শহীদ কাজী মোশাররফ হোসাইন

০৪ আগস্ট ১৯৭১ - ১২ জানুয়ারি ১৯৯৩ | ৫২

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

শাহাদাতের ঘটনা

ইসলামের জন্য যুগ যুগান্তরে সাহসী মুজাহিদ ছিলেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবেন। দ্বীনের পথে তেমনি একজন সাহসী সৈনিক মোশাররফ হোসাইন। তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা পিতার যোগ্যতম এক সন্তান। বাবা-চাচা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন দেশকে গণতন্ত্রের দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী দলের ছাত্রসংগঠনের ফ্যাসিবাদী আচরণের নির্মম শিকার হন শহীদ কাজী মোশাররফ হোসাইন।

পারিবারিক পরিচয়
শহীদ কাজী মোশাররফ হোসাইন ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার জয়পুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার বাবা কাজী সামছুল হুদা তার স্ত্রীকেসহ পরিবারকে সীমান্তের ওপারে ভারতের করিমাটিয়া রেখে দেশে চলে আসেন মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণের জন্যে। স্ত্রী হোসনে আরা তার একমাত্র কন্যা কাজী দিলারা আকতারকে নিয়ে ভারতে বসবাস করতে লাগলেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই সামছুল হুদার পরিবারে নেমে আসে কালো মেঘের ছায়া, আদরের কন্যা আমাশায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। অনেক চেষ্টা করে বাঁচানো গোলো না দিলার আকতারকে। মেয়ে শোকে ভেঙে পড়ে মা হোসেনে আরা। ঠিক সে মুহূর্তে অমবস্যার কালো আঁধারে মাঝে দেখা গেলো পূর্ণমিার চাঁদ। ৪ আগস্ট ১৯৭১। পৃথিবীতে আসলেন কাজী মোশাররফ হোসাইন। যাকে পেয়ে মা হোসনে আরা বেগম মেয়ে শোক কিছুটা কম অনুভব করতে লাগলেন। কিন্তু না হোসনে আরা বেগমের সে আনন্দ বেশি স্থায়ী হতে দেয়নি মুজিববাদী ছাত্রলীগ। একদিন মোশাররফের মত নিষ্পাপ উদীয়মান তরুণকেও মুজিববাদী হায়েনাদের নির্মম ব্রাশফায়ারে শিকার হতে হয়েছে।

শিক্ষাজীবন
শিক্ষার হাতে খড়ি পিতার কাছেই। ভর্তি করালেন শুভপুর সরকারি প্রাথামিক বিদ্যালয়। ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতি কাসেই ১ম স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের সাথে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হলেন। ভর্তি হলেন জয়পুর সরোজিনী উচ্চ বিদ্যালয়ে। ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত মেধার সাক্ষ্য রাখলেন আগের মতই। এসসসি পাস করলেন ১ম বিভাগে। ভর্তি হলেন ছাগলনাইয়া সরকারি কলেজে। শরীক হলেন শহীদী কাফেলায়। এইচ এসসি পাস করে উচ্চ শিক্ষার জন্য ভর্তি হলেন ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম কলেজে। গণিত বিভাগের ছাত্র ছিলেন মোশাররফ হোসাইন। তিনি শুধু মেধাবী ছাত্রই ছিলেন না বরং সুবক্তা ছিলেন। তাইতো তার মুক্তিযোদ্ধা চাচা তাকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সমাবেশে বক্তব্য দেয়ার জন্য নিয়ে যেতেন।

সাংগঠনিক জীবন
কাজী মোশাররফ হোসাইন সংগঠনের কর্মী ছিলেন। ছাগলনাইয়া সরকারি কলেজে অধ্যায়নকালে সংগঠনে যোগ দেন। মেধাবী ছাত্র কাজী মোশাররফ হোসাইন পড়াশোনা ছাড়া অন্য সময়গুলো দাওয়াতি কাজে লাগাতেন। তার চরিত্র ছিল চুম্বকের মত আকর্ষণীয়। তিনি তার দাওয়াতি চরিত্র দিয়ে সহপাঠী বন্ধু বান্ধব সকলকে আকৃষ্ট করেছিলেন। শাহাদাতের তামান্নায় উজ্জীবিত হয়ে তিনি ইসলামী আন্দোলনের কাজ করতেন।

