শহীদ সাহাব উদ্দিন পাটোয়ারী

০৮ এপ্রিল ১৯৯১ - ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ | ২১৮

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

শাহাদাতের ঘটনা

২০১৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ভোরে ঘটে যায় ইতিহাসের একটি জঘন্যতম অধ্যায়। আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ক্ষমতার মসনদ ধরে রাখতে এক নোংরা রাজনীতি খেলা শুরু করে। রাতের আঁধারে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়াবাজার নামক স্থানে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে ৮টি তরতাজা বনীআদমকে পুড়ে অঙ্গার করে। জীবন্ত মানুষ পোড়ানো, পিটিয়ে মানুষ হত্যা করে লাশের উপর নৃত্য করে নৈরাজ্য সৃষ্টি, রক্তপাত ও হত্যাকারীদের ভয়ংকর রুপ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়। আওয়ামী ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের দায়ভার জামায়াত-শিবিরের উপর চাপিয়ে তাদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করার চেষ্টা চলতে থাকে। বাস পোড়ানোকে পুঁজি করে তারা নিরীহ জামায়াত শিবিরের ভাইদেরকে মামলা দিয়ে যৌথ বাহিনীর অভিযানের নামে হয়রানি ও আতংক সৃষ্টি করতে শতাধিক বাড়ীঘর ভাংচুর ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে ক্রসফায়ারের হুমকি দিতে থাকে।

এমনি একদিন চারিদিকে শুনসান নিরবতা। রাজনৈতিক আন্দোলন, লাগাতার অবরোধ কর্মসূচী, সভা সমাবেশে কর্মচঞ্চল চৌদ্দগ্রাম হঠাৎ মুখ থুবড়ে পড়ে। এক অজানা আতংকে চৌদ্দগ্রামের জনপদ গুলোর মাঝে নিরবতা নেমে আসে। চায়ের দোকান গুলোতেও এখন আর আড্ডা জমে না। বিনা প্রয়োজনে মানুষকে আর রাস্তা ঘাটে দেখা যায় না। এ যেন আইয়ুব খাঁনের কারফিউ জারি করা কোন পূর্ব পাকিস্তান। সেই সময়ে কর্মীদেরকে সাহস যোগানোর জন্য এলাকায় অবস্থান করছে সাহাব উদ্দিন পাটোয়ারি। দায়িত্বশীল হারানোর আশঙ্কায় জেলা সভাপতি আব্দুর রব ফারুকী ভাই সাহাব উদ্দিন ভাইকে বলল, ভাই আপনি একটু সরে থাকেন কয়েকদিনের জন্য, তখন উত্তরে তিনি কর্মীদের কথা চিন্তা করে বললেন “আমি যদি না থাকি তাহলে কর্মীরা হতাশ হবে”। ৫ফেব্রুয়ারি দুপুর থেকে বাড়ীতে অবস্থা করে কর্মীদের ও যাদের বাড়ী ঘর ভাংচুর করেছে তাদের খোঁজ খরব নিচ্ছেন। কিন্তু কে জানতো এমন সুযোগের অপেক্ষা করছে হায়েনারা। তখন বিকাল ৫টা আছরের নামায শেষ করে বাহির হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ভাইটি। এমন সময় হুড়মুড় করে লুঙ্গি ও প্যান্ট পরা সাদা পোষাকের ১০/১২ জন পুলিশ এসে হামলা করলো তাদের ঘরে। প্রথমে তার বড় ভাই মাঈন উদ্দিনকে সাহাব উদ্দিন মনে করে আটক করে। কিন্তু ঘাতকের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার আগে এক পুলিশ সদস্য বলে এটা না মালটা (সাহাব উদ্দিন) ঘরেই আছে। মূহুত্বের মধ্যে ঘর থেকে তাকে তার মায়ের সামনে থেকে ধরে টানা হেচড়া শুরু করে দেয়। সাহাব উদ্দিন শুধু বলছিল “আমাকে একটু সুযোগ দেন আমি জুতা গুলো পড়ে নিই”। কিন্তু কঠিন সীমারের মন তার আবেদনে নয়, তার টগবগে রক্তের স্বাদ গ্রহন করার অপেক্ষায়। মায়ের বাঁধা, বোনদের আহাজারী, বড় ভাইয়ের আগলে ধরা, শকুনের তীব্র নখ আর শক্তির কাছে সবই যেন বায়বীয় পদার্থ। ছোঁ মেরে নিয়ে গেল মুহুর্তের মধ্যে প্রিয় সন্তানকে মায়ের কোল থেকে। আজো মায়ের আর্তনাদ “আমার সাহাব উদ্দিনকে আমার কাছ থেকে নিয়ে গেল আমি কিছু করতে পারলাম না”।

সেইযে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল সাহাব উদ্দিনকে কোথায় রাখা হয়েছে আর খোঁজ পাওয়া গেল না। দায়িত্বশীলরা সমস্ত মিডিয়া খোঁজ নিয়ে শুধু এইটুকু জানতে পেরেছে তাকে নিয়ে রাতে বিশেষ অভিযানে বের হবে অন্য কোন ক্ষতির সম্ভাবনা নাই। তার পরও সকল প্রকার প্রস্তাব দেওয়া হলো তাদেরকে (প্রশাসন) যেন ভাইটিকে অজানা আশংকা থেকে রক্ষা করা যায়। রাত গভীর হতে লাগলো আস্তে আস্তে সমস্ত কোলাহল নীরবতায় নিমজ্জিত হতে লাগলো। জনকোলাহল থেমে ঘনকালো অমাবস্যা যখন চৌদ্দগ্রামকে ঘিরে ধরছে, তখনই সাহাব উদ্দিন ভাইকে নিয়ে তারা প্রস্তুত হচ্ছিল ভিন্ন এক নেশায়।

