শহীদ শওকত হোসেন তালুকদার

১৫ নভেম্বর ১৯৬৮ - ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯৫ | ৮১

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

শাহাদাতের ঘটনা

শহীদ শওকত হোসেন তালুকদার ১৯৬৮ সালের ১৫ নভেম্বর বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ থানার দুধল ইউনিয়নের ছোট কৃষ্ণকাঠী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম ইয়াকুব আলী তালুকদার একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে শহীদ হন। মাতা মোছা: লালবরু বেগম। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার একমাত্র পুত্র সন্তান। সবার ছোট শহীদ শওকত হোসেন তালুকদারের তিনবোন। তারা হলেন মিসেস নাছরিন আঞ্জুমান আলেয়া, নাজনীন আঞ্জুমান এবং লায়লা আঞ্জুমান মালা। তারা সকলেই বিবাহিতা। মা গ্রামের বাড়িতে না থেকে বোনদের সাথে বরিশালে থাকেন।

ঘটনার বিবরণ
তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন শহীদ শওকত হোসেন তালুকদার খুব অল্প বয়সে ভর্তি হলেন গোমা কৃষ্ণকাঠী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শিক্ষকবৃন্দের প্রিয় ছাত্র ছিলেন শহীদ শওকত। পঞ্চম শ্রেণী থেকে উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হলেন কে.জি. এস উচ্চবিদ্যালয়ে। স্কুলে মেধার স্বাক্ষর রাখলেন ৮ম শ্রেণীতে জুনিয়র বৃত্তি লাভ করার মাধ্যমে। পিতাহারা শহীদ শওকত হোসেন তালুকদারের ভগ্নিপতি ভাল ফলাফলে খুবই খুশি হলেন। তিনি নিজে দায়িত্ব নিয়ে ভর্তি করে দিলেন গারুরীয়া স্কুলে। গারুরীয়া স্কুলে তার মেধার আরও বিকাশ ঘটল। তিনি ৫টি বিষয়ে লেটারসহ প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন ১৯৮৪ সালে। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি খেলাধুলা, ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়নে মগ্ন থাকতেন। ভর্তি হলেন বরিশাল সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজে। সেখান থেকে ১৯৮৬ সালে এইচ.এস.সি পাস করেন। জীবনে বড় হবার স্বপ্ন নিয়ে দুঃখিনী মায়ের একমাত্র পুত্রসন্তান শওকত হোসেন তালুকদার ভর্তি হলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮৬-৮৭ সেশনে। তার ভগ্নিপতি হৃদয়ের ভালবাসা উজাড় করে তাকে ভালবাসতেন। তিনি তার পড়াশুনার খরচ বহন করতেন। শহীদ শওকত হোসেন তালুকদার ছিলেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের শেষ বর্ষের ছাত্র। ভগ্নিপতি এবং দুঃখীনি মায়ের বড় আশা ছিল তিনি বিশ্ববিদ্যালয় হতে একটি চাকরি নিয়ে বের হবেন। কিন্তু তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে গেলেন কোনো চাকরি নিয়ে নয়, শাহাদাতের সার্টিফিকেট নিয়ে।

জীবনে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলা আর কুরআনের রাজ কায়েম করার দীপ্ত শপথ নিয়ে সমবেত হলেন শিবিরের ছায়াতলে, সমর্থক হন ১৯৮৫ সালে। কোরআনের রাজ কায়েমের পতাকাবাহী সংগঠনের কর্মী হন ১৯৮৮ সালের জুলাই মাসে। নিজেকে গঠন করার প্রতি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। অল্পসময়ের ব্যবধানে ১৯৮৮ সালের ১৯ নভেম্বর সাথী হলেন এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৯৩ সালে ১৬ নভেম্বর সদস্য শপথ নিয়ে নিজেকে সংগঠনের কাক্সিক্ষত মানে উন্নীত করেন। অপরিচিতদের সাথে পরিচিত হওয়ায় সদা তৎপর শওকত সদা ব্যস্ত থাকতেন দ্বীনের পথে দাওয়াতি কাজে। তিনি শাহাদাতের পূর্ব পর্যন্ত শহীদ নাজমুল আহসান হলের সভাপতি এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক ছিলেন।