শাহাদাতের হৃদয়বিদারক ঘটনা
১২ জানুয়ারি ১৯৯৩ এর সকালবেলা কাজী মোশাররফ হোসাইন তাঁর রুমমেটদের শোনালেন এক দুঃস্বপ্নের কথা। ছাত্রলীগের গুন্ডারা তার বাবাকে ধরে নিয়ে হত্যা করে লাশ হস্তান্তরে জন্য বিশ হাজার টাকা দাবি করে। হঠাৎ স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। সারাদিন আনমনে কেটে যায় তার। বিকালে কখনও ফুটবল না খেললেও সেদিন ফুটবল খেলতে নামেন প্যারেড ময়দানে। অনেকের চেয়ে ভাল খেললেন তিনি। মনও কিছুটা হালাকা হয়েছে তার। মাগরিবের নামাজ পড়ে সরলেন পড়ার টেবিলে। কিছুক্ষণ পর খবর এলো শিবির কর্মী জিয়াকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে ছাত্রলীগ। প্রতিবাদে মিছিল বের হল। মিছিলে যোগদান করলেন মোশাররফ। মিছিল চলছিল সিরাজউদদৌলা রোড হয়ে আন্দরকিল্লার দিকে। সামনের সারিতে দৃঢ়পদে চললেন কাজী মোশাররফ । মিছিল যখন দেওয়ান বাজার সাব এরিয়ায় পৌঁছল তখন গলির অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসীরা অতর্কিতভাবে ব্রাশফায়ার শুরু করল। বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হলো সামনে থাকা মোশাররফ, মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। পান করলেন শাহাদাতের অমিয় পেয়ালা। আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেলেন তিনি। অকালে ঝরে গেল একটি প্রাণ। প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই ঝরে গেল একটি তাজা গোলাপ। ইসলামী জীবনব্যবস্থা কায়েমের পথে অগ্র পথিক হয়ে রইলেন আমাদের মাঝে। শহীদের মৃত্যুতে ভেঙে পড়লেন সহপাঠী বন্ধু, শিক্ষক সবাই। তৎকালীন অধ্যক্ষ ড. আব্দুস সবর প্রিয় ছাত্রের মৃত্যুতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। শহীদের কফিন গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলে মা প্রশ্ন করেন কোন অপরাধে তার সন্তানকে জীবন দিতে হল। যদি তার ছেলে অপরাধ না করে তবে তাকে ফিরিয়ে দিতে। মা সন্তানকে ফিরে পাবেন না, সে জন্য ব্যথিত হৃদয়ে আজীবন কাটাবেন। ছেলে কিন্তু ব্যথিত নয়। কারণ তার তিনি জীবন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গল্প করছেন জান্নাতের সুবজ পাখিদের সাথে।

শহীদের চাচার বক্তব্য
শহীদের চাচা কাজী মোজাম্মেল হক বলেন, আমরা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে কেন সন্তান হত্যার বিচার পেলাম না। আমরা কি জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করেছিলাম সন্তান হারাবার জান্য? সন্ত্রাস মদদ দানের জন্য? হোসনে আরা আজো কাঁদেন পুত্রশোকে। কেউ তাকে দেখতে গেলে ছেলের মতই ভাববেন তাদেরকে। এক সন্তানকে হারিয়ে লক্ষ সন্তানের মাতা আর সামছুর হুদা লক্ষ ছেলের পিতা হলেন। শহীদ মোশাররফ তার সর্বোচ্চা ত্যাগ স্বীকার করেছেন। জান্নাত থেকে তাকিয়ে আছেন আমাদের দিকে। দায়িত্ব আমাদের এ জমিনে কালেমার পাতাকা উড়াবার। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কষ্ট পাবেন, অভিযোগ করবেন আমাদের বিরুদ্ধে। আমাদের দাঁড়াতে হবে আখেরাতের কাঠগড়ায়।

