শহীদ আমিনুর রহমানঃ সেতো জান্নাতের সবুজ পাখি

শাহাদাত এর উপর যখনই লিখতে গিয়েছি তখনই কলম অক্ষমতা প্রকাশ করেছে, আবেগ আমার জ্ঞান বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে অবশ করেছে। ছাত্র ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্বের কারণে বারবার আমাকে শাহাদাতের মিছিলে যেতে হয়েছে। হায়নাদের গুলির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত,শহিদের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলেছি বারবার। শহিদের পরিবারের মাতা- পিতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, সহপাঠিদের বিলাপ ও রোনাজারিতে সান্ত¡না দিতে গিয়ে বেসামাল হয়েছি, বহুবার তাদের অশ্র“ মুছতে গিয়ে নিজেই অশ্র“সিক্ত হয়ে পড়েছি।

প্রেরণার একটি নাম: শহীদ আমিনুর রহমান

সকল প্রকার জুলুম নির্যাতনের মুলোচ্ছেদ করে ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে একটি আদর্শ ইসলামী সমাজ বিনির্মানের স্বপ্ন নিয়ে রাসুল (স:) এর আদর্শকে বুকে ধারণ করে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির । একটি আত্বনির্ভরশীল সুখী সমৃদ্ধ ও আদর্শীক জাতি উপহার দেওয়াই একমাত্র লক্ষ ।

যে স্মৃতি আজো কাঁদায়

বাংলাদেশের দক্ষিণের জনপদ সাতক্ষীরা। তৌহিদী জনতার আবেগ-অনুভূতির সাথে গভীরভাবে মিশে আছে এ জেলা। এখানকার অধিকাংশ মানুষ ইসলামকে ভালোবাসে বলেই আশা-আকাক্সক্ষা আর স্বপ্নের যেন শেষ নেই। তার প্রমাণ মেলে ২০১৪ সালে দায়িত্বশীল সমাবেশে সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল জব্বার ভাই তার বক্তব্যে বলেছিলেন, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা আর ইসলামী আন্দোলনের রাজধানী সাতক্ষীরা।

হাজারো হৃদয়ের গহীনে লুকায়িত নাম শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানী

“শহীদেরা কখনও মরে না।” আমরা জানি সকল মানুষই মরণশীল। শহীদেরা অন্যের চাইতে আরও নির্মমভাবে হাত-পা কর্তিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তারাও মৃত্যুর পর আর ফিরে আসে না। তারা মরে না, তাদেরকে মৃতদের মধ্যে শামিল করবে না। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমে একাধিকবার বলেছেন,

রক্তে রঞ্জিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহার চত্বর

১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল সা. প্রদর্শিত বিধানকে সমাজের বুকে প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়ে কাজ শুরু করে। তরুণ ছাত্রসমাজের কাছে তারা ইসলামের সুমহান আদর্শের কথা পৌঁছে দেবার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অহর্নিশ কর্তব্যরত রাখে নিজেদেরকে। তাদের প্রতিটি কাজ তরুণ ছাত্রদের হৃদয়ে ভালোবাসার স্থান করে নেয়। দিন দিন প্রিয় কাফেলায় ভিড়তে থাকে সচেতন ছাত্রসমাজ। প্রতিটি হৃদয়ে জেগে ওঠে সাহসের তুফান। উত্তাল তরঙ্গ ভেঙে ভেঙে নির্মাণ করতে থাকে ঠিকানা। আর সেই ঠিকানায় এখন লক্ষ লক্ষ নাবিক। নাবিক বন্দরে পৌছানোর তীব্র আকাক্সক্ষায় দুচোখের স্বপ্ন সমান এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাই এই অগ্রযাত্রাকে নিস্তব্ধ করে দেয়ার জন্য শুরু থেকেই নানা বাধা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে থাকে। সকল বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে ছাত্রশিবির এগিয়ে যেতে থাকলে বিরোধীরা নবীন সংগঠনটিকে কুঁড়িতেই নিঃশেষ করার জন্য বৃহৎ হত্যাকান্ড সংঘটিত করার পরিকল্পনা করে ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

