শহীদ মুহাম্মদ আল-মামুন

৩০ নভেম্বর -০০০১ - ০১ নভেম্বর ১৯৯৮ | ৯৮

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

শাহাদাতের ঘটনা

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় দেশের তৌহিদী জনতার দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীর রক্তঝরা আন্দোলন ফসল। এ বিদ্যাপীঠকে তার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করার জন্যে শুরু থেকেই ইসলামবিদ্বেষী ব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তি হাজারো ষড়যন্ত্রের বীজ বপন করেছে। শাসকগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ইসলামবিরোধী, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল আদর্শ পরিপন্থী নিয়োগ দান করে সেই ষড়যন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান থেকে এ বিদ্যাপীঠে মুক্তিকামী ছাত্রজনতার হৃদয়ের স্পন্দন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ছাত্রজনতার প্রতিনিধিত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বীনি চরিত্র ধ্বংসের জন্যে ইসলামবিদ্বেষী শক্তি বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পরিকল্পিত সন্ত্রাসের নেশায় মেতে উঠে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যেই তার প্রতিষ্ঠার ২৩ বছর অতিক্রম করেছে। এ স্বল্প সময়ে খোদাদ্রোহী শক্তির পরিকল্পিত সন্ত্রাসে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ইঞ্চি সবুজ জমিন রক্ত লালে রঞ্জিত হয়েছে। ৫ জন মেধাবী ছাত্রের শাহাদাদের নজরানা পেশ, অসংখ্য ছাত্রের বুলেটবিদ্ধ দেহ নিয়ে মৃত্যুর প্রহর গোনা, হাত, পা, চক্ষু হারানোর বেদনাসহ ক্যাম্পাসের সবুজ জমিনের উপর শহীদি রক্তের ছোপ আজো অতীতের বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া নারকীয় তাণ্ডবতার নৃশংস ঘটনার নীরব সাক্ষী। ৩১ অক্টোবর ’৯৮ ছিলো ইতিহাসের আরেক ভয়াবহ কালো অধ্যায়। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যোগসাজশে আওয়ামী ছাত্রলীগ ক্যাম্পাস দখলের অভিপ্রায়ে হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠে। নির্বিচারে গুলিবর্ষণে শহীদ হন শিবির নেতা আল মামুন ও মুহসিন কবির। একদিকে পুলিশী তাণ্ডবতা অন্যদিকে আওয়ামী ছাত্রলীগের শত শত রাউন্ড গুলিবর্ষণে কিছুক্ষণের মধ্যেই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাস দ্বীনের পতাকাবাহী শিবির কর্মীদের রক্তে রঞ্জিত হয়।