৬ ফেব্রুয়ারী, ভোর তখন ৪টা কি ৪টা ৩০ হবে। “চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়াবাজারস্থ সামুকশার ইটভাটা থেকে ৫-৭টা গুলির আওয়াজ শুনতে পেলাম। কথাগুলো বলছিলেন দু’জন প্রহরি (তখন তারা লাগাতার অবরোধের সময় ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের প্রহরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন)। ২০মিনিট পর পুলিশ একটা গাড়ী নিয়ে এসে আমাদের ইটভাটার দিকে নিয়ে গেলেন। দেখলাম র্যা ব, পুলিশ ও বিডিআরসহ অনেক লোক। আর দেখলাম একটা লোক মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে। তার পা গুলো তখনো তরপাচ্ছে। আমাদেরকে দিয়ে পুলিশ লাশটা গাড়ীতে উঠাল। তারপর চলে গেলো”।

মায়ের কোল থেকে তুলে নেওয়া চৌদ্দগ্রাম উপজেলার (সদর সাথী শাখা) সভাপতি সাহাব উদ্দিনের লাশ পাওয়া গেল বেওয়ারিশ হিসেবে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। তার বিরুদ্ধে মামলা সাজানো হলো সে তার কয়েক জন সঙ্গি নিয়ে পুলিশের উপর হামলা করলে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুড়ঁলে সে নিহত হয়। এভাবেই ভাইটিকে বেওয়ারিশ লাশ হতে হল।
কে জানতো রাতের নীরবতা ভেঙ্গে চৌদ্দগ্রাম বাসীর জন্য এক হৃদয় বিদারক খবর তৈরী করছে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা। তারা প্রিয় সাহাব উদ্দিনকে মায়ের কোল থেকে ধরে এনে রাতের অন্ধকারে পৈশাচিক কায়দায় মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে হত্যা করল। তার কালো শার্ট ও চুল ঢেকে গিয়েছিল টকটকে লাল রক্তে। এভাবে বুলেটের আঘাতে মাথার শুভ্র মগজে তৈরী হয় ত্যাগের এক নতুন আলপনা। প্রিয় ভাইটি এইভাবে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান পরপারের সুন্দর জীবনে। চৌদ্দগ্রামবাসীকে কান্নার সাগরে ডুবিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। প্রিয় দায়িত্বশীল হারানোর ব্যথায় এখনো কান্নার রোল পড়ে এই জনপদের প্রতিটি ঘরে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানতে পারি সাহাব উদ্দিন ভাইকে গুলি করার আগে তিনি বলেছিলেন, “আমি শিবিরের সভাপতি এই অপরাধে আমাকে হত্যা করতে পারেন কিন্তু গাড়ী পুড়িয়েছি এই অপবাদে আমাকে হত্যা করবেন না”। আরো একটি কথা জানতে পারি গুলি করার মুহুর্তে সে শুধু বলেছিল “আমাকে জোরে জোরে কালেমায় শাহাদাত পড়ার সুযোগ দিবেন”। প্রিয় ভাইটি কালেমায় শাহাদাত জোরে জোরে পড়তে পড়তে শাহাদাত বরণ করেন।

পর্দার অন্তরালে আজও শোনা যায় প্রশান্তমহাসাগরের ঊর্মিমালার মতো মায়ের অস্ফুট কান্নার আছড়ে পড়ার ধ্বনি। প্রদীপহারা পিতা আর মা তার নাড়িছেঁড়া ধন সাহাব উদ্দিনকে হারিয়ে যে কান্নার সাগর তৈরী করেছেন; এই জলরাশি কি আর তাদের এই জনমে শুকাবে? বোনগুলো এখনো তাদের শহীদ ভাইয়ের স্মৃতি খুঁজে ফেরে ঘরের প্রতিটি কোনায়। কখন ভাই আসবে বলবে আঞ্জুমান ভাইয়ার শার্টটা আয়রন করে দে’তো। কখন বলবে ফারজানা আমার জুতো গুলো মুছে দে’তো। পড়ার টেবিলে এখনো সাজানো আছে বইগুলো আর ঘরের টাঙানো আছে এখনো সেই ওয়ালম্যাট। ঝড়ে ভাঙ্গা বটগাছের মতো জীবন যাপন করতে গিয়ে বৃদ্ধ বাবা জয়নাল আবেদীনের ৬০ বছরের চোখ যেন কেমন ঝাপসা হয়ে যায়। ঠাঁ ঠাঁ রোদেও রাজ্যের অমাবস্যা তাঁকে ঘিরে ধরে।

এক নজরে

পুরোনাম

শহীদ সাহাব উদ্দিন পাটোয়ারী

পিতা

মাওলানা জয়নাল আবেদীন

মাতা

ছকিনা বেগম

জন্ম তারিখ

এপ্রিল ৮, ১৯৯১

ভাই বোন

স্থায়ী ঠিকানা

চান্দিশকরা, চৌদ্দগ্রাম পৌরসভা, চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা

সাংগঠনিক মান

সদস্য

সর্বশেষ পড়ালেখা

অনার্স ৪র্থ বর্ষ

শাহাদাতের স্থান

চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়াবাজারস্থ সামুকশার ইটভাটা