসুর ভিপি, জিএস ফয়সাল ওরা হিংস্র হায়েনার মত ঝাঁপিয়ে পড়ল। তাদেরইে সহপাঠীদের রক্তের নেশায়। প্রথমে গুলির শব্দে হতচকিত হয়ে উঠেছিলেন সবাই। ডা. মিজানই প্রথম দরজার নিকটে আসলেন ভাই কেউ আহত হলো কিনা তা দেখার জন্য। কিন্তু দরজায় এসে তার ভুল ভেঙ্গে গেল। ঘাতকেরা তাদের দিকেই এগিয়ে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে। কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই লাশ হয়ে ঝরে পড়ল মিজান, বোরহান, ফরিদ। আহত বিএমএ চট্টগ্রামে সাধারণ সাম্পাদক ডা. খুরশিদ, জামিল চৌধুরী, ছাত্রদলের চমেক শাখার সভাপতি সেকান্দর হায়াতসহ আরো অনেকে। বর্বরোচিত হামলার পর নির্বিঘ্নে পালিয়ে গেল ঘাতকের দল। লাশ হয়ে ফিরলো ডা. মিজান। চট্টগ্রামসহ সারাদেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। শোকাহত হয়ে পড়ল যারা একবার ডা. মিজানের সাথে কথা বলেছিল তারা।

তার হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররাজনীতিতে পরিবর্তন এসেছিল। সারা দেশে বাম সংগঠনগুলো কখনও শিবিরের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেনি। কিন্তু ডা. মিজান হত্যাকাণ্ডের পর সে অসাধ্য সাধনা করেন। তিনি নিহত হওয়ার পর ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রশিবির শুধু একাত্মতাই ঘোষণা করেনি বরং জোটবদ্ধ হয়ে ছাত্রলীগকে চট্গ্রাম মেডিক্যাল কলেজে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিল। হাস্যোজ্জ্বল, নম্র, প্রতিভাবান মিজান কখনো অভদ্র দেখিয়ে কারো সামনে চলতেন না। 

শহীদের মায়ের প্রতিক্রিয়া
শাহাদাতের খরব শুনে তার মা পাগলপ্রায়। তার আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়েছিল। তার ছেলে সম্পর্কে তিনি বলেছেন যে, মিজান মেডিক্যাল কলেজে গেলো ফিরে এলো লাশ হয়ে। বিনাদোষে অকালে ঝরে গেল মিজান। আমার বুক খালি হয়েছে আর যেন কোন মায়ের বুক খালি না হয়। শাহাদাতের পর তৎকালীন চমেক অধ্যক্ষ ডা: নুরজাহান ভূঁইয়া বলেছিলেন, ক্লাসের পরীক্ষার হলে যে ছেলেটি মুখ দেখতাম প্রতিনিয়ত সেমুখ যেন আরও কাছের, আরও পরিচিত হয়ে উঠলো শ্বেতশুভ্র কফিনের মাঝে। মানব জীবনের অনিবার্য পরিণতি মৃত্যুকে মেনে নিয়ে আবির্ভূত হয়।

তবুও কোন ফুলেল প্রতিভা যখন.. হয়ে সুরভি ছড়ানো মুহূর্তে, তখন তা মেনে নিতে কষ্ট হয়, ডা. মিজানের এ নৃশংস মৃত্যুতে যে শুধু তার পরিবারের সদস্যরাই অসহনীয় শোকের সম্মুখীন হয়েছে তা নয়, দেশ বঞ্চিত হয়েছে একজন নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসকের সেবা থেকে। কয়েকবার জানাযা শেষে তাকে ইস্ট কলোনি কবস্থানে দাফন করা হয়। জানাযা পূর্ব সমাবেশে শহীদের ছোট ভাই বলেন, ওরা আমার মায়ের বুক খালি করেছে, আমার বাবার তিলে তিলে গড়া স্বপ্নসাধ ভেঙে চুরমার করেছে। আমরা এ হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। মৃত্যুতে যে অসহনীয় শোকের সম্মুখীন হয়েছে তা নয়, দেশ বঞ্চিত হয়েছে একজন নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক থেকে আজো বিচার হয়নি। একদিন সবুজ এই ভূখন্ডে কালেমার পতাকা উড্ডীন করার মাধ্যমে মিজান হত্যাসহ সকল শহীদ হবে।

এক নজরে শহীদ মিজানুর রহমান
নাম: ডা. মিজানুর রহমান
পিতার নাম : মোখলেছুর রহমান মজুমদার
সাংগঠনিক মান : কর্মী
শিক্ষার কৃতিত্ব : বারবার ক্লাসে প্রথম হওয়া।
কাদের আঘাতে শহীদ : ছাত্রলীগ।
আঘাতের ধরন ব্রাশফায়ার
শাহাদাতের তারিখ ১৮.১০.১৯৯৩
স্থায়ী ঠিকানা : রামপুর. ডাকঘর: কামরাঙ্গা, জেলার: চাঁদপুর
পড়াশুনা চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন ১৯৯২ সালে। পরবর্তীতে একই কলেজে ইর্ন্টানি করার সময় শাহাদাত বরণ করেন।

এক নজরে

পুরোনাম

শহীদ ডা. মিজানুর রহমান মিজান

পিতা

মোখলেছুর রহমান মজুমদার

জন্ম তারিখ

জানুয়ারি ১, ১৯৬৭

ভাই বোন

২ বোন ১ ভাই

স্থায়ী ঠিকানা

রামপুর, কামরাঙ্গা, চাঁদপুর

সাংগঠনিক মান

কর্মী

সর্বশেষ পড়ালেখা

ইন্টার্ন, এম বি বি এস, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ

শাহাদাতের স্থান

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