একনজরে শহীদ কাজী মোশাররফ হোসাইন
নাম: কাজী মোশাররফ হোসাইন
পিতার নাম : মাস্টার কাজী সামছুল হুদা
মাতার নাম : হোসনে আরা বেগম।
ভাইবোনদের সংখ্যা : ২ ভাই, ৩ বোন
ভাইবোনদের মাঝে অবস্থান : সবার বড়।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম- জয়পুর, পো: শুভপুর, থানা: ছাগলনাইয়া, জেলা: ফেনী।
জন্মতারিখ : ৪ আগস্ট ১৯৭১
শিক্ষাগত যোগ্যতা : অনার্স ২য় বর্ষ, গণিত বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ
শহীদ হওয়ার তারিখ : ১২.০১.১৯৯৩ সাল (১১ তারিখ সন্ধ্যায় আহত)
শহীদ হওয়ার স্থান : দেওয়ান বাজার সাব এরিয়া, চট্টগ্রাম
কবরস্থান : নিজবাড়ির আঙিনা
যে শাখার শহীদ : চট্টগ্রাম মহানগরী
সাংগঠনিক মান : কর্মী
যাদের হাতে শহীদ : মুজিববাদী ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী।


যেভাবে শহীদ
ছাত্রলীগ কর্তৃক শিবির নেতা জিয়াউর রহমানকে আহত করার প্রতিবাদে মিছিল করতে গিয়ে আন্দরকিল্লায় ছাত্রলীগের ব্রাশ ফায়ারে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শাহাদাত বরণ করেন।