ঘটনার সূত্রপাত
১৯৯৫ সালের ২৮ এপ্রিলের এক ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলায় গেফতার করা হয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি এ.ডি.এম ইউনুস ও আসাদুজ্জামানকে। ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার জন্যে এটা ছিলো ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গভীর ঘৃণ্য নীল নকশা। এরূপ পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে বিশ্ববিদ্যালয় সংগঠন সকল দায়িত্বশীল ভাইকে সতর্কভাবে চলাফেরা জন্য পরামর্শ দেন। এ দিকে ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় কুষ্টিয়া শহর থেকে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে পূর্ব থেকে ওঁৎ পেতে থাকা পুলিশ গ্রেফতার করে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি মুহাম্মদ নজরুল ইসলামকে। গেফতারের সংবাদ মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে। কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ শহরসহ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গ্রেফতারের প্রতিবাদে ৩১ অক্টোবর ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ, পরদিন ১ নভেম্বর ক্যাম্পাসে সর্বাত্মক ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। ঘোষিত কর্মসূচি মোতাবেক ৩১ অক্টোবর বেলা ১১ টায় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থান থেকে খণ্ড খণ্ড প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয। গগনবিদারী প্রতিবাদী শ্লোগানে প্রকম্পিত হলো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। প্রতিবাদ মিছিল শেষ করে ক্যাম্পাস করিডোরে অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে পূর্ব ঘোষিত ১ নভেম্বরের ছাত্রধর্মঘটের কর্মসূচি সফল করার জন্য আহবান জানানো হয়। এ দিকে ছাত্রলীগের হায়েনার ধর্মঘটের বিপক্ষে উত্তেজনাকর শ্লোগান দিয়ে ক্যাম্পাস উত্তপ্ত করে তোলে। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী মিছিল শিবির কর্মীদের অবস্থান বরাবর চক্কর দিতে থাকে। এ পরিস্থিতিতেও নেতৃবৃন্দের নির্দেশে শিবির কর্মীরা সীমাহীন ধৈর্যের পরিচয় দেয়। খুনের নেশায় উন্মাদ ছাত্রলীগ হায়েনারা শিবির নেতা মোয়াজ্জেমের উপর হামলা করে বসে। মারাত্মকভাবে আহত মোয়াজ্জেম ভাইকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে যায় শিবিরকর্মীরা। এক পর্যায়ে পিছু হটতে বাধ্য হলো সন্ত্রাসীরা। শতাধিক বহিরাগত সন্ত্রাসীসহ আওয়ামী ছাত্রলীগ হায়েনারা প্রশাসন ভবনস্থ সম্মুখ চত্বরে পুলিশের সহযোগিতায় অবস্থান নেয়। বেলা আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ শিবিরকর্মীদের অনুষদ ভবন ও ক্যাম্পাস থেকে জোরপূর্বক হলের দিকে চলে যেতে বাধ্য করে। শহীদি কাফেলার বিশাল মিছিল সবুজ চত্বরের সামনে দিয়ে সাদ্দাম হলের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে ছাত্রলীগ ও পুলিশ যৌথভাবে মিছিলের উপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে। আওয়ামী কর্মীদের মতো পুলিশ বাহিনী ও ছাত্রলীগ হায়েনাদের নৃশংস গুলিবর্ষণে মারাত্মকভাবে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন শিবির নেতা আল মামুন, নাজিমুদ্দীন এমদাদুল্লাহসহ আরো অনেকে। মারাত্মকভাবে বুকে গুলিবিদ্ধ শিবির নেতা আল মামুনকে ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পরদিন ভোরে মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে শাহাদাত বরণ করেন আল মামুন। ছাত্রলীগ ও পুলিশের নৃশংসতা এখানেই থেমে থাকেনি। ভয়াবহতা ক্রমে বৃদ্ধি পেতে থাকে। পুলিশ নিরীহ শিবির কর্মীদের উপর বেপরোয়া লাঠিচার্জ ও গ্যাস সেল নিক্ষেপ করে সাদ্দাম হলের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। সাদ্দাম হল দখলের ব্যর্থ অভিলাষে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা পুলিশের সহযোগিতায় হলের সামনে অবস্থানরত নিরীহ শিবিরকর্মীর উপর শত শত রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। পুলিশ ও ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের যৌথ গুলিবর্ষণে এক পৈশাচিক ও নজিরবিহীন দৃশ্যের অবতারণা হয়। প্রায় কয়েক ঘন্টাব্যাপী চলতে থাকে এ তাণ্ডবলীলা। শহীদ মুহসিন কবিরসহ নিরীহ ছাত্রদের করুণ আর্তচিৎকারে হল গেটে সৃষ্টি হয় এক করুণ পরিস্থিতির। খুনিদের গুলি আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায় প্রিয় ভাই মুহসিনের বুকের পাঁজর। তাৎক্ষনিকভাবে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে নেয়ার পর শহীদের সাথীদেরকে শোক সাগরে ভাসিয়ে মুহসিন কবির শাহাদাতের পেয়ালা পান করেন।

