শহীদ আইয়ুব আলী

৩০ নভেম্বর -০০০১ - ১১ মার্চ ১৯৮২ | ৩

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

শাহাদাতের ঘটনা

পদ্মাবিধৌত হযরত শাহ মখদুম (রহ)-এর পুণ্য স্মৃতিবিজড়িত উত্তরবঙ্গের রাজশাহী প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের এক অনন্য লীলাভূমি। এই শহরে অনুকূল পরিবেশের দরুন বেশ কতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রাজশাহী সরকারি কলেজ অন্যতম। জীবনে বড় হওয়ার এক পরম স্পৃহা নিয়ে রাজশাহী কলেজে ভর্তি হন মেধাবী ছাত্র আইয়ুব আলী। কিন্তু বড় হয়ে আলো ফোটানোর আগেই বাতিলের হামলায় নিভে যায় তাঁর জীবনপ্রদীপ।


জন্ম ও বংশ পরিচয়
শহীদ আইয়ুব আলী চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গার ডাউকি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুহাম্মদ আইজুদ্দিন। আট ভাই-বোনের মধ্যে আইয়ুব আলী ছিলেন সবার বড়।

শিক্ষাজীবন
শহীদ আইয়ুব আলীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় বাদেমাজু স্কুলে। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। প্রাইমারি শিক্ষা শেষ করে তাঁকে আলমডাঙ্গা পাইলট হাইস্কুলে ভর্তি করা হয়। এখানে দশম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতিটি ক্লাসে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এসএসসি পরীক্ষার সময় অসুখ থাকার দরুন দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন তিনি। এসএসসি পাস করার পর তিনি আলমডাঙ্গা ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেন। অতঃপর রাজশাহী কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি হন। শাহাদাতের সময় তিনি এ কলেজেরই ছাত্র ছিলেন।


ব্যক্তিজীবনে শহীদ আইয়ুব আলী
ছোট্টকাল থেকেই আইয়ুব আলী ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও অমায়িক। ছোটবেলার একটি ঘটনা, আইয়ুব আলীর বয়স তখন মাত্র আড়াই বছর। মায়ের সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন নানার বাড়ি। বায়না ধরেছিলেন আখ খাবেন। উপেক্ষা করতে পারলেন না মা। দেখিয়ে দিলেন তাঁর নানার আখক্ষেত। জমির কাছেই তাঁর ছোট নানা বসা ছিলেন। আইয়ুব আলী আখ নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। কিন্তু আখ নিতে গিয়ে যা ঘটলো তার বর্ণনা করেন তাঁর নানা : ‘ও আইয়ুবের মা, তোমার আইয়ুব আখ আনতে মাঠে গেছে। আমি ওকে আখ দিতেই সে বলল, আমি আমার নানার জমির আখ নেব। বাধ্য হয়ে ভাইয়ের জমি থেকে আখ দিলাম।’ আনুগত্যশীল আইয়ুব কেন খাবে পরের জমির আখ? মনে হয় শহীদেরা এমনই নিষ্পাপ থাকে প্রভুর তত্ত্বাবধানে। শহীদ জননী তাঁর শাহাদাতের পর স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘সেই শাসনের পর থেকে আইযুব কেন, তাঁর কোনো ভাই-ই আজ পর্যন্ত পরের জিনিস না বলে স্পর্শ করা শেখেনি।’

সংগঠনে আগমন
ছোটবেলা থেকেই আইয়ুব আলী ছিলেন অত্যন্ত ধর্মভীরু। ষষ্ঠ শ্রেণী থেকেই তিনি নিয়মিত নামাজ পড়তেন। আলমডাঙ্গা ডিগ্রি কলেজে অধ্যয়নকালে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের পতাকাতলে আসেন। সংগঠনে যোগ দেয়ার পর থেকেই তিনি নিয়মিত কুরআন-হাদিস অধ্যয়ন করতেন। ছাত্রদের ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াত দিতেন। পরিবার ইসলামী আন্দোলনের অনুকূলে না থাকলেও শহীদ আইয়ুব আলী ইসলামী আদর্শের একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। ইসলামী আন্দোলনের প্রত্যেকটি কাজ তিনি একাগ্রচিত্তে পালন করার চেষ্টা করতেন। শাহাদাতকালে তিনি সংগঠনের সাথী ছিলেন।