অত্যন্ত মিশুক ছিলেন শওকত হোসেন তালুকদার। যিনি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে অত্যন্ত চেনামুখ ছিলেন। যিনি সবার কাছ থেকে ভালবাসা আদায় করতে জানতেন। সেই শওকত হোসেন তালুকদারের পিতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭১ সালে নিহত হন। বিধাব মায়ের একমাত্র ভরসার শেষ সম্বল শওকতকে হারিয়ে তিনি যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। তিনি বারবার কেঁদে কেঁদে বলছেন; আমার শওকতকে কেন হত্যা করা হলো, কী অপরাধ করেছিলো আমার শওকত? আমার ছেলেতো কোনদিন কারও সাথে ঝগড়া করেনি। কেন তাকে শহীদ করা হলো? সে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তো। অন্যদেরকে ভাল কাজ করতে বলতো। এসব কাজ করা কি তার অপরাধ? তিনি নিজেকে কখনই সান্ত্বনা দিতে পারছেন না। তিনি দেশবাসীর কাছে জানতে চান, এভাবে কত মাকে আর কষ্ট দেয়া হবে? কত মায়ের বুক খালি করা হবে? তিনি মহান আল্লাহর কাছে তাঁর পুত্রের হত্যাকারীদের বিচার চান।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের করিম ভবন আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আবুল খায়ের মুন্সী বলেন; ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯৬ দিবাগত রাতে শওকত হোসেন তালুকদার ও মঞ্জুরুল কবীরের শাহাদাতের পর করিম ভবনের যে এলাকায় কিছুক্ষণের জন্য দু’টি লাশ রাখা হয়েছিল তার পাশ দিয়ে আমি এশার নামাজ পড়ার জন্য মসজিদের দিকে যাচ্ছিলাম। এমন সময় সুঘ্রাণ পেলাম যা জীবনে কোনোদিন আমি অনুভব করিনি। পরের দিনও একই স্থান দিয়ে বাজারে যাওয়ার সময় একই ঘ্রাণ পেলাম। ভাল করে লক্ষ্য করলাম যে, অন্য কোথাও থেকে এই সুঘ্রাণ আসছে কিনা, কিন্তু না, লাশ দু’টি যে স্থানে রাখা হয়েছে ঠিক সেই স্থান থেকে সুগন্ধ ভেসে আসছে। ভাবলাম এর আগে কত রাতে কত দিনে এই পথে হেঁটেছিলাম কিন্তু কোনোদিন এমন ঘ্রাণতো অনুভব করিনি। তখন মনে হলো সাহাবীদের কথা। শহীদের মর্যাদার কথা। শহীদরা যে জান্নাতে মিশকে আম্বরের সুঘ্রাণ পাবে তার কথা। তাই শওকত, মঞ্জুরুল ও আলাউদ্দিনের মুত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু হতে পারে না। এই মৃত্যু অবশ্যই শাহাদাতের মৃত্যু। কেউ বিশ্বাস করুক আর না করুক আমি তা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. আবদুল করিম বলেন; শওকত হোসেন তালুকদার আমার অনুষদের ছাত্র ছিল। তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিক থেকে আমার সাথে পরিচয়। যেদিন তার সাথে আমার পরিচয় হয়েছে সেদিনই তার চেহারা ও কথা-বার্তায়, সহজ-সরলতা ও বিনয়ীভাব প্রত্যক্ষ করেছি। ক্লাসেও তাকে একজন শান্তশিষ্ট, ভদ্র ও সুবোধ ছাত্র হিসেবে দেখেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ৫ বছর জীবনে শুধু আমার সাথে নয়, অনেক শিক্ষকের সাথেও তার দেখা হয়েছে, আলাপ হয়েছে, কিন্তু কেউ তার আচরণে কোন উচ্ছৃঙ্খল ভাব পেয়েছে বলে আমার জানা নেই। একজন ধার্মিক ছেলে হিসেবে তাকে বিভিন্ন মসজিদে শুধু নামাজ পড়তেই দেখিনি, ইসলামকে জানা ও বুঝার ক্ষেত্রেও তার আগ্রহ উচ্ছ্বাস আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। এমন ছাত্রকে হারানোর বেদনা কোনো শিক্ষক কেন, যে কোনো মানুষ সহজে মেনে নিতে পারে না। তার শোক-সন্তপ্ত বিধবা মাতা ও বোনদের ধৈর্যধারণ করার তৌফিক দান করুন আল্লাহর কাছে সেটাই প্রার্থনা করি।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী সমিতির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ লিয়াকত হোসেন বলেন; ‘ইসলামী ছাত্রশিবিরের ছেলেদের হল থেকে বের করে দেয়ার কিছু দিন পর শওকত হোসেন তালুকদার আমাদের বাড়িতে আসে। শিবিরের ছেলেদের খাওয়া, গোসল করাতো দূরের কথা, রাতে ঘুমানো জায়গা পর্যন্ত ছিল না। সহায়সম্বলহীন মানুষের মতো দ্বারে দ্বারে ঘুরে আশ্রয় চাওয়ায় আমার মনের ভেতরে প্রচণ্ড আঘাত লাগল। এমনি এক সময় শওকত আমার কাছে থাকার জন্য আশ্রয় চাওয়াতে আমি তাকে অনুমতি দিতে গিয়ে বললাম; আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আপনার থাকার জন্য ভাল জায়গা দরকার। কিন্তু আমারতো আপনাকে রাখার মতো কোনো আলাদা ভাল জায়গা নেই। তবে আপনি যদি রাজি থাকেন, তাহলে আমার গোয়াল ঘরের মাঝখানে বেড়া দিয়ে একদিকে গরু আর অন্যদিকে আপনি থাকতে পারেন। আমি লক্ষ্য করলাম, সে আমার প্রস্তাব এত সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করলো যা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। কারণ, তার মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। শাহাদাতের কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত সে আমার গোয়াল ঘরে গরুর সাথে থেকেছিল। (এসব কথা বলতে বলতে তার কণ্ঠে কান্নার ঢেউ এসে যায়)। শওকত হোসেন এলাকার ছেলেদের নামাজে ডাকত, কোরআন শিক্ষা দিত। এমনকি নিজেও আমি তার কাছে কোরআন পড়া শিখি। আমার কোরআন শিক্ষার ব্যাপারে আমার চেয়ে তার আগ্রহ ছিল বেশি।