আওয়ামী শাসনামলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিবির হারিয়েছে প্রখর মেধাবী, শিবির নেতা আমিনুর রহমান, আল মামুন, মুহসিন কবির ও রফিকুল ইসলামকে। চিরদিনের জন্য চক্ষু হারালেন শিবির নেতা মামুনুর রশীদ। হায়েনাদের বুলেটের নির্মম আঘাতে ক্ষত বিক্ষত দেহ নিয়ে ক্যাম্পাসে পদচারণা অসংখ্যা নিরপরাধ শিবির কর্মীরা। ’৯৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ’৯৯ সালের এ পর্যন্ত সীমাহীন জুলুম নির্যাতনের শিকার ইবির হাজারো ছাত্র-জনতার প্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। পুলিশ প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে খুনি চক্রের গোপন আঁতাত আজ দিবালোকের মত পরিষ্কার। আজও গেফতার করা হয়নি একজন খুনিকেও। অথচ খুনিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে দম্ভ সহকারে। পাঁচজন শহীদের খুনিদের সাথে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাথে যৌথ বৈঠক দেখতে দেখতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সচেতন সদস্যরা রীতিমত হতবাক। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। ইবির প্রতি ইঞ্চি সবুজ জমিন শহীদের সাথীদের রক্তে রঞ্জিত। শহীদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে বজ্র কঠোর শপথে আবদ্ধ হাজারো শিবিরকর্মী। পাঁচজন শহীদের রক্তস্নাত আর অসংখ্য ভাইয়ের সীমাহীন ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে তিলে তিলে গড়া এ ক্যাম্পাসের প্রতি ইঞ্চি সবুজ জমিনকে প্রতিনিয়ত আমরা দ্বীনের জন্য উর্বর করবোই। চিরদিন সমুন্নত রাখবোই পতপত করে উড়তে থাকা শহীদের রক্তমাখা দ্বীনের পতাকাটিকে। হাজারো ষড়যন্ত্র মাড়িয়ে কদম কদম করে ইবির ক্যাম্পাসে শহীদের সাথীদের পথচলা। অসংখ্যা ষড়যন্ত্র, হাজারো রাউন্ড গুলি, হাত, পা, চক্ষু হারানোর নীরব দৃশ্যসহ কোন কিছুই শহীদের সাথীদের পথ চলা থামাতে পারেনি। বরঞ্চ সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মত ক্রমশ বেগমান হচ্ছে এ শহীাদ কাফেলা। হাজারো শিবির কর্মীর মুখে নারায়ে তাকবীর ধ্বনি হয় উচ্চারিত। প্রকম্পিত শ্লোগানে বাতিলের ভিত কেঁপে ওঠে। ক্যাম্পাস থেকে পালাতে উদ্যত হয় আবু জেহেল, আবু লাহাব আর নমরুদের উত্তরসূরিরা। শহীদ আমিন, মামুন, মুহসিন, আল মামুন ও রফিকুল ইসলামের দেখানো শাহাদাতের তামান্না নিয়ে দাওয়াতি কাজে মশগুল শহীদের সাথীরা। তাঁদের রেখে যাওয়া জিম্মাদারি পালনই শিবির কর্মীদের একমাত্র ব্রত।