শহীদ সম্পর্কে তাঁর বন্ধু মো. আসাদুজ্জামানের একটি প্রতিক্রিয়া
শহীদ মোশাররফ: যার কাছে আমি ঋণী
শহীদ মোঃ মোশাররফ হোসেন। এদেশের ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের ৫১তম শহীদ। কোন দিন ভাবিনি জীবন থেকে সে অতীত হয়ে যাবে। তাঁকে নিয়ে ভাবতে হবে, স্মৃতিচারণ করতে হবে। ছাত্রলীগের ঘাতকদের বুলেটে আজ সব কিছু ওলট-পালট হয় গেল।
সেদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠেই পত্রিকায় যখন মোশাররফের শাহাদাতের খবর পেলাম-বিশ্বাস হয়নি কিছুতেই। এখনো বিশ্বাস হয় না মোশাররফকে আর ক্যাম্পাসে দেখব না, মসজিদের নামাজের সারিতে দেখব না, মিছিলে শ্লোগানে মুখরিত হতে দেখব না, আড্ডায় পাবনা কিংবা পড়ার টেবিলে গণিতের মারপ্যাঁচে ঘুচাতে। এখন সে জীবনের সবচেয়ে বড় অংক কষে শহীদ আব্দুল মালেক, আব্দুর রহীম, আব্দুল আজীজ, শাব্বির, হামিদ, হাফিজ, সেলিম, জাহাঙ্গীর, ফিরোজ মাহমুদ, কিংবা সাইফুল ইসলাম প্রমুখের সাথে জান্নাতের বাগানে সুবাস ছড়াচ্ছে।
মোশাররফ আমাদের মাঝে নেই ভাবতে চোখের অশ্র“ সংবরণ করতে পারি না। মেঘে সিক্ত হয় কলিজা। একটি ফুল সম্পূর্ণ প্রস্ফুটিত হবার পূর্বেই ঝরে গেল, একটি জীবন আমাদের মাঝ থেকে অকালে হারিয়ে গেল, কিন্তু একটি আশা কোন মতেই ব্যর্থ হয়নি। মৃত্যুর পূর্বে মোশাররফ সর্বদায় শাহাদাতের প্রেরণায় উজ্জীবিত থাকত। তাঁর আশা পুরণ হয়েছে-ব্যর্থ হয়নি।
শহীদ মোশাররফের সাথে আমার পরিচয় খুব বেশি দিনের নয়। ছোট ভাই সেলিমের মাধ্যমে বছর দু’এক বছর আগ থেকেই পরিচয়। পরিচয়ের পর থেকে খুব দ্রুত আমরা পরস্পর ঘনিষ্ঠ হয়েছি। তাঁর মধ্যে চুম্বকের মত আকর্ষণীয় শক্তি ছিল। যে শক্তিতে আমি নিজেই পরাজিত হয়েছিলাম। মাসখানেক পর কলেজে গেলে তাঁর রুমে (৩৪ সোহরাওয়ার্দী ছাত্রাবাস চট্টগ্রাম) উঠলাম। রুমমেট আহমদ কবির, মিঠু, খালেক কিংবা তৈয়ব, যোবায়ের, জসিম ভাই, ইলিয়াছ ভাই এবং মাঝে মাঝে আমি এই ছিল (আমার জানা মতে) মোশাররফের ঘনিষ্ঠদের তালিকা। এদের মাঝেই তাঁর সকাল, দুপুর, বিকাল, রাত, কিংবা ক্যাম্পাস, রাজপথ শ্লোগান মিছিল তথা পুরো সময়টাই কেটেছে তার। পুরো হিসাব দেয়া ক্ষুদ্র পরিসরে সম্ভব নয়। গণিত (সম্মান) ২য় বর্ষের ছাত্র মোশাররফ আমাদের সবার চেয়ে সুন্দর স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। সব সময় শাহাদাতের প্রেরণায় উজ্জীবিত ছিল। বাতিল শক্তির সাথে সামান্যতম বিষয়েও ছিল আপোষহীন। কলেজ ক্যাম্পাস যখন ছাত্র-ছাত্রীদের পদচারণায় মুখরিত তখনও সে আন্দোলনের কাজে মশগুল থাকত। সে যখন একা থাকত প্রায় দেখতাম কোন বিষন্নতা যেন তাঁকে ভর করেছে। ঢাকার ছাত্ররাজনীতি, দেশের রাজনীতি, ইসলামী আন্দোলনের রিসেন্ট খবরাখবর কিংবা ইসলামী সমাজ এর সুফলতা নিয়ে নানান প্রশ্ন করতো আমাকে। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যতটুকু সম্ভব উত্তর দিতাম। কিছুদিন পর যখন তাঁর সাথে দেখা হত তাঁর ঈমানী স্পিরিট এবং সাহস আমাকে প্রচন্ড আলোড়িত করত। আমার নিজস্ব চেতনা মাঝে মাঝে ভোঁতা হবার পর তার সংস্পর্শে যখন যেতাম ক্ষুরধার হয়ে উঠত সবকিছূ। আমার জুনিয়র ছিল বলে-ছোট ভাইয়ের মত স্নেহ করতাম। ছোট ভাই মোশাররফের কাছ থেকে পাওয়া প্রেরণা ভার্সিটির প্রতিকূল পরিবেশে আমাকে অসম্ভব সাহস যুগিয়েছে। তার জন্য আমি তাঁর কাছে ঋণী।
ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রচন্ড সাধ ছিল তাঁর। সে সমাজে স্বচক্ষে দেখে যেতে না পারলেও মোশাররফ সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে বেগবান করেছে, একধাপ সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে। আল্লাহ নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন, “যারা আল্লাহর পথে নিহত হবে, আল্লাহ তাঁদের কৃতকর্মকে কিছুতেই ব্যর্থ হতে দিবেন না। (সূরা মুহাম্মদ)” মোশাররফ প্রকৃতই আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়েছেন। তাঁর একটিই অপরাধ ছিল। আর তা হচ্ছে “তারা সেই মহাপরাক্রমশালী আলাহর উপর ঈমান এনেছে: যিনি সমগ্র রাজ্যের মালিক”। (সূরা আল-বুরুজ)
কুরআন ও হাদীসের আলোকেই তিনি শহীদ “যার বিশ্বাসের ভিত্তি ঈমান, যার নিহত হবার কারণ ইসলাম প্রতিরক্ষা, প্রতিষ্ঠা তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং যার নিহত হবার পথ জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ।” শহীদ মোশাররফ তার ব্যতিক্রম নহে। মোশাররফকে নিয়ে যখন লিখছি সে সময়েই (১৪-০১-৯৩) রাজশাহীতে ইসলামী আন্দোলনের আর এক মুজাহিত মোঃ ইয়াহিয়া ঘাতকদের হাতে শাহাদাত বরণ করেন। তার অপরাধও ছিল একটি। তিনি ইসলামের কথা বলতেন এবং ইসলামী আন্দোলনের কর্মী ছিলেন। মোশাররফের পর শহীদ হলেন মোঃ ইয়াহিয়া। এভাবেই শহীদের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। আন্দোলন হচ্ছে বেগবান আর দ্রুত এগিয়ে আসছে মনযিল।
শহীদ মোশাররফের প্রতি আমার এখন ঈর্ষা হয়। সেই সহজ সরল সাহসী ছেলে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হল। এমনটি ঈর্ষা জেগেছিল আমার সহকর্মী শেখ ফিরোজ মাহমুদ শহীদ হবার পর। শহীদ ফিরোজ মাহমুদের একটি কথা আমাকে এখনো নাড়া দেয়। তিনি বলতেন, “বাগানের সবচে সুন্দর ফুলটি যেমন প্রেমিক ছিঁড়ে নেয় পরম আদরে, তেমনি আল্লাহ পাকও তাঁর সবচে সুন্দর ও প্রিয় বান্দাকেই পৃথিবী হতে নিয়ে যান নিজের কাছে।” শহীদ ফিরোজ মাহমুদ ইয়াহিয়া মোশাররফ কিংবা অন্যরাও ঠিক তেমনিভাবে ওপারের সুন্দর জীবনে চলে গেছেন। তারা মরেও জীবিত হয়ে রইলেন। আল্লাহ নিজেই বলেন, “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাঁদের মৃত বলো না বরং তাঁরা জীবিত অথচ তোমরা তা অনুভব করতে পার না (সূরা আল বাকারা)।” গত ১২ই জানুয়ারি’৯৩ সন্ধ্যায় দেখেছিল। স্বপ্নটা এই, ছাত্রলীগের সশস্ত্র ঘাতকরা তাঁর বাবাকে কবরস্থানে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। লাশ ফিরিয়ে নেবার জন্য ২০,০০০ টাকা দাবিও করে। টাকা নিয়ে মোশাররফ কবরস্থানে গিয়ে দেখে তাঁর বাবার লাশ নেই। আছে একটি চানা। শাহাদাতের দিন সকালে এই স্বপ্নখানা সে রুমমেটদের বর্ণনা করেছিল। সেই স্বপ্নখানা তার জীবনেই সত্য হল। ঐ দিন বিকেলে কলেজ মাঠ (প্যারেড) সে