শওকত হোসেন আমাদের বাড়িতে অনেকদিন আসতো। কয়েকদিন না আসলে বা বেশি বিরতি দিয়ে আসলে মনটা খারাপ হয়ে যেত। তার মত সহজ-সরল, চরিত্রবান ছেলে আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। আমার ছেলে আমি ভাল ছেলে বলে জানতাম, কিন্তু শওকতকে দেখেছি তার চেয়েও ভাল। সে দূরে থেকে আমাকে হাদিসের কথা শুনাতো, পর্দার গুরুত্ব বোঝাতো। যদি শওকত অন্ধ হয়েও বেঁচে থাকতো তাহলে তার মা এই বলে সান্ত্বনা পেত যে, আমার ছেলে বেঁচে আছে। এখন তার বিধবা মা কি বলে সান্ত্বনা পাবে? আমার অনেক রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় মারা গিয়েছে কিন্তু ২-৪দিন পরেই ভুলে গিয়েছি। শওকত মারা গিয়েছে প্রায় এক বছর পূর্বে, কিন্তু আজও তার কথা মনে পড়লে অজান্তেই মনের ভিতর দুঃখের এক পাহাড় এসে ধাক্কা দেয়।

একনজরে শহীদ শওকত হোসেন তালুকদার
নাম : শওকত হোসেন তালুকদার
পিতার নাম : শহীদ ইয়াকুব আলী তালুকদার (মুক্তিযুদ্ধে শহীদ)
সাংগঠনিক মান : সদস্য
দায়িত্ব : ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক ও নাজমুল আহসান হল সভাপতি
সর্বশেষ পড়াশোনা : শেষ বর্ষ, কৃষি অনুষদ
সর্বশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান : বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষায় বিশেষ কৃতিত্ব : এসএসসি (১৯৮৪), ৫ বিষয়ে লেটারসহ প্রথম বিভাগ
এইচএসসি (১৯৮৬), প্রথম বিভাগ
আহত হওয়ার স্থান : বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্বের এক বাড়িতে
শহীদ হওয়ার স্থান : বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্বের এক বাড়িতে
আঘাতের ধরন : লাঠি, ছোরা, পরে ইটের উপর মাথা রেখে ইট দিয়ে আঘাত করে জ্বলন্ত চুলাতে নিক্ষেপ।
যাদের আঘাতে শহীদ : ছাত্রদল/ছাত্রঐক্য (ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্রলীগ)
শহীদ হওয়ার তারিখ : ১৬.১২.১৯৯৫ ইং
যে শাখার শহীদ : কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম- ছোট কৃষ্ণকাঠী, বাকেরগঞ্জ, বরিশাল।
ভাইবোন : ১ ভাই (নিজে), ৩ বোন
পরিবারের মোট সদস্য : ৪ জন
পিতা : মুক্তিযুদ্ধে শহীদ
মাতা : জীবিত, পেশা-গৃহিনি।

এক নজরে

পুরোনাম

শহীদ শওকত হোসেন তালুকদার

পিতা

শহীদ ইয়াকুব আলী তালুকদার

মাতা

মোছা: লালবরু বেগম

জন্ম তারিখ

নভেম্বর ১৫, ১৯৬৮

ভাই বোন

১ ভাই (নিজে), ৩ বোন

স্থায়ী ঠিকানা

গ্রাম- ছোট কৃষ্ণকাঠী, বাকেরগঞ্জ, বরিশাল।

সাংগঠনিক মান

সদস্য

সর্বশেষ পড়ালেখা

শেষ বর্ষ, কৃষি অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

শাহাদাতের স্থান

বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্বের এক বাড়িতে


শহীদ শওকত হোসেন তালুকদার

ছবি অ্যালবাম: শহীদ শওকত হোসেন তালুকদার


শহীদ শওকত হোসেন তালুকদার

ছবি অ্যালবাম: শহীদ শওকত হোসেন তালুকদার