মালেক চাচাকে দেখিনি কিন্তু যেভাবে চিনেছি

তখনও আমরা অনেক ছোট। যতটুকু মনে পড়ে মাদ্রাসায় যাওয়া শিখেছি। মানুষ ছোটবেলায় যাদের আদর আর স্নেহে বড় হয় তাদের মধ্যে অন্যতম চাচা, ফুফু, মামা ও খালা। কিন্তু একমাত্র ফুফু ছাড়া আমি এরকম আর কাউকে পাইনি। তবে সেই ছোটবেলা থেকেই শুনেছি শহীদ আবদুল মালেক নামে আমাদের একজন চাচা ছিলেন। যিনি ছিলেন খুবই মেধাবী ছাত্র। গ্রামের শিক্ষিতজনেরা পড়ালেখার বিষয় এলেই বলতেন তোমাদেরকে ভালো করে পড়ালেখা করতে হবে, শহীদ মালেকের মতো ছাত্র হতে হবে। গ্রামের কেউ বলত শহীদ আবদুল মালেক, আবার কেউবা বলত শহীদ মালেক। আমরা শহীদ শব্দটা চাচার নামের অংশই মনে করতাম। তখনও জানতাম না এই শহীদ শব্দটা তার শাহাদতের পর যোগ হয়েছে। এটাও জানতাম না যে, আল্লাহর কাছে শাহাদাত বা শহীদের মর্যাদা কতটা বেশি।

মায়ের দোয়া

স্বপ্নের মাঝে সেই হাসি মুখ দেখতে যেন পারি। ডিম ভাজি আর পান্তা ভাত দেখলে হত খুশি হয়নি বলা ‘জাদু’ তোকে কতো ভালোবাসি। তোর কারণে আজকে আমার অনেক ছেলে সম্মান ও ভালোবাসা দিচ্ছে ওরা ঢেলে। দু’চোখ আমার ছলছল অনেক দিন পরে দোয়া করি মুজাহিদরা আসুক ঘরে ঘরে।

২৮ অক্টোবর ও আমার প্রাণপ্রিয় আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল

২৮ অক্টোবরের সেই হৃদয়বিদারক ঘটনা আমি মা হয়ে কোন দিন ভুলতে পারব না। সেই দৃশ্য মনে পড়লে কষ্টে আমার প্রাণ ফেটে যায়। তবে এ জন্য গর্ববোধ করি এ মৃত্যু সাধারণ কোন মৃত্যু নয়। এ মৃত্যু অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের, এ মৃত্যু আল্লাহর জমিনে অন্যায়কে দূর করে ন্যায় ও হক প্রতিষ্ঠার জন্য। জীবনকে বিলিয়ে দেয়ার এ মৃত্যু সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, “তোমরা ওদেরকে মৃত বলো না বরং ওরা জীবিত কিন্তু তোমরা অনুধাবন করতে পার না।”

শিপন আমার গর্ব

পড়াশোনার প্রতি ছিল তার যথেষ্ট আগ্রহ। তার এই আগ্রহ দেখে আমি এবং তার বাবা সিদ্ধান্ত নিই তাকে হাফেজ বানাবো। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত গোড়ান নাজমুল হক সিনিয়র মাদরাসা থেকে পড়ার পর হেফজখানায় আমরা তাকে ভর্তি করিয়ে দিই। হেফজ শেষ করে তামিরুল মিল্লাত মাদরাসায় সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হয়। এখান থেকে দাখিলে ১১তম স্থান অধিকার করে। মানুষের সাথে সে খুব সহজেই মিশে যেত। হাসি এবং গল্পের মাধ্যমে যে কোন আসরকে প্রাণবন্ত করতে শিপনের জুড়ি ছিল না। মানুষের যে কোন বিপদ কিংবা সমস্যা সমাধানে সে দ্রুত সাড়া দিত। যেমন এক ছেলে অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথা উঠলে তাকে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তির পর দেখা গেল তার ওষুধের টাকা নেই। সে তার নিজের পকেটের টাকা দিয়ে ঐ ছেলের ওষুধ কিনে দেয় এবং সারারাত তার বিছানার পাশে থেকে সেবা-শুশ্রুষা প্রদান করে ভোরে পায়ে হেঁটে বাসায় ফিরে। এলাকার এক বৃদ্ধ লোকের কাছ থেকে ছিনতাইকারীরা টাকা পয়সা ছিনিয়ে নিলে ঐ লোকটিকে ৩০ টাকা রিকশা ভাড়া প্রদান করে তার নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে দেয়। এলাকায় সে এতই ভালো হিসেবে পরিচিত ছিল যে, চার বছর ধরে মসজিদে তারাবি পড়িয়েছে। সরকারি বিজ্ঞান কলেজে অর্থ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে তার আচরণে মুগ্ধ হয়ে হিন্দু ছেলেরা পর্যন্ত বায়তুলমালে অর্থ প্রদানের আগ্রহ প্রকাশ করত। শহীদ হওয়ার আগের বছর ২০০৫ সালে গোড়ানের এক বাড়িতে তারাবির ইমামতি করে।

জান্নাতের দু’টি পাখি

শহীদেরা মরে না, তারা অমর। তাদেরকে অন্য মৃতদের মধ্যে শামিল করা যায় না। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে একাধিকবার বলেছেন। সূরা বাকারায় ১৫৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- আল্লাহর পথে যারা নিহত হয় তাদের মৃত বল না বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারো না।