ফুটবল খেলছে। খেলা শেষ সবার একই কথা আজ সবার চেয়ে মোশাররফ ভাল খেলেছে। কোন সময় সে ভাল বল খেলতো না। কিন্তু কেন জানি ঐদিন সে সবার চেয়ে ভাল খেলেছে। সবার প্রশংসায় মোশাররফের নাজুক অবস্থা। মাগরিবের নামাজ শেষে পরিশ্রান্ত মোশাররফ এবং অন্যান্যরা যখন বিশ্রাম নিচ্ছিল ঠিক সে মুহূর্তে খবর পৌছল আন্দরকিল্লা (চট্টগ্রাম) থেকে শিবির কর্মী জিয়াকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে চেরাগী পাহাড়ের কাছে রাজা পুকুর লেইনে নিয়ে নির্যাতন করছে। সংবাদ শুনে বসে থাকতে পারেনি অন্যদের মত মোশাররফই। বরাবরই সাহসী ছিল মোশাররফ। অন্যায়ের প্রতিবাদ প্রতিরোধে সে থাকত সর্বদা সামনের সারিতে। স্বাভাবিকভাবেই মোশাররফসহ প্রতিবাদ মিছিল অন্যায়ের প্রতিবাদে উজ্জীবিত হয়ে আন্দরকিল্লার দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু ইসলামের শত্র“রা আন্দোলনের সহকর্মীদের প্রতি অপর কর্মীদের ভালবাসা, আন্তরিকতা, অন্যায়ের প্রতিবাদে বজ্রকন্ঠ, তাদের সাহস, শৌর্য, বীর্য এসব কিছুই সহ্য করতে পারেনি। পথিমধ্যেই অন্ধকার গলি থেকে ব্রাশ ফায়ার করা হয় মিছিলে উপর। বুকে বুলেটবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে লুটিয়ে পড়ে সবার প্রিয় মোশাররফ। নিজের জীবন দিয়ে সে সাক্ষ্য দিল হে আল্লাহ! আমি পরিপূর্ণভাবে তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। মৃত্যুর মুহূর্তে পুর্বেও তার মুখ থেকে বজ্র আওয়াজ উঠেছে নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবার, বিপ্লব বিপ্লব ইসলামী বিপ্লব, নবী মোদের শিখিয়ে গেছেন জিহাদ করে বাঁচতে হবে, রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়, ইসলামের শত্র“রা হুশিয়ার সাবধান, এক শহীদের রক্ত থেকে লক্ষ শহীদ জন্ম নেবে।
শহীদের রক্ত দেখে যেমন লক্ষ মোশাররফ জন্ম নিয়েছিল ঠিক তেমনি মোশাররফের রক্ত দেখে লক্ষ মোশাররফ জন্ম নেবে। যারা সব শহীদের অপূর্ণ কাজকে পূর্ণ করবে।
মোশাররফের সাথে আমার তাঁর মৃত্যুর তিনদিন পূর্বে টেলিফোনে সর্বশেষ আলাপ হয়েছিল, কুশলাদি জানার পর সে ফোনে অনুযোগ করেছিল, আমি তাকে ভুলে গিয়েছি। অনেক কষ্টে তাঁর অভিমান ভাংগানোর পর বলেছিলাম, নববর্ষে তোমার জন্য উপহার পাঠাচ্ছি। তাঁর কাছে সংগঠনের একটি ক্যালেন্ডার পাঠিয়েছিলাম। আমার পাঠানো ক্যালেন্ডার নিয়ে বাহক যখন কলেজে ঢুকছিল সে মুহূর্তে অপর গেইট দিয়ে আমার প্রিয় ছোট ভাই মোশাররফের লাশের কফিন ঢুকছিল জানাযার জন্য। আমার পাঠানো উপহার মোশাররফের কাছে পৌঁছার খানিক আগেই মোশাররফ নিজেই উপহার হয়ে আল্লাহর কাছে চলে গেল। আল্লাহ তাঁকে কবুল কর। আমিন।

এক নজরে

পুরোনাম

শহীদ কাজী মোশাররফ হোসাইন

পিতা

কাজী শামসুল হুদা

মাতা

হোসনে আরা বেগম

জন্ম তারিখ

আগস্ট ৪, ১৯৭১

ভাই বোন

২ ভাই ৩ বোন

স্থায়ী ঠিকানা

জয়পুর, শুভপুর, ছাগলনাইয়া, ফেনী

সাংগঠনিক মান

কর্মী

সর্বশেষ পড়ালেখা

অনার্স ২য় বর্ষ, গণিত বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ

শাহাদাতের স্থান

দেওয়ান বাজার সাব এরিয়া চট্টগ্রাম।