শাহাদাতের ইচ্ছা পোষণ
শহীদ আইয়ুব আলী ইসলামী আন্দোলনের কাজে নিজেকে যখন সম্পৃক্ত করেছেন তখনও তাঁর পরিবার নামাজ-কালাম ঠিকমত পড়তেন না। একদিন পাশের বাড়ির মকবুল হোসেন মুন্সী তাঁর পিতাকে এসে বলল, ‘আইয়ুব যে পথে নেমেছে তাতে ওকে ঠেকিয়ে না রাখতে পারলে তো মুশকিল! কারণ চারদিকে বিরোধিতা।’ এরই প্রেক্ষিতে আইয়ুবের পিতা ছেলেকে ডেকে বললেন, ‘তুমি তো এপথে নেমেছ। কিন্তু কবে যে তোমাকে মেরে ফেলে!’ তখন আইয়ুব বললেন, ‘আল্লাহর পথে এসে মরাও ভালো। আপনি লেখাপড়া শেখাতে পারেন কিন্তু মৃত্যু তো ঠেকাতে পারেন না।’

অন্য একদিন শহীদ আইয়ুব আলী তাঁর পিতাকে বলেছিলেন, ‘মানুষের মত মানুষ হয়ে আমাদের দুনিয়া থেকে যাওয়া উচিত।’ তাঁর কথা শুনে পিতা বললেন, ‘আমরা তো মানুষই, আবার কী রকম মানুষ হতে বলছো?’ পিতার কথা শুনে তিনি বলেছিলেন, ‘যে মানুষ মারা গেলে সবাই কাঁদে আর সে হাসে।’

শাহাদাতের প্রেক্ষাপট
১১ মার্চ ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের নবাগত সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। আগের দিন ছিল ১০ মার্চ, বুধবার। সেদিন থেকেই শিবিরের কর্মসূিচকে বানচাল করার হীন ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল রক্তপিপাসু হায়েনারা। ইসলামী শক্তি শিবিরকে কখনই সহ্য করতে পারেনি বাতিলপন্থীরা। ওইদিন (১১ মার্চ) সকাল থেকেই নবাগত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের জন্য জোর প্রস্তুতি চলছিলো। আর এ অনুষ্ঠানস্থলের অদূরেই শহীদ মিনারে লক্ষ্য করা গেল একটি জমায়েত, যাদের হাতে ছিল লাঠি-সোটা, রামদা, বল্লম, হকিস্টিক ও রড। শিবিরের কর্মসূচিকে বানচাল করার হীন ষড়যন্ত্রে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ (ফ-চু), ছাত্রলীগ (মু-হা), বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নসহ অন্যরা তথাকথিত সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে এক সমাবেশের আয়োজন করে। ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে তারা ছোট ছোট গ্র“পে বিভক্ত হয়ে বারবার গোলযোগ বাধাতে চেষ্টা করে। প্রতিবারই শিবিরকর্মীরা তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। ইতোমধ্যে বাইরে থেকে তারা কয়েকটি বাস বোঝাই করে পাঁচ-ছয় শত সশস্ত্র গুণ্ডা এনে সংবর্ধনাস্থল চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তাদের হাতে ছিল রামদা, ভোজালি, ছোরা, বল্লম, হকিস্টিক ও লোহার রড। হিংস্র হায়েনারা অতর্কিত ঝাঁপিয়ে পড়ে শিবিরকর্মীদের ওপর। আদিম উন্মত্ততায় শিবিরকর্মীদের নির্মমভাবে ছুরি, বল্লম, রামদা, ভোজালির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে। শুরু হয় তাদের ওপর ইট পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ। আত্মরক্ষার জন্য শিবিরকর্মীরা এদিক সেদিক ছুটতে থাকেন। কিন্তু পৈশাচিক উন্মত্ততায় মেতে ওঠা নরঘাতকরা তাতেও নিরস্ত না হয়ে পিছু ধাওয়া করে নির্দয়ভাবে প্রহার করতে থাকে শিবিরকর্মীদেরকে।


আত্মরক্ষার জন্য অনেকে বিএনসিসি-এর অফিসে ঢুকে। কিন্তু সেখানেও তারা বাঁচতে পারেনি। কিছু শিক্ষক তাদেরকে দেখিয়ে দেয়। জোর করে দরজা ভেঙ্গে ঢুকে পড়ে সশস্ত্র ঘাতকরা। বন্ধ ঘরের মধ্যে নিরস্ত্র কর্মীদেরকে বেধরক পেটানো ও ছুরিকাঘাত করা হয়। ইটের ওপর রেখে ইটের আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হয় শিবিরকর্মীর মাথা। আহত হয় অর্ধশতাধিক শিবিরকর্মী। নির্বাক প্রশাসনের অনুমতির অভাবে দায়িত্বরত থাকা সত্ত্বেও বাধা দেয়নি পুলিশ। সকাল ১১টায় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় আইয়ুব, সাব্বির, মামুনসহ আহত শিবিরকর্মীদের।


বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অচেতন অবস্থায় নিয়ে আসা আইয়ুব আলীর মুখ হকিস্টিক আর রডের আঘাতে ফুলে এমন হয়ে গেল যে তাঁকে চেনাই যাচ্ছিল না। তাঁর পেটেও ছিল ছুরির আঘাত। শুক্রবার বিকেলে পুত্রের আহত হওয়ার সংবাদ শুনে কুষ্টিয়ার আলমডাঙ্গা থেকে ছুটে এলেন তাঁর পিতা আইজ উদ্দিন। আইয়ুবের অবস্থা দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। অনেক কষ্টে তাকে সরিয়ে নেয়া হল। শোকাহত পিতার কণ্ঠে চিৎকার, ‘কী অপরাধ করেছিল আমার ছেলে? আমি ওর মাকে গিয়ে কী বলব? ওর মা তো এ খবর শুনে বাঁচবে না!’ রাত ১০টা ৪০ মিনিটে হাসপাতাল থেকে ঘোষণা এল আইয়ুব শাহাদাত বরণ করেছে। তাঁর পিতা আইজ উদ্দিন তখন শহরের অন্য প্রান্তে। তাঁকে ঘিরে রাখা লোকদের কাছে জানতে চাচ্ছিলেন তাঁর ছেলের আঘাত খুব বেশি কি না? তখনও তিনি জানেন না তাঁর বড় ছেলে আইয়ুব আলী আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন, পা বাড়িয়েছেন বেহেশতের পথে, পান করেছেন শাহাদাতের অমিয় সুধা।


শাহাদাতের পর শহীদের মাতা-পিতার প্রতিক্রিয়া
মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এসে শহীদ আইয়ুবের অবস্থা দেখে ডুকরে কেঁদে ফেলেন তাঁর পিতা। শোকাহত পিতার কণ্ঠে চিৎকার উঠলো- কী অপরাধ ছিল আমার ছেলের? আমি ওর মাকে গিয়ে কী বলব? ওর মা তো এ খবর শুনে বাঁচবে না!


প্রধান শিক্ষকের দৃষ্টিতে আইয়ুব
তাঁর স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো: মোজাম্মেল হক বলেন, আইয়ুব ছিল খুবই মেধাবী ও বিনম্র ছাত্র। সে সকলের সাথে ভালো ব্যবহার করত। আমার সকল ছাত্রকে যদি একটি গোলাপের বাগানের সাথে তুলনা করা হয়, তবে সে বাগানের সেরা গোলাপ ছিল আইয়ুব আলী।


বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া
১৩ তারিখ পত্রপত্রিকায় এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রায় সব কটি রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সংগঠন ও বুদ্ধিজীবী মহল বিবৃতি দিয়েছিল। সম্পাদকীয় লেখা হলো নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা উল্লেখ করে। পত্রিকার পাতায়, মিছিলে, প্রতিবাদ সভায় সর্বত্র হত্যাকাণ্ডের জন্য বিশেষভাবে দায়ী রাবি’র ভিসি’র অপসারণ ও যারা এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বর্বর পৈশাচিকতার পরিচয় দিয়েছে তাদের শাস্তির দাবি উঠলো, দাবি উঠলো ‘খুনিদের ফাঁসি চাই’। দায়সারা গোছের একটি শাস্তি হয়েছিলও বটে কিন্তু আদালতের সেই শাস্তি আর কার্যকর হয়নি।


চেতনায় চির অম্লান শহীদ আইয়ুব আলী
প্রতিবছর ফিরে আসে ১১ মার্চ। সেই সাথে ফিরে আসে আইয়ুব আলীর শাহাদাতের কথা। দেশের তৌহিদী জনতার মনের পর্দায় ভেসে থাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্তে রঞ্জিত মতিহার চত্বর। কাফেলার সৈনিকগণ এই শাহাদাত থেকে শিক্ষা নেয় সামনে এগিয়ে যাওয়ার, থমকে না দাঁড়ানোর। শহীদদের রক্ত রঞ্জিত পথ ধরেই এগিয়ে যাবে এ শহীদি কাফেলা। এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

 

এক নজরে

পুরোনাম

শহীদ আইয়ুব আলী

পিতা

আইজ উদ্দিন মুন্সী

মাতা

পরিজন নেছা বিবি

জন্ম তারিখ

নভেম্বর ৩০, -০০০১

ভাই বোন

৪ ভাই, ৪ বোন

স্থায়ী ঠিকানা

চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা

সাংগঠনিক মান

সাথী

সর্বশেষ পড়ালেখা

উদ্ভিদ বিজ্ঞান , রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে

শাহাদাতের স্থান

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


শহীদ আইয়ুব আলী

ছবি অ্যালবাম: শহীদ আইয়ুব আলী


শহীদ আইয়ুব আলী

ছবি অ্যালবাম: শহীদ আইয়ুব আলী