তাইতো দাওয়াতি কাজের এ পেরেশানিকে নিয়ে পথ চলতে দেখা যায় আল মামুন ও মুহসিন কবিরের উত্তরসূরিদের। খুনি, জালিম চক্রের শেষ নিশানা মোছা অবধি শহীদের সাথীদের এ মিশন এক মুহূর্তের জন্যও থামবে না। শহীদ আল মামুন ও মুহসিন কবিরের রক্তের বিনিময়ে অজস্র তরুণ যারা এ কাফেলায় শামিল হয়ে তাঁদের রেখে যাওয়া দায়িত্ব পালনে ব্যাকুল তারাও আজ নতুন শপথে বলীয়ান। খুনি জালিমদের মৃত্যুঘন্টা বাজবেই মোদের হাতে। আমীর হামজা, হানযালা, খাব্বাব-খোবায়েব, বেলালের উত্তরসূরি মামুন, আমিন, মুহসিন, ও রফিক। তাদের পথ বেয়ে আমরাও এগিয়ে যাচ্ছি আমাদের চূড়ান্ত মঞ্জিলের দিকে। পৃথিবীর কোন শক্তি বিন্দু পরিমাণ টলাতে পারবে না আমাদের চলার মনজিল থেকে। শাহাদাতের তামান্না বুকে ধারণ করে আমরা ছুটছি ঐ জান্নাতের দিকে যা আমাদের চলার শেষ মনজিল। আমাদের নির্ভীক পথ চলা থামবে না কোনদিন। বাধার পাহাড় মাড়িয়ে এগিয়ে যাবই প্রতিদিন।

একনজরে শহীদ মুহাম্মদ আল মামুন
নাম : মুহাম্মদ আল মামুন
পিতা : মৃত আবদুল আজিজ
মাতা : শামছুন্নাহার
ঠিকানা : বাকশিমুল, বুড়িচং, কুমিল্লা
ভাইবোন : ৩ ভাই ৫ বোন (তিনি সর্বকনিষ্ঠ)
জন্ম তারিখ :
একাডেমিক যোগ্যতা : ১ম বর্ষ দাওয়া ইসলামিক স্টাডিজ অধ্যয়ন (ইবি), আলিম ১০ বিভাগ, দাখিল ১ম বিভাগ
সর্বশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান : ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
সাংগঠনিক মান : সদস্য প্রার্থী, শৈলকুপা থানা সভাপতি
ঘটনার বিস্তারিত : ক্যাম্পাসে মিছিলে ছাত্রলীগের অতর্কিত হামলায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত অবস্থা হাসপাতলে নেয়।
যাদের আঘাতে শহীদ: ছাত্রলীগ
আহত হওয়ার তারিখ : ৩১-১০-৯৮
স্থান : ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সবুজ চত্বর
শহীদ হওয়ার তারিখ : ০১-১১-১৯৯৮
শিক্ষাজীবন : ১৯৯৫ সালে দাখিল পাস, ১৯৯৭ সালে প্রথম বিভাগে আলিম পাস, ১৯৯৭-৯৮ শিক্ষাবর্ষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়াহ বিভাগে ভর্তি হন।
সাংগঠনিক জীবন : ১৯৯৪ সালের ২৪ জুন শিবিরে যোগদান করেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সাথী হন। সর্বশেষ সদস্যপ্রার্থী থাকাবস্থায় শাহাদাত লাভ করেন।
শহীদ হওয়ার স্থান : ইবনে সিনা ক্লিনিক, ঢাকা
যাদের আঘাতে আহত : আওয়ামী লীগ
কবর যেখানে : পারিবারিক গোরস্থান
যে শাখার শহীদ: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
শখ : বই পড়া

আত্মীয়স্বজনের প্রতিক্রিয়া
তৎকালীন স্থানীয় দায়িত্বশীল শহীদ আল মামুন ভাই-এর চাচাত ভাই মো. কবির হোসেন এর মতে তিনি অত্যন্ত প্রতিভাবন ছাত্র ও মিশুক ছিলেন। হাসিমুখে কথা বলা ছিল নিজ অভ্যাস। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পূর্ণ খুলুছিয়াত ও সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে কাজ করতেন। একজন পরিপূর্র্ণ দায়িত্ব ইলাল্লাহ তার ব্যবহার ফুটে উঠেছে।

বাবা-মার প্রতিক্রিয়া
শহীদ আল মামুন আমাদের ৮ সন্তানের সবার ছোট হওয়ায় সে ছিল খুব আদরের। ইবিতে ভর্তি হতে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরে আসে যা ছিল পরিবারের জন্য খুবই কষ্টদায়ক।

পাঠাগার
শহীদ আল মামুন স্মৃতি পাঠাগার নমে বুড়িচং সদর ও বাকশীমুল গ্রামে ২টি পাঠাগার রয়েছে।

মোবারক হোসেন ভুইয়া (শহীদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু)
প্রতিটি সৃষ্টিই ধ্বংসশীল। এই পৃথিবীও চিরদিনের নয়। ধ্বংস হয়ে যাবে সে নিজে এবং তার মাঝে বসবাসরত প্রতিটি প্রাণী। প্রতিটি মানুষ মৃত্যুর দূতের সাথে সাক্ষাৎ প্রতিটি মানুষের জন্য এক অবিশ্যম্ভাবী সত্য। তার হাত থেকে কেউ রেহাই পায়নি। পাবেও না কখনও। কিন্তু কোন কোন মানুষ চিরদিন বেঁচে না থাকলেও তাঁর স্মৃতিগুলি বেঁচে থাকে। পরবর্তী প্রজন্মের নিকট তাঁর অসংখ্য স্মৃতির কারনে বেঁচে থাকেন বহু বছর, বহু যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। স্মৃতি-বিস্মৃতির রোমাঞ্চতার মাঝেই বুঝি টিকে আছে পৃথিবী। কিংবা বেঁচে থাকলে অন্যদিকাল যাবৎ। শহীদ আল-মামুন তেমনি একটি নাম। একটি প্রাণ, একটি স্মৃতি, বিকশিত একটি প্রতিভা কিংবা ফুটন্ত একটি গোলাপ। যা বারবার দোলা দিয়ে যায় অসংখ্য ব্যথাতুর হৃদয়পটে।

১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর বুড়িচং থান সাথী শাখার এক শিক্ষা বৈঠকে মামুন ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। ইতঃপূর্বে জেলার শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান সাজ্জাত হোসেন সাহেবের ছোট ভাই আল-মামুন শিবিরের অগ্রসর কর্মী সে সংবাদটুকু শুনেছিলাম। পরিচয়ের সুযোগ তখনও পাইনি। সেদিনকার প্রোগ্রামে সুযোগ পেয়ে পরিচিত হয়ে গেলাম। সে এক মহাশান্তি; দীর্ঘ দিনের প্রত্যাশা পূর্ণ হওয়া, সেদিন থেকে থানা শাখার বিভিন্ন প্রোগ্রামে উঠে ছিল অদৃশ্য সুতোর এক সুগভীর বন্ধন। সে সুতো কখনও ছিঁড় যাবার নয়। কিন্তু আকস্মাৎ গর্জনবিহীন ঝড়ে ছিঁড়ে গেল সে সুতো। দু’টি অংশের একটি চলে গেল কোন অজানা-অচেনা কণ্টকাকীর্ণ মরু পথ ধরে।

বড় শূন্য হয়ে গেল আমার হৃদয়। তাকে খুঁজি আর প্রতিটি শিক্ষা বৈঠকে, থানা শাখার বিভিন্ন সাধারণ সভায়। থানা শিবিরের কার্যালয়ে, যেখানে বসে বসে তিনি প্রোগ্রাম পরিচালনা করতেন। আর তাঁর অসংখ্য স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহ্যবাহী বাকশীমূল গ্রামের চেয়ারম্যান বাড়ির প্রাচীর ঘেরা দেয়ালের ভেতরে। শিশুকাল-বাল্যকাল পেরিয়ে যেখানে তিনি তারুণ্যে পর্দাপণ করেছেন।

কিন্তু না! কোথাও তিনি নেই; শূন্য-শূন্য আজ পৃথিবী; শূন্য সব কিছুই। যখনওই তাঁর কথা মনে পড়ে তখনই মনে কেমন যেন শিহরণ লেগে উঠে। সে এক বেদনার্ত শিহরণ, হঠাৎ বুকটা টন-টন করে উঠে। কখন যে চোখ দু’টি ঝাপসা হয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু বেয়ে পড়ে।

আমি যখন খাড়াতাইয়া শাখা সভাপতি, মামুন ভাই তখন বুড়িচং সদর থানার সভাপতির দায়িত্বে নিয়োজিত। আমার শাখার এক প্রোগামে থানা মেহমান হিসেবে গেলাম। আমরা তখন প্রস্তুত হয়ে মেহমানের অপেক্ষায় ছিলাম। ৪/৫ মিনিট দেরি হয়ে গেল। ইতোমধ্যে তিনি সাইকেল যোগে প্রোগ্রামে হাজির হলেন। মুখে তাঁর স্বভাবসুলভ হাসি। বলেই ফেললেন একটু দেরী হয়ে গেল বুঝি। দেরি হওয়ার কৈফিয়ত আপনা-আপনিই বলতে লাগলেন। এটাই ছিল তাঁর অকৃত্রিম দায়িত্বানূভূতি।


১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর। মামুন ভাই কেন্দ্রীয় কন্টাক্টে গেলেন। বুক ভরা আশা সদস্য প্রার্থী হবেন। ঠিক তাই হল। আমাকে চিঠিতে লিখলেন “মোবারক ভাই! অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানাচ্ছি আমি সদস্য প্রার্থী হয়েছি। দেখা করতে পারলে ভাল ছিল। কিন্তু অসুস্থতার কারনে পারিনি বলে দুঃখিত দোয়া করবেন যাতে সুস্থ হয়ে আপনাদের সাথে মিলিত হতে পারি।” এ ছিল তাঁর চিঠি লিখার হৃদয় কাড়া ভাষা।


থানা শাখার বিভিন্ন মিছিলে তিনি নেতৃত্ব দিতেন। মিছলেন শ্লোগান ধরতেন শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে। শাহাদাতের প্রতিবাদে মিছিল চলছে। মিছিল যখন থানা পরিষদ চত্বরে পৌঁছল তখন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের সাথে শুরু হল কথাকাটাকাটি। এক পর্যায়ে তা হাতা-হাতিতে রূপ নিল। মামুন ভাই ছিলেন সেদিন সবার সামনে। বীরদর্পে মোকাবেল করে ছিলেন খোদাদ্রোহীদের। প্রিয় ভাইটি একদিন চলে গেল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। দা’ওয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হলেন। শুরু হল তাঁর ইউনিভার্সিটির জীবন। তবে না! সে সুখময় জীবন দীর্ঘ হল না। হঠাৎ কোন এক তুফানে ভেঙে দিল সে সুখের নীড়।

৩১ অক্টোবর ই.বির শান্ত ক্যাম্পাস। শিবিরের মিছিল চলছে শান্তিপূর্ণ ভাবে। শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হচ্ছে পুরো ই.বি অঙ্গন বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে সাধারণ ছাত্র জনতা ও শিবির কর্মীরা। সে এক বিশাল জনসমুদ্র। এ দৃশ্য সহ্য হল না বর্বর হায়েনাদের। ঝাপিয়ে পড়ল নিরীহ ছাত্র জনতার উপর। ছাত্রলীগ নামধারী রক্ত পিশাচ, নরপশুদের বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে গেল হাস্যোজ্জ্বল মুখটি। পরদিন পহেলা নভেম্বর বেলা ১১.২০ মিনিটে ঢাকা ইবনে সিনা ভুবনে। মুহূর্তের মাঝে সেই সংবাদটুকু ছড়িয়ে পড়তেই গাঢ় অমানিশা যেন পৃথিবীকে গ্রাস করে নিল। সবার চোখের অশ্র“; প্রিয়জন হারা আর্তনাদ। বিশেষ করে শহীদের মায়ের মানিক হারানোর আর্তনাদে যেন খোদার আরশ কেঁপে উঠেছিল।


নিজ এলাকায় শাহাদাতের সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হল থানা পরিষদ চত্বরে। শহীদের অসংখ্য সাথী ঝাঁকে ঝাঁকে মিলিত হল শেষ বারের মত প্রিয় মুখটি দেখার মানসে। রাত্র ১২.৩০ মিনিটে অনুষ্ঠিত হয় সালাতে জানাজা। শহীদের কফিন যখন আপন নীড়ে গেছে তখন মাত্র ১টা। সেখানে উপস্থিত হয়েই দেখি অন্তত ২/৩ হাজার মানুষ শহীদের লাশের অপেক্ষায়। যানাজা সহ দাফন সম্পন্ন হতে রাত্র দুইটা বেজে গেল। তখনও শহীদের অসংখ্য সাথী বেহুঁশ হয়ে আছে। কারো মাথায় পানি দেয়া হচ্ছে। জ্ঞান ফিরলেই আবার চিৎকার দিয়ে ফিট হয়ে যাচ্ছে। সেদিনকার এই হৃদয় বিদায়ক দৃশ্যের অবতারণায় অসংখ্য অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলেও আওয়ামী দস্যুদের হিংস্র হৃদয় কেঁপে উঠেনি।

শহীদ আল-মামুন আজ নেই। কিন্তু তাঁর স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে। তাই পৃথিবীর মানুষ তাকে ভোলেনি। তেমনি আমিও ভুলতে পারিনি। তাইতো সেদিন সুবহে সাদিকে ঘুমের ঘোরে তাকে কাছে পেলাম। দেখছি তার কফিন আমার সামনে। তখন আমি বুড়িচং থানা সভাপতির দায়িত্বে আছি। পাশেই দেবিদ্বার থানা সভাপতি গিয়াসউদ্দিন ভাই। তিনি শহীদের চেহারা থেকে কাপড় সরিয়ে হাত বুলাচ্ছেন। তৎক্ষণাৎ শহীদ আল মামুন উঠে বসে গেলেন, আর বলতে লাগলেন, তোমরা আমাকে মৃত ভেবেছ। আমিতো মরিনি। সাথে সাথেই কান্নার রোল পড়ে যায়। উপস্থিত সবার চোখেই পানি, আর মুখে একটিই কথা, মামুন মরেনি।

শহীদের গর্ভধারিনী মা ও সহোদর বোনেরা তাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। এ ছিল আনন্দের কান্না, মহাপ্রাপ্তির অশ্রু। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল আমার। আর স্বপ্নের কথা মনে পড়তেই ‘আল্লাহ আল্লাহ’ বলে চিৎকার শুরু করলাম। ক’ফোঁটা অশ্রু চোখ বেয়ে মাটিতে পড়ল। আয়নার পাশে দাঁড়াতেই দেখি দু’গন্ডে দু’ফোঁটা অশ্রুর দাগ শুকিয়ে আছে।

এক নজরে

পুরোনাম

শহীদ মুহাম্মদ আল-মামুন

পিতা

মৃত আবদুল আজিজ

মাতা

শামছুন্নাহার

জন্ম তারিখ

নভেম্বর ৩০, -০০০১

ভাই বোন

৩ ভাই ৫ বোন (তিনি সর্বকনিষ্ঠ)

স্থায়ী ঠিকানা

বাকশিমুল, বুড়িচং, কুমিল্লা

সাংগঠনিক মান

সদস্য প্রার্থী

সর্বশেষ পড়ালেখা

১ম বর্ষ, দাওয়া এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

শাহাদাতের স্থান

ইবনে সিনা ক্লিনিক, ঢাকা


শহীদ মুহাম্মদ আল-মামুন

ছবি অ্যালবাম: শহীদ মুহাম্মদ আল-মামুন


শহীদ মুহাম্মদ আল-মামুন

ছবি অ্যালবাম: শহীদ মুহাম্মদ আল